ঢাকায় প্রথম মহাকাশ শিল্পোৎসব: নতুন দিগন্তের হাতছানি


সৈয়দ মূসা রেজা | Published: December 22, 2021 15:54:17 | Updated: December 22, 2021 19:52:09


(বাঁ থেকে) আহনাফ শাফিন ইসলাম, কবীর জামি এবং মশহুরুল আমীন

সুদূর মহাকাশ পাড়ি দিয়ে আসা নক্ষত্রের আলো কখনো পুরোনো হয় না। ভর থাকলে আলোর গতিতে পৌঁছানো যায় না। আর ফোটন কণিকার ভর নেই। আলোর গতি লাভ করলে সেখানে সময় থাকে না। সময় হয়ে যায় শূন্য। তাই হাজার কোটি বছর পাড়ি দিয়ে আসা আলো কখনো পুরানো হয় না, ফোটন কণার দৃষ্টি দেখলে মনে হবে আলোকরশ্মি বের হওয়ার সাথে সাথেই দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। কথাগুলো বলছিলেন স্কুলছাত্র আহনাফ, ভাবা যায়! আলোর রূপান্তর আহনাফকে বিস্মিত করে, তাই ভবিষ্যতে আলোক বিষয়ে পড়ালেখা করবে বলে মনস্থির করেছে।

বাংলাদেশে এই প্রথমবারের মতো হয়ে গেল মহাকাশ শিল্পোৎসব। ধানমন্ডির চিত্রক গ্যালারিতে অনুষ্ঠিত ১০ থেকে ১২ ডিসেম্বর এই তিন দিনের উৎসবে প্রথমবারের মতো অ্যাস্ট্রোফটোগ্রাফি বা জ্যোতির্আলোকচিত্রের মেলাও বসে ছিল। মেলায় মহাকাশের দশটি আলোকচিত্র ছিল। এর পাঁচটি তুলেছেন লন্ডন প্রবাসী বাংলাদেশী জ্যোতির্আলোকচিত্রী কবীর জামি এবং বাকিগুলো বাংলাদেশের ছাত্র আহনাফ শাফিন ইসলামের তোলা। মহাকাশ শিল্পোৎসবের দৌলতেই চিত্রক গ্যালারির এক সারিতে সমবেত হয়েছেন বিশেষজ্ঞ আলোকচিত্রী কবীর জামি এবং কিশোর আলোকচিত্রী আহনাফ। অরণি বিদ্যালয়ের ছাত্র আহনাফের জন্ম ১ জুন, ২০০৪ সালে। বর্তমানে দশম শ্রেণিতে পড়ছেন খুদে প্রতিভাবান এ আলোকচিত্রী।

মহাকাশের ছবি তোলার আগ্রহ জন্মালো কীভাবে, তা নিয়েই আহনাফের সঙ্গে কথা শুরু করে ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেস। পয়েন্ট অ্যান্ড শ্যুট গোষ্ঠীর ক্যামেরায় গ্রামে ছবি তুলতে গিয়ে ঘটনাক্রমে ক্যামেরায় ধরা পড়ে রাতের আকাশের কিছু নক্ষত্র। রাতের তারাভরা আকাশের হাতছানিতে মুগ্ধ হয় সে। এভাবেই, রাতে-রাতে হেঁটে-হেঁটে নক্ষত্রের সনে, নিশি আকাশের ছবি তোলার পথ চিনে নেয় আহনাফ।

মহাকাশ মেলায় নিজ আলোকচিত্র স্থান পাওয়ায় যারপরনাই খুশি হয়েছে আহনাফ। এর আগে আমার নিজের তোলা ছবিগুলো স্বজন ও বন্ধুদেরই কেবল দেখাতাম।

আহনাফের ক্যামেরায় বন্দী দূর আকাশের চাঁদ

এ মেলার মাধ্যমে অনেকের সাথে পরিচয় হয়েছে বলে জানায় সে। তাছাড়া, মেলায় উন্মাদের সম্পাদক বাংলাদেশের অন্যতম সেরা কার্টুন আঁকিয়ে আহসান হাবিব আংকেলের ছবি ছিল। আহসান হাবিবকে বন্ধুসুলভ মানুষ বলে উল্লেখ করে আহনাফ জানায়, উনি আমার আলোকচিত্রগুলোর প্রশংসা করেছেন।

পাশাপাশি মহাকাশ বিষয়ক আঁকা ছবিও ছিল মেলার অন্যতম আকর্ষণ। সে বিভাগে মিরপুর পুলিশ লাইন স্কুলের ক্লাস ফাইভের ছাত্র রাফসানের আঁকা ছবিও ছিল। মেলায় অংশগ্রহণকারী রাফসান ছিল বয়সের হিসেবে সবচেয়ে ছোট। প্রতি বছর মহাকাশ নিয়ে এমন মেলা বসবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করে আহনাফ ও রাফসানেরা।

বর্তমানে, ঢাকায় আলোক দূষণই শেষ নয়, এর সাথে যোগ হয়েছে হাওয়া দূষণ। এই দুইয়ের সর্বনাশী যোগসাজশের ফল হয়েছে ভয়ংকর। নিশি আলোকচিত্রী বা মহাকাশ আলোকচিত্রীদেরকে মোটেও কাছে ডাকে না ধোঁয়াশার শ্রীহীন চাদরে মোড়া ঢাকার আকাশ। রাতে হয়তো আকাশের মধ্যভাগে কখনো কখনো ছবি তোলার সুযোগ মেলে, কিন্তু দিগন্ত রেখার কাছাকাছি ছবি তেলার সুযোগ প্রায় ডুমুরের ফুল হয়ে গেছে। এ কারণেই ধূমকেতু লিওনার্দের ছবি তোলার কষ্ট শেষ হয় ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে। আহনাফ আরো জানায়, এ ধূমকেতু ৮০ হাজার বছর পর পর পৃথিবীর আকাশে উঁকি দেয়। কিন্তু এবারই একে শেষ দেখা যাবে। শুক্র গ্রহের মহাকর্ষের টানে গতিপথ বদলে গেছে লিওনার্দের। এবারে ওটা সৌরজগত থেকে বের হয়ে যাবে। ভবিষ্যতে কখনোই আর আসবে না।

এসব তথ্য জানানোর পর আহনাফ হাসতে হাসতে স্মৃতিচারণ করে বলে, গেল ডিসেম্বরের ৮ তারিখে ভোররাত ৪টায় বাড়ির ছাদে উঠে ছবি তোলার চেষ্টা করার সময় তাকে চোর ভাবা হয়েছিল। পাশের দালান থেকে মিস্ত্রিরা চোর চোর বলে চিৎকার করছিল এবং তার দিকে টর্চ ফেলছিল।

বাবা মনিরুল ইসলাম আর মা জিনিয়া হক রাতে তার আলোকচিত্র অভিযানে সহায়তা করছে। তা না হলে এভাবে ছবি তোলাই হতো না বলে মনে করে আহনাফ।

বেসরকারি একটি সংস্থার শীর্ষস্থানীয় কর্তা আহনাফের বাবা একজন সৃজনশীল ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত, যিনি কিনা একটি নাট্যগোষ্ঠীর সঙ্গে জড়িত। অন্যদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মনোবিজ্ঞানে সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জনকারী তার আহনাফের মা আগে শিক্ষকতা করেছেন ইংরেজি মাধ্যমের একটি স্কুলে। পরিবারে আরো রয়েছ ছোট বোন, ক্লাস সিক্সের ছাত্রী নওশিন ইসলাম।

ইউটিউব থেকে মহাকাশ আলোকচিত্রের প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জন করেছে বলে আহনাফ জানায়। মূলত তার শেখার উৎস হলো ইউটিউব।

আলোকচিত্রী কবীর জামি স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে বলেন, তাঁর বাবা তাঁকে ১৯৮৪ সালে একটা দুরবিন কিনে দিয়েছিলেন। জামি তখন কলেজের ছাত্র। বই-পুস্তকের মধ্য দিয়েই বেড়ে উঠেছেন জামি। মহাকাশের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টিতে ভূমিকা রেখেছেন তাঁর বাবা মরহুম ড. হুমায়ুন কে এম এ হাই। এমবিবিএস পাস করার পর ওষুধবিজ্ঞানে ডক্টরেট অর্জন করেছিলেন তিনি। তবে তাঁর ছিল নানামুখী জ্ঞান পিপাসা।

বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল অ্যাসোনিয়েশনর ফেইসবুক গ্রুপের এডমিনের দায়িত্ব পালন করছেন জামি। সার্বিকভাবে মহাকাশ শিল্পোৎসব হওয়ায় খুবই খুশি আয়োজক ও জামি। মহাকাশ মিলন নামে সবার কাছে পরিচিত অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মশহুরুল আমীন প্রথমে জামিকে সংগঠনটির সাথে যুক্ত হতে আমন্ত্রণ জানান। পরবর্তীতে মহাকাশ শিল্পোৎসবেও আমন্ত্রিত হন তিনি।

মেলাতে অল্পবয়সী অনেক ছেলে-মেয়ে এসেছে উল্লেখ করে জামি বলেন, এটা সত্যিই খুব উৎসাহব্যঞ্জক।

এ ধরণের মেলা অনলাইনে করার ব্যাপারে আগ্রহ ব্যক্ত করেন তিনি। নানাভাবে অনলাইনে এ রকম মেলা করা সম্ভব বলেও জানান। পাশাপাশি তিনি জানান, বিশ্বের বিভিন্ন দুরবিন থেকে মহাকাশ ছবির উপাত্ত বা ডাটা সংগ্রহ করে তা অনলাইনে এই অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যদেরকে দেওয়া হবে। তারা এই উপাত্ত প্রক্রিয়াকরণ করে ছবি করবে।

তিনি বলেন, অ্যাসোসিয়েশনের অল্পবয়সী সদস্য সংখ্যা বেশি, তারা এভাবে অনেক কিছু শিখতে পারবে। মাঝারি মাপের একটা দুরবিনের এক ঘণ্টার ভাড়া বাংলাদেশি টাকায় ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা পড়বে বলেও জানান তিনি।

লন্ডনপ্রবাসী কবীর জামি অবশ্য পেশায় নিজেকে সফটওয়্যার কারিগর হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকেন। মহাকাশের ছবি তোলা তার সখ এবং নেশা। বিলাতে, লন্ডনের উপকণ্ঠে, বাসভবনে মানমন্দির বানিয়েছেন। মহাকাশের ছবি তোলার তাড়নাই তাকে মানমন্দির বানানোর পথে নিয়ে গেছে।

পৃথিবী থেকে ২৫ লক্ষ আলোকবর্ষ দূরের অ্যান্ড্রোমিডা গ্যালাক্সির ছবি তুলেছেন কবীর জামি

বাবা পেশায় ডাক্তার এবং ওষুধ বিজ্ঞানী হওয়া সত্ত্বেও মহাকাশসহ নানা বিষয়ে ছিল গভীর জ্ঞান। বাবার স্বর্ণস্পর্শে মহাকাশ চর্চায় মেতে ওঠেন সেই কৈশোর থেকেই। তিনি আরো বলেন, আমার বাবার ব্যাপারে আরো একটু না বললেই নয় - তিনি ডাক্তার হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশের ঔষধ নীতি প্রণয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখেন।

পরিসংখ্যানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জনকারী জামির সফটওয়্যার কারিগর হয়ে ওঠা এবং মহাকাশ আলোকচিত্রী হওয়া ঘটেছে অবশ্য পুরোই নিজ প্রচেষ্টায়। তিনি বলেন, পৃথিবীতে কেউ আমাকে কোনোদিন জোর করে কিছু শেখাতে পারেনি। সব শিক্ষাই প্রথমে নেশা হিসেব শুরু হয়েছে, তারপর তাদের কোনো কোনো শিক্ষা হয়ে উঠেছে পেশা।

বাংলাদেশে আলো ও বায়ু দূষণের কামড় দিনে দিনে কঠিনতর হচ্ছে। তাতে মহাকাশ বা নিশি আলোকচিত্রের আগ্রহ কমে যাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, এ ধরণের আলোকচিত্রের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের দাম সাধারণত অনেক বেশি হয়ে থাকে, অনেকের পক্ষেই কেনা সম্ভবপর হয় না। আবার দাম বেশি না হলেও ঢাকাতে এমন সরঞ্জাম পাওয়া বেশ কঠিন। এ সত্ত্বেও বাংলাদেশে মহাকাশ আলোকচিত্রের চর্চা কম হলেও আলোকচিত্রের এ অঙ্গনে এখনো অনেক বাংলাদেশি সক্রিয় আছেন বলে জানান জামি।

বায়ু এবং আলো দূষণের ছোবল থেকে রক্ষা পেয়েছে এমন অঞ্চল এখনো বাংলাদেশে আছে। তিনি বিশ্বের উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, কুড়িগ্রামের মতো অঞ্চলে বেসরকারি উদ্যাগে ২০/২২ কাঠা জায়গা নিয়ে মহাজগত দেখার দুরবিন ব্যবস্থা বসানো সম্ভব। দুরবিন ব্যবস্থা বাবদ ৩০ লাখ টাকার বেশি হয়তো ব্যয় হবে না। এতে বাংলাদেশের সন্তানরা সহজেই মহাকাশ গবেষণা, মহাকাশ দেখার এবং ছবি তোলার অবকাশ পাবে। তাছাড়া এমন অঞ্চলে নাইট পার্ক বা নিশি উদ্যানও স্থাপন করা যেতে পারে। এমন সুযোগ এখনও আছে। কেবল বিনিয়োগকারীকে এগিয়ে আসতে হবে।

পাশাপাশি আলো দূষণ ঠেকাতে তেমন বেশি খরচের বোঝা বইতে হবে না। বরং আলো যেন কোনোভাবেই উর্ধমুখী না হয়, আকাশের দিকে ছড়িয়ে না পড়ে, কেবল তাই নিশ্চিত করতে হবে। এটা খুব বেশি খরচের বিষয়ও নয়। কেবল দরকার একটু সচেতন হওয়া।

কথা হয় মশহুরুল আমীনের সাথেও। দিলখোলা মানুষটি ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেসকে জানান, মীনাবাজার এবারের উৎসবে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। মেলায় কমবয়সী থেকে প্রবীণ সব ধরণের মানুষের সমাগম হয়েছে এবং অংশগ্রহণ করেছে। একে মেলার সাফল্যের মাপকাঠি হিসেবে গণ্য করতে হবে।

এবারের মহাকাশ শিল্পোৎসবের সফলতায় উৎসাহবোধ করছেন। প্রতি বছর এক বা দুবার এমন মেলার আয়োজন করার বিষয়েও ভাবা হচ্ছে।

খুদে আলোকচিত্রী আহনাফ, খুদে শিল্পী রাফসানের এগিয়ে আসা এবং অভিজ্ঞ আলোকচিত্রী কবীর জামির দিক নির্দেশনা - এই দুই প্রান্তবর্তী বয়স, পেশা এবং দক্ষতার মানুষদের টেনেছে এ শিল্পোৎসব। এর মধ্য দিয়েই মহাকাশ উৎসবের দিগন্ত আলোয় ভরে গেছে। মেলাকে কেন্দ্র করে জড়ো হয়েছে মহাকাশ উৎসাহী, আশা ভরা মন এবং তেজী মেধা নিয়ে অনেক কচি মুখ। নতুন আকাঙ্ক্ষা আসেচলে আসে নতুন সময় পুরানো সে-নক্ষত্রের দিন শেষ হয় নতুনেরা আসিতেছে বলে।

ভবিষ্যতে এই অঙ্গনে আরো আহনাফ যুক্ত হবে, পাশাপাশি কবীর জামির মতো দক্ষ ব্যক্তিত্বদের সহায়তাধারা অব্যাহত থাকবে। অচিরেই বিশ্বের মহাকাশ আলোকচিত্রের বিশাল আসমানকে অনেক রত্নে ভরিয়ে দেবে বাংলাদেশ, এমন আশা করাই যায়! তাদের সফল করার আদিগন্ত ছায়াপথ রচনায় আন্তরিক হয়ে আছে বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন।

syed.musareza@gmail.com

Share if you like