Loading...

ঢাকার শবে বরাত: স্মৃতি ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধন

| Updated: March 19, 2022 09:43:50


ঢাকার শবে বরাত: স্মৃতি ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধন

ছয় বছরের ইউশা শোয়ায়েব ইসলাম। পাঞ্জাবি পরে গায়ে আতর মেখে বসে আছে তার বাবার জন্যে। একসাথে নামাজে যাবে সে। ইউশার মতে আজকে সে অনেক কাজ করেছে। মায়ের কথা মতো বাবার সাথে পড়েছে প্রতিটি ওয়াক্তের নামাজ। বাসায় ফেরার সময় বাজার করেছে। একটু আগেই পাশের দুই ফ্লাটে হালুয়া ও সেমাই দিয়ে এসেছে‌ সে। আজকের দিনটি তাই ইউশার জন্য বেশ আনন্দের। কেননা আজকে শবে বরাত। 

শুধু ইউশা নয়। ইউশার মতো তার অগ্রজদের জন্যেও দিনটি খুব আনন্দের।  আজকের দিনে ইবাদতের পাশাপাশি রয়েছে ভালোমন্দ খাবারের আয়োজন, রয়েছে ঝুড়ি ভর্তি সাজানো শখের ব্যবসা। কারো কারো চোখে আছে শৈশবের স্মৃতি এবং আবার কেউ নিজেকে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে বর্তমানের সাথে। 

একটি দিবসকে কেন্দ্র করে নানা মানুষের নানা আয়োজন, তাদের কথা ও আবেগ নিয়েই আজকের এই লেখা। 

শৈশব

ইউশার মতো তার বাবা ইসমাইল ইসলামের শৈশবও জড়িয়ে আছে এই দিবসের সাথে। তিনি যখন ছোট ছিলেন তখনও বেশ আনন্দের সাথে আয়োজন করা হতো শবে বরাত। তবে এখন পরিবার ছোট হয়ে আসাতে কিছুটা ভিন্নতা দেখা যায়। 

তিনি বলেন, “আমি যৌথ পরিবারে বড় হই। তাই মামাতো, খালাতো ভাইবোনদের সাথে একসাথে দিনটি উদযাপন করতাম। সব ভাইয়েরা একসাথে নামাজ পড়তে যেতাম।“

এখানেই শেষ নয়। নামাজ শেষে সবাই একত্রে রাতের খাবার খাওয়া, ছাদে ওঠে গপ্প করা, পুনরায় নামাজ পড়া এই সব কিছু থাকতো ইসমাইল সাহেবের শৈশবে।  তিনি এখন কিছুটা ভিন্নতা লক্ষ্য করেন। স্মৃতিচারণ করেন নিজের ছোটো বেলার। মাঝে মাঝে আফসোসও করেন ইউশার জন্য কারন অতীতের সেই আমেজ উপভোগ করতে পারছে না সে। 

তিনি মনে করেন ঢাকা শহরের ট্রাফিক ও নানান ব্যস্ততার জন্য আত্মীয়দের সাথে আগের মতো সময় কাটানো হয় না। এই দিকটি বাকি সব কিছু আগের মতোই আছে। 

“ইউশা আজকে আমার সাথে নামাজ পড়তে যাবে। হয়তো কিছু দিন গেলে তার বন্ধুদের সাথে যাবে। কিন্তু আত্মীয় স্বজনদের সাথে দিনটি কাটাতে পারবে না।“

খাবার

বাড়িতে বাড়িতে হালুয়া বানানো এই অঞ্চলের রেওয়াজ। গোলাকার পাউরুটি ছিড়ে ভাপ ওঠা গরম-গরম হালুয়া ভিতরে পুরে খাওয়ার স্বাদ অনন্য।

বুটের ডালের হালুয়া, সুজির হালুয়া, বাদামের হালুয়া ছাড়াও কোনো কোনো বাসায় তৈরি করা হয় বিশেষ ধরনের খাবার যাতে থাকে ওই পরিবারের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ একটি রন্ধনপ্রণালী। এইসব হালুয়া আশেপাশের বাড়িতে নিয়ে যাওয়াও এই অঞ্চলের রেওয়াজ। 

ইসমাইল বলেন, “নানী আমাকে বাসায় বাসায় পাঠাতেন। দুই-তিন ধরনের হালুয়া ও রুটি নিয়ে যেতাম। ফেরার সময় তারাও তাদের বাসায় যা যা তৈরি করতো আমাকে দিয়ে পাঠাতো। এই সংস্কৃতি এখনো আছে।“

সারাদিন ব্যস্ত থাকলেও সন্ধ্যার পরে ব্যস্ততার মাত্রা আরো বেড়ে যায়। ইবাদত বন্দেগির বিরতির মাঝে মাঝে চলে খাওয়া-দাওয়া। মসজিদে চলে ওয়াজ। ইসমাইল সাহেবের ছোটো বেলায় মসজিদের পরিমাণ এতো ছিল না।

এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন,‌ “মাগরিবের পর খালাতো-মামাতো ভাইয়েরা মিলে নামাজে যেতাম। অনেক রাত পর্যন্ত চলতো ইবাদত। মাঝখানে মসজিদ জিলাপি ও নিমকি দিতো।“

“অন্যান্য বাসা থেকে যা খাবার আসতো সেগুলো খেতাম। ছাদে ওঠে সবাই গল্প করতাম তারপর ভোররাত পর্যন্ত দুরুদ পড়তাম।“

ঐতিহ্যের ঢাকা এবং শবেবরাত 

শবেবরাত উদযাপনে রয়েছে অতীত ও বর্তমানের সংযোগ।  দুপুরের পর থেকেই অলিগলিতে ব্যস্ততা ভর করে। ঘরের সবচেয়ে অলস ও বেয়াড়া ছেলেটিও আতর মেখে তৈরি মসজিদে যাওয়ার জন্যে। কেউ কেউ আনন্দ নিয়ে  সাজায় শখের দোকান। 

এরকমই একজন হলে মোঃ শাখাওয়াত হোসেন। তিনি যোগীনগরের বাসিন্দা, কলেজের ছাত্র। প্রতিবছর শখের বসে শবে বরাতে বিভিন্ন ধরনের আগরবাতি নিয়ে বসেন।

তিনি বলেন, “আমি সারাদিন কিছুই করি না। তবে প্রতিবছর শখ করে এই দিনে আগরবাতি বিক্রি করি। প্রতিটা বাসায় সন্ধার পর আজ আগরবাতি জ্বালায় এখানে।“

 

ছবি: যোগীনগেরর মোঃ শাখাওয়াত হোসেনের দোকান

শবেবরাতকে কেন্দ্র করে বাজারে পাউরুটির কমতি নেই। তবে এটি নিত্যদিনের পার্টি থেকে আলাদা। কিছু পাউরুটি দেখতে মাছের মতন। চোখের জায়গায় সবুজ মার্বেল বসানো থাকে। আবার কিছু আছে আকারে বড় এবং গোলাকার, নাম তার ‘শাহী পাউরুটি’।

সম্ভবত আকারে বড় ও গোলাকার হওয়াতেই নাম তার শাহী পাউরুটি। 

এধরনের পাউরুটি ছাড়াও ফুল ও বিভিন্ন ধরনের নকশা করা পাউরুটিও বিক্রি করতে দেখা যায় শবে বরাতে। তবে বাজারে মাছ আকৃতির পাউরুটির চাহিদা অনেক বেশি। মাছের চোখে মার্বেল বাচ্চাদের আকৃষ্ট করে। 

দিবসটিকে কেন্দ্র করে এসব পাউরুটির চাহিদা অনেক বলে মনে করেন দোকানি আবু মোহাম্মদ। 

তিনি বলেন, “আমি শুধু এই দিনটিতেই পাউরুটি বিক্রি করি। বাচ্চারা দোকানের সামনে দিয়ে গেলে মাছের দিকে তাকিয়ে আবদার করে।“

ব্যবসা

আবু মোহাম্মদ গেন্ডারিয়ার বাসিন্দা। শবে বরাতে চলে আসেন পুরান ঢাকার নারিন্দায়। 

হালুয়ার সাথে পাউরুটি বা রুটি বাধ্যতামূলক। তার উপর যদি সেটি থাকে নকশা করা তাহলে চাহিদা আকাশচুম্বী। তাই প্রতিবছর এই দোকান গুলোতে লক্ষ্য করা যায় ক্রেতাদের উপচেপড়া ভীড়। 

“পাউরুটির দাম আকারের উপর নির্ভর করে। দেড়শ-দুইশ টাকা থেকে শুরু করে হাজার টাকা পর্যন্ত আছে। এ দিবসকে কেন্দ্র করে আমার দিনে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় হয়,” বলেন আবু মোহাম্মদ। 

ইউশার অনেক শখ হলো আজকে এই মাছের আকৃতির পাউরুটিটি খাওয়ার। তাই আবু মোহাম্মদের থেকে ৩৫০ টাকা দিয়ে পাউরুটিটি কিনেছেন ইসমাইল সাহেব।

শুধু পাউরুটি নয় হালুয়া বানানোর উপাদান সমূহের বিক্রিও বেড়ে যায় এই দিনে। কোনো স্টেশনারি দোকানে শেষ হয়ে যায় সামগ্রী তখন ক্রেতাদের ভীড় হয় বড় বাজার গুলোতে। 

ইসমাইল ইসলাম আজ‌ অনেক ব্যস্ত। আযানের সুর মিলে যাচ্ছে এই ব্যস্ততার সাথে। গলির ফাঁকা জায়গাটিতে দেখা যাচ্ছে আগরবাতি ও পাউরুটির দোকান। 

বাসায় ইউশা তার বাবার জন্য অপেক্ষা করছে। তাই তিনি দ্রুত পায়ে বাড়িতে যাচ্ছেন। দ্রুত পায়ে ইসমাইল সাহেবের বাড়িতে ফেরাই মনে করিয়ে দেয় যে আজকে শবে বরাত! 

মোঃ ইমরান বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনা করছেন।

imran.tweets@gmail.com

Share if you like

Filter By Topic