Loading...

ঠগি: উপমহাদেশের নৃশংস খুনিদের গোপন দল

| Updated: July 27, 2022 20:08:54


ছবি: বাংলা ইনফোটিউব ছবি: বাংলা ইনফোটিউব

১৮১২ সাল। গঙ্গা তীরবর্তী এক স্থানে একটি গণকবর থেকে উদ্ধার হলো পঞ্চাশটি কঙ্কাল। প্রত্যেকটির শিরদাঁড়া ও হাঁটু ভেঙে দেয়া হয়েছে! মানুষের মুখে মুখে তখন একটিই কথা। এ নিশ্চয়ই ঠগিদের কাজ। স্থানীয় মানুষদের মুখে মুখে ঘুরত ঠগিদের কথা। তারা কাজের ধরনভেদে ঠ্যাঙাড়ে বা পাঙ্গু বা ভাগিনা নামেও পরিচিত ছিল। 

এ ঘটনায় তোলপাড় শুরু হয়ে গেল উপমহাদেশজুড়ে। তবে তখনও এর কোনো কূলকিনারা করা যাচ্ছিল না।

এর ঠিক তিনবছর আগের কথা। ১৮০৯ সালে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন ইংরেজ তরুণ উইলিয়াম হেনরী স্লিম্যান। তিনি ফরাসি এক পর্যটকের বই পড়ে জানতে পারেন এই ঠগিদের কথা। এরপর বিভিন্ন জায়গায় অজ্ঞাত পথিকদের লাশ পাবার ঘটনা শুনে তিনি সূত্র মেলাতে থাকেন। কিন্তু তখনো স্পষ্ট কিছু পাচ্ছিলেন না। তবে ড. রিচার্ডসহ আরো কয়েকজন লেখকের বই পড়ে তিনি এদের গতিবিধি সম্পর্কে কিছুটা জেনে যান।

১৮১২ সালের এই ঘটনার পর তার মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মে যে, এ ঠগিদেরই কাজ। ঠগিদের ধরার জন্যই তিনি সেনাবাহিনী থেকে পরে সিভিল সার্ভিসে যোগ দেন।

ঠগিদের ইতিহাস কিন্তু এখান থেকে শুরু নয়। তাদের আত্মপ্রকাশের প্রথম উদাহরণ পাওয়া যায় ১২৯০ সালে। তখন সুলতানি আমল। সে সময় দিল্লীতে ঠগিদের উৎপাত শুরু হয়। এক অদ্ভুত বিশ্বাসকে পুঁজি করে তারা মানুষ হত্যায় মেতে ওঠে।

এই লোকগুলো বিশ্বাস করত তারা মা ভবানীর বংশধর। ভবানী বা মা কালী তাদের দিয়ে এসব করিয়ে নেন! ধারণা করা হয়, তাদের সে সময়ের সর্দারদের কেউ ছিলেন মানসিকভাবে অসুস্থ, নয়তো সিজোফ্রেনিক। এর ফলেই এই অদ্ভুত বিশ্বাস তাদের মনে গেঁথে যায়।  

সে সময় তারা ধরা পড়লেও তাদের আটকে না রেখে দিল্লী থেকে বাংলায় নির্বাসন দেয়া হয়। এরপর বাংলা অঞ্চলে তারা ঘাঁটি গেঁড়ে বসে।

এ সময় প্রতিবছর অন্তত ৪০ হাজার লোক গুম হয়ে যায় এই ঠগিদের খপ্পরে পড়ে। সংস্কৃত শব্দ ঠগ অর্থ প্রতারক। সেখান থেকেই এদের কেতাবি নাম হয়েছিল ঠগি। ইংরেজরা বলতেন থাগ। জনসাধারণের কাছে এরা পরিচিত ছিল পাঙ্গু (নৌপথের ঠগি) অথবা ঠ্যাঙাড়ে (মুগুর দিয়ে পিটিয়ে মারত) নামে। আরেকপক্ষ ছিল ধাতুরিয়া, যারা ধুতুরার বিষ খাইয়ে মানুষ মারত।

১৮৩০ সালে ব্রিটিশ গভর্নর লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক সিভিল সার্ভিসে থাকা কর্মকর্তা স্যার উইলিয়াম হেনরী স্লিম্যানকে দায়িত্ব দেন ঠগি দমনের। গত ২১ বছর ধরে এই ঠগিদের নিয়ে বিস্তারিত পড়ছিলেন স্লিম্যান।

                                        ঠগি দমনের পুরোধা উইলিয়াম হেনরি স্লিম্যান, ছবি:কোরা

এদের মানুষ শিকারের ধরন ছিল প্রচণ্ড নিখুঁত। হাটে, বাজারে, নির্জন রাস্তায় কিংবা তীর্থস্থানে - সবজায়গায় এরা সাধু বা একেবারে সাধারণ মানুষদের দল হয়ে ঘুরত। সাধারণের চেয়ে আলাদা করে তাদের চেনার উপায় ছিল না। ঘুরে ঘুরে তারা দেখত কাদের কাছে পয়সাপাতি ভালো অথবা কারা নির্জনে কোথাও চলেছে। এদের সাথে খাতির গড়ে বন্ধুত্ব পাতিয়ে একসাথে গান-বাজনা, খোশগল্প, খাওয়া-দাওয়া চলত।

তারপর কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই সর্দারের এক ইশারায় পথিকটিকে মাটিতে শুইয়ে ফেলত তারা। এক/ দুজন মাথার দিক, আর একজন পায়ের দিক চেপে ধরত। আর একজন পেছন থেকে গলায় পেঁচিয়ে ধরত রুমাল। মাত্র ৩০ ইঞ্চির এই হলুদ রুমালে ১৮ ইঞ্চি দূরে একটি গিঁট। সেখানে সেলাই করা একটি রুপা বা দুটি তামার পয়সা। রুমালটি গলায় চেপে ধরেই খুন। তারপর সব সম্পদ লুট।

খুনের আগে আলাপ জমিয়ে নিয়ে যারা খুনটি করতো তাদের বলা হতো 'চামোচি', আর যারা কবর খুঁড়ে রাখত তাদের বলা হতো 'বিয়াল।' গলায় রুমাল পেঁচিয়ে ফাঁস দেয়া খুনিকে বলা হতো 'ভাতুক।'

কেউ কোনোভাবে পালাবার চেষ্টা করলে ভাতুক পেছন থেকে রুমাল ছুঁড়ে গলায় ফাঁস দিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করতো। হত্যার পর লাশের হাঁটুর হাড় ও মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়া হতোএতে পানিতে ফেলে দেয়া লাশ আর ভেসে উঠতে পারতো নাঠগিরাও থাকত ধরা-ছোঁয়ার বাইরে

ঠগিরা এই কাজ করত বংশপরম্পরায়। তাদের বাড়ির স্ত্রীলোকেরা জানতো না তারা আসলে কী করে। তবে অমাবস্যা তিথিতে দল ধরে বেরিয়ে যেত তারা, তীর্থগমনের মত করে। ঠগিরা নিজেদের ভেতরই আত্মীয়তা করতো। প্রাপ্তবয়স্ক হবার পর তাদের ছেলেরাও ঠগি হতো।

এসব কিছু জেনেও স্লিম্যান এর পক্ষে ঠগিদের চিহ্নিত করা বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। তিনি এরপর গুপ্তপুলিশ গঠন করেন। তারাও তীর্থযাত্রীর বেশেই আশেপাশে ঘুরত। আলাদা কয়েকটি দলে কাছাকাছি থেকে তারা রেকি করত।

ঠগিরা এদেরও সাধারণ তীর্থযাত্রী মনে করে হত্যা চেষ্টা করে ও ধরা পড়তে থাকে। এছাড়া জবলপুরের কল্যাণ সিং এর ধরা পড়া ঠগি ধরার পথ সহজ করে দেয়।

কল্যাণ সিং পরিচারক ও মালির কাজ করত। তাকে একটি তীর্থযাত্রী দলের সঙ্গে দেখে সন্দেহ হয় স্লিম্যানের। জেরার মুখে ভীত কল্যাণ সিং সব স্বীকার করে নেয়। এরপর তার দেয়া তথ্য অনুসারে একের পর এক ঠগি ধরা পড়তে থাকে।

একটি পেশোয়ারি ঠগি দল, ছবি:বাংলাইনফোটিউব

ঠগিদের উৎপাত সবচেয়ে বেশি ছিল বাংলায়। হিন্দু - মুসলিম নির্বিশেষে তারা ভবানীর আরাধনা করত।

বর্ধমানে ছিল এদের সবচেয়ে বড় ঘাঁটি। সেখানে এই হত্যাকাণ্ড নৌপথে ব্যাপকভাবে হতো। সেই ঠগিদের বলা হতো পাঙ্গু অথবা ভাগিনা। সে সময় বর্ধমান ছাড়াও ময়মনসিংহ, মুর্শিদাবাদ, রাজশাহী, ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, চট্টগ্রামসহ অনেক অঞ্চলে ঠগিদের হাতে বিপুলসংখ্যক মানুষ হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে থাকে।

এ অঞ্চলের কুখ্যাত ঠগি সর্দার সুবন জমাদার পরবর্তীতে ধরা পড়ে ও রাজসাক্ষী বানানোর মাধ্যমে তার কাছ থেকে ব্যাপক তথ্য আদায় করা হয়। ধৃত প্রায় সব ঠগিকে ফাঁসিতে ঝুলতে হয়। এভাবে ১৮৪১ সালের ভেতরই এই উপমহাদেশ ঠগিমুক্ত হয়।

এদের নিয়ে উইলিয়াম হেনরী স্লিম্যান পরে বই লিখেছেন। এছাড়া ফিলিপ মিডোয টেইলর লিখেছেন 'ঠগির জবানবন্দি।' শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায় এর সাহিত্যে সরাসরি এসেছে ঠগিদের প্রসঙ্গ। সত্যজিৎ রায় 'ফেলুদা'-র কাহিনীতে তাদের হত্যাকৌশল উল্লেখ করেছেন।

মাহমুদ নেওয়াজ জয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে চতুর্থ বর্ষে অধ্যয়নরত।

mahmudnewaz939@gmail.com

Share if you like

Filter By Topic