Loading...

ট্রেকিংয়ের জন্য কতটা উপযোগী বাংলাদেশ?

| Updated: April 06, 2022 00:24:08


ট্রেকিংয়ের জন্য কতটা উপযোগী বাংলাদেশ?

প্রকৃতির সাথে মিল রেখেই অবকাঠামোগত উন্নয়ন যেমন - ব্রিজ, রাস্তা, ঘড়বাড়ি করতে দেখা যায় বহির্বিশ্বে। 

বাংলাদেশের চিত্রটি ভিন্ন। পরিবার নিয়ে যেন ঘুরতে আসা যায় এমন উন্নয়নের দিকেই বেশি নজর দিতে দেখা যায় স্থানীয় এবং রাষ্ট্রীয় পর্যটন কর্তৃপক্ষকে।

দেশের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে কিছুটা এরকম অভিজ্ঞতাই ব্যক্ত করেছিলেন সুরভী ইয়াসমিন, হিবা শেহরিন বিনতে মাহমুদ, নোশিন ফারজানা ও নুঝাত ফারহানা প্রেক্ষা। 

তারা চারজনই ইউল্যাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। হিবা শেহরীন বিনতে মাহমুদ হিবা সাহিত্য থেকে, নুঝাত ফারহানা প্রেক্ষা সিএসই বিভাগ থেকে এবং সুরভী ইয়াসমিন ও নোশিন ফারজানা মিডিয়া স্টাডিজ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন।

তাদের শুরুটা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন প্রায় একই সাথে হয়। এখনো পর্যন্ত দেশ ও দেশের বাইরে বহু পর্যটন কেন্দ্রেই ঘুরে বেড়িয়েছেন তারা, জয় করেছেন পাহাড়। কী দেখলেন তারা, কেমন ছিল তাদের অভিজ্ঞতা?

‘অবকাঠামোগত উন্নয়ন’ আসলে কী 

সুরভী যখন বগালেকে যান, তিনি দেখেন সেখানে বসার জন্য যে বেঞ্চগুলো রয়েছে তার রঙ বা ধরনের সাথে ওই পরিবেশের কোনো মিল নেই।

সুরভী ইয়াসমিন

"আমি যখন দেশের বাইরে ট্রেকিংয়ে যাই, দেখি যে ওদের যে ব্রিজ রয়েছে সেটি প্রকৃতির কথা বিবেচনা করেই নির্মাণ করেছে তারা,” বললেন সুরভী। 

“ব্রিজ বা যেকোনো অবকাঠামো দেখলে মনে হবে সেটি ওই পরিবেশেরই অংশ, আলাদা কিছু নয়। পরিবেশের সাথে অসামঞ্জস্য অবকাঠামোগত পরিবর্তনের ফলে ট্রেকিং সাইট তার স্বকীয়তা হারায়,” যোগ করেন তিনি। 

এই প্রসঙ্গে নুঝাত বলেন, “বগালেকের আগের রূপ আমার বেশি পছন্দ হতো। তখন গাড়ি দিয়ে যাওয়া যেত না। এখন অবকাঠামোগত উন্নয়নের ফলে শিশুরাসহ যাচ্ছে। বগালেকের অবয়বে পরিবর্তন হয়েছে।”

নুঝাত ফারহানা প্রেক্ষা, স্থান আমিয়াখুম

একই কথা বললেন নোশিন ফারজানা। তার মতে পরিবেশকে মাথায় রেখেই পর্যটন কেন্দ্রগুলোর উন্নয়ন করা উচিৎ। প্রতিটি স্থানের একটি নিজস্বতা থাকে। তিনি মনে করেন, সেই প্রাকৃতিক সত্তাকে ক্ষতি না করে অবকাঠামোগত পরিবর্তন করাই 'উন্নয়ন।

“আমরা প্রায়ই পড়ে থাকি যে আমাদের পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে রিসোর্ট হচ্ছে, রাস্তা হচ্ছে। এগুলো ভ্রমণের সুবিধা হতে পারে তবে ওই স্থানের স্বকীয়তা এতে করে হারিয়ে যায়,” নোশিন বলেন।

তাজিনডংয়ের চূড়ায় নোশিন ফারজানা

ট্রেকিং এবং অ্যাডভেঞ্চার ট্রিপের জন্য প্রকৃতিকে তার‌ আদি রূপে থাকতে দিতে হয়।

এই প্রসঙ্গে নোশিন বলেন, “পাহাড়ের দুর্গম পরিবেশের জায়গায় পাঁচ তারকা হোটেল এবং রিসোর্ট হয় তবে সেক্ষেত্রে ট্রেকারদের জন্য অসুবিধা হবে।”

“ট্রেকিং মানেই দুর্গম অভিযান।‌ পাহাড়ে প্রতিনিয়ত কাঠামোগত উন্নয়ন হতে থাকলে পাহাড় তার দুর্গমতা হারায়।‌ কাজেই এই উন্নয়ন কতটুকু ট্রেকিংবান্ধব সে প্রশ্ন থেকেই যায়,” বললেন নোশিন। 

আমরা কতটুকু পরিচ্ছন্ন ?

পরিষ্কার-পরিছন্নতা এবং স্বাস্থ্যসম্মত জায়গা পর্যটকদের আকৃষ্ট করে। বাংলাদেশের ট্রেকিং স্পটগুলোতে প্রতিনিয়ত হচ্ছে অবকাঠামোগত পরিবর্তন। ফলে সেসব স্থানে অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় ট্রেকারদের তুলনায় সাধারণ মানুষের আগমন বাড়ছে। এতে করে পরিবেশের পরিচ্ছন্নতা নষ্ট হচ্ছে।  

"আমাদেরকে আগে থেকেই বলা ছিল যে কোনো খোসা, প্যাকেট নির্দিষ্ট ব্যাগে ফেলতে যদি না থাকে তাহলে পকেটে রেখে দিতে। তবে অনেকেই আছেন যেখানে সেখানে ময়লা ফেলে," বলেন সুরভী

এই প্রসঙ্গে হিবা বলেন, "ভারতে ক্যাম্প থেকে দেয়া নির্দেশনা সবাই অনুসরণ করে। আমরা নিজেরাই পরিস্কার রাখি‌। স্থানীয়দের এই বিষয়ে কোনো কষ্ট করতে হয় না।"

শেহরীন বিনতে মাহমুদ হিবা

নিয়ম-নীতি ও নিরাপত্তা 

পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি ট্রেকিং স্পটগুলোর নিয়ম-নীতি ও নিরাপত্তা এই শিল্পের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ। 

সুরভীর মতে বাংলাদেশের ট্রেকিং স্পটগুলো অবশ্যই নিরাপদ। তিনি মনে করেন কিছু প্রতিবন্ধকতা থাকতে পারে তবে এখানে সুযোগ রয়েছে অনেক।

"আমাদের ক্যাম্পগুলোতে নাম লিখিয়ে, ঠিকানা দিয়ে তারপর এক স্থান থেকে আরেক স্থানে যেতে হয়। এই বিষয়টি অনাকাঙ্ক্ষিত বিপদ এড়াতে সহায়তা করে।" 

তবে হিবা ও নুঝাত মনে করেন নিয়মের পাশাপাশি পারস্পরিক সম্পর্ক, সহায়তা আরো শক্তিশালী করা উচিত। 

হিবা বলেন, "নিরাপত্তার জন্য অবশ্যই নিয়মমাফিক কাজ করতে হবে তবে অতিরিক্ত নিয়ম ও বিধিনিষেধে কিছুটা হলেও হতাশ হই। ভারতে বা নেপালে বিষয়টা অনেক সহজ।" 

প্রবেশাধিকার 

বাংলাদেশে ট্রেকিং স্পটগুলো পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতে অবস্থিত। নিরাপত্তাজনিত কারণে ট্রেকিংয়ের জন্য কিছু নিয়ম-কানুন রয়েছে। সেই সাথে রয়েছে কিছুই স্থানে প্রবেশাধিকারের নিষেধাজ্ঞা। 

অন্যান্য দেশে ট্রেকিংয়ের জন্য প্রবেশাধিকার সহজেই পাওয়া যায়। বাংলাদেশের চিত্রটি এক্ষেত্রে ভিন্ন। 

নুঝাত মনে করেন, "আমাদের প্রচুর প্রতিবন্ধকতা থাকে। বাংলাদেশে কিছু ট্রেকিং স্পটগুলোতে যাওয়ার অনুমতি নেই, লুকিয়ে যেতে হয়। ভারতে ভিন্নরূপ, দেশ ও দেশের বাইরের সবার জন্যেই উন্মুক্ত।"

নুঝাতের সাথে হিবা যোগ করেন, "নিরাপত্তাজনিত কারণে প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন জায়গায় যেতে নিষেধ করে যা অন্য দেশের ট্রেকিং অভিজ্ঞতায় ছিল না।" 

"সবগুলো জায়গা ঘুরে একটি কিংবা দুটি স্থান না দেখেই চলে আসতে হয় অথবা পালিয়ে ঝুঁকি নিয়ে যেতে হয়। এই বিষয়গুলো হতাশাজনক," বলেন হিবা।  

এই প্রতিবন্ধকতাসমূহ নুঝাতের কাছেও বেশ হতাশাজনক। তার ভাষ্যে, "বাংলাদেশে ট্রেকিং করার মতো স্থান রয়েছে অথচ  নিষেধাজ্ঞার জন্য অনেকেই যেতে পারে না। ভাবা যায়, আমাদের দেশেরই একটি অংশ, অথচ আমরা যেতে পারবো না?" 

মোঃ ইমরান বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনা করছেন।
mohd.imranasifkhan@gmail.com

Share if you like

Filter By Topic