বাবা-মা কিংবা গুরুজনদের সাথে মতের অমিল এবং ভাবনা ও বিশ্বাসের ভেদাভেদ বড় ধরনের সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় অনেকের জীবনে। এক ছাদের নিচে থেকেও শুধুমাত্র বয়সের এবং অভিজ্ঞতার ফারাকের জন্য মানসিক দুরত্ব তৈরি হয়। এই ফারাককেই আমরা ‘জেনারেশন গ্যাপ’ নামে ডাকি। বাংলা করলে এর মানে দাঁড়াচ্ছে ‘প্রজন্মের দূরত্ব’। বিভিন্ন সময়ের নির্দিষ্ট সীমা-পরিসীমায় সামাজিক পরিবেশ ও সংস্কৃতিতে একটা বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। আর সেই বদলের হাওয়াতেই জন্ম নেয় এমন দূরত্ব।
জেনারেশন গ্যাপের প্রধান প্রভাব দেখা যায় কর্মক্ষেত্রের বিষয়ে। অধিকাংশ বাবা-মায়েরা সন্তানের জন্মের পরই একটা ছাঁচে ফেলে দিতে চান। সেই ছাঁচ অনুযায়ী সন্তান বড় হওয়ার পরও না চলতে চাইলে বা অন্য পথে চলতে চাইলে বিবাদ বাঁধে। শুধু পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেই নয়, জেনারেশন গ্যাপ কর্মক্ষেত্রেও-অনুজ এবং অগ্রজ সহকর্মীদের মধ্যে মনোমালিন্য সৃষ্টি করতে পারে। কিছু বিষয় খেয়াল রাখলে জেনারেশন গ্যাপ কিছুটা কমানো যায়। এতে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের সম্ভাবনা বাড়ে।
পারস্পরিক সম্মান
সম্মান যেকোনো সম্পর্কের জন্য দরকার। কেউ যদি তার পাশের মানুষটিকে সম্মান না করে, তবে খুব কম সময়ের মধ্যেই সম্পর্কে ফাটল ধরতে বাধ্য। এ সম্মান শুধু অগ্রজের প্রতি অনুজের নয়। অনুজের প্রতিও অগ্রজের সম্মান থাকবে হবে। সম্মান যে শুধু বয়সের মুখাপেক্ষী নয়, এ কথা জানতে হবে উভয় পক্ষকেই।
অপরের দৃষ্টিভঙ্গি বোঝার চেষ্টা
ইংরেজি Empathy- শব্দটিকে বাংলা করলে দাঁড়ায় ‘সমানুভূতি’। এই সমানুভূতি দিয়ে অন্যের জুতোয় আক্ষরিক অর্থে পা রাখতে না পারলেও অন্তত অন্যের দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতে পারার চেষ্টা নিত্যদিনের অভ্যাসে যোগ করাই যায়। বয়স যখন যোগাযোগের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়, তখন এ উপায়ের চেয়ে ভালো কিছু হয় না। অন্য কারও কোনো আচরণ বা মতামতে প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে ওঠার আগে যদি কিছু মুহূর্ত সময় নিয়ে ভাবা যায়, এর পেছনে কোনো ন্যায়সংগত কারণ থাকতে পারে কি না—তাহলে মুশকিলের অনেকটা আসান হয়ে যায়। যোগাযোগহীনতার অভিশাপও ধীরে ধীরে মুছে যেতে পারে, যদি একে অপরের দৃষ্টিভঙ্গি বোঝার চেষ্টা করে।
প্রতি প্রজন্মের ভালো দিক গ্রহণ
সব মেঘের পেছনেই যেমন লুকিয়ে থেকে সূর্য হাসে, সব মুদ্রার যেমন দুটো দিকই আছে, ঠিক তেমনি সব প্রজন্মেরও আছে গ্রহণ করবার মতো ভালো কিছু দিক থাকে। জ্যেষ্ঠরা যদি কনিষ্ঠদের শুধু অহেতুক দ্রুতগতি, এককেন্দ্রিকতা বা ডিজিটাল মাধ্যম নির্ভর জীবন নিয়ে গালমন্দ করেই সন্তুষ্ট থাকতে না চান, তাহলে একটু নড়েচড়ে বসে চেষ্টা করতে পারেন; তাদের কম বয়সেই অনেক উদ্যোগ নেবার সাহস, সৃজনশীলতা, এক সঙ্গে অনেক কিছু সামলাবার ক্ষমতাকে প্রশংসার দৃষ্টিতে দেখার চেষ্টা করতে পারেন। ঠিক সেভাবেই বড়দের ‘সেকেলে’ ভেবে সেকালের সবটুকু খোলনলচে পাল্টে ফেলবার চেষ্টা না করে সব যুগের ভালো দিকগুলো মিলিয়ে একটা বৃহৎ ফলাফল জন্ম দেওয়াটা ‘এ যুগের লোক’দের জন্যও অপেক্ষাকৃত ভালো পদ্ধতি।
সাদৃশ্যের দিকে নজর
সব সময় মতের অমিলগুলো আতশ কাচ দিয়ে পরখ না করে মতের মিলগুলোকেও অভিবাদন জানানো জরুরি। দূরত্ব ঘোচানোর জন্য এক কাপ চায়ের আড্ডায় উভয়ের পছন্দসই বিষয় নিয়ে আলাপের জুড়ি মেলা ভার। হোক সে সম্পর্ক বাবা-মা-সন্তান, ঊর্ধ্বতন-অধস্তন বা শিক্ষক-শিক্ষার্থী। হয়তো দু’জনের গানের পছন্দ না মিলতে পারে, তবে দু’জনেই ক্ল্যাসিক সিনেমা পছন্দ করে। হয়তো দু’জনের কাজের পদ্ধতি না মিলতে, তবে দু’জনেরই অবসরযাপনের পছন্দগুলো এক।
সময়ের ফ্রেমে কেটে যায় যে দিনগুলো, তার জন্য একে অপরকে দোষারোপের কিছু নেই। প্রত্যেকেই নিজের সময়টুকু পেয়েছে, নিজের ভুল বা ঠিক কাজগুলো করার জন্য। অন্যের, বিশেষত অন্য প্রজন্মকেও সে সুযোগ দিতে হবে নিজস্ব ভুল বা ঠিক খুঁজে নেবার। জেনারেশন গ্যাপ শুধুমাত্র অভিজ্ঞতা বা বয়স নয়, ব্যক্তির মনোভাবের কারণেও সৃষ্টি হয়। তাই সচেতনভাবে দু’পক্ষ চাইলেই অনেকটা কাছে চলে আসা যায়, প্রজন্মের দূরত্বকে বিদায় জানিয়ে।
