Loading...
The Financial Express

জীবন জড়িয়ে লালনকথা

| Updated: October 18, 2021 18:57:33


জীবন জড়িয়ে লালনকথা

জাত গেল জাত গেল বলে, এ কী আজব কারখানা...- সত্যিই জাত যাবার বড় ভয় আমাদের; তা সে বিত্তের জাত হোক বা ধর্মের। আর লালন এই মজ্জাগত ভয়কে প্রশ্ন করেছিলেন, তাঁর বাউল মনের মধ্য থেকে ভেসে আসা গানের সুরে।

তিনি এক কঠোর প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছিলেন সব শ্রেণির সব লোকের দিকে, জাত কারে কয়? ব্যক্তিজীবনে জাতপাতের বিভেদ তাঁকে বড্ড কষ্ট দিয়েছিল, তাই হয়তো আরো মরমে অনুভব করেছিলেন জাতের সীমারেখা আঁকার দুঃখটা। সে রেখা ছাপিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন সকলের প্রিয় লালন ফকির।

মানবজাতির গা ছুঁয়ে নিত্য ওঠাবসায় লালন ও তাঁর সৃষ্টি যেমন বিরাজ করে, তেমনি আবার দূর আকাশের পারে অজানা স্রষ্টার সকল সৃষ্টিরহস্যেও তাঁর বড় আগ্রহ। প্রাক-আধুনিক বাংলার সুফিবাদকে আশ্রয় করে তাঁর ভাবনার রথ চলত। তিনি মানুষের দেহের মধ্যে, মনের মধ্যে খুঁজতে চেষ্টা করতেন সংযোগকারী কোনো অদৃশ্য তার- যা তাকে নিয়ে যাবে সেই অসীমের কাছে।

চিরদিন গানে গানে, একতারার ঝঙ্কারে তিনি খুঁজে চলেছেন এক অচিন পাখিকে, খাঁচার ভেতর যার নিত্য আসা-যাওয়ার পরও সে থেকে যায় অধরা। কখনো মনে হয়, সেই অচিন পাখি যেন আমাদের আত্মা, আর আমাদের দেহ তার থাকার জন্য এক খাঁচা। অবশ্য দেহ আর আত্মার এই সম্পর্ক, এর অন্তিম পরিণতি লালন বারবার তুলে এনেছেন গানের ছুতোয়। যেমন এই গানটিতে খাঁচা আর পাখির বদলে রূপক হয়ে যায় ‘ভাঁড়’ও ‘কর্পূর’- খালি ভাঁড় থাকবে রে পড়ে/ দিনে দিন কর্পূর তোর যাবে রে উড়ে। 

তাঁর গানে সাবলীলভাবে এসেছে বিভিন্ন লোককথা, এমনকি ধর্মীয় উপকথাও। যেমন এই গানে হিন্দুধর্মের কৃষ্ণ অবতারের শৈশবে পাওয়া ‘ননীচোর’তকমা আর সেসব কাহিনীর নির্যাস উঠে এসেছে- আর আমারে মারিসনে মা/ বলি মা তোর চরণ ধরে, ননী চুরি আর করব না।

আপন সুরতে আদম গঠলেন দয়াময়/ তা নইলে কি ফেরেশতারে সেজদা দিতে কয়।- মানুষের মাঝে মানুষ হয়ে মানুষ খোঁজার সে যাত্রায় আজকের অধুনা জগতে ভেসে আসা ধুয়ো ‘মানবতাবাদ’ যেন বহু বছর আগেকার লালনের ভাষ্যে হয়ে ওঠে তাঁর ‘আদ্যধরম’- আদম, অর্থাৎ মানুষ চিনলেই যে ধর্ম পালন করা যায়। তাইতো কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্বের অবকাশ না রেখে অকপটে তিনি বলে দেন, মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি।

জীবনবোধের যে রত্ন আমরা জীবনের বড় কাছে বসেও চিনতে পারি না, রবি ঠাকুরের সেই খ্যাপা সাধুর মতো ছুঁড়ে ফেলে দিই পরশপাথর- লালন সে বোধের দ্বারেও বারবার নেড়েছেন কড়া, শুধেছেন সহজ অথচ দরকারি সব প্রশ্ন। লালনের রচনার মূল উপাদান বোধকরি সহজ সত্য, যে সত্য আবার খুব সহজে বলা যায় না, শোনা যায় না। তবু সে সত্যের খোঁজেই আমাদের জীবনের পথ পেতে চায় গন্তব্যের হদিস।

ভালো-মন্দ, আলো-আঁধার, সত্য-মিথ্যা; প্রতিটি মুদ্রার দুটো পিঠ থাকে এবং এই দুই পিঠের মাঝে এতটাই কম দূরত্ব যে সবসময় ফারাক করা যায় না। তখন দুটো বিষয় মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়, আর গানের ছলে একেই লালন বলেছেন, বিষামৃত আছে রে মাখাজোখা।

জন্মের পর থেকে আমাদের পরিচয় হতে থাকে নতুন সব বস্তু, ধারণা ও ব্যক্তির সাথে। সেই চেনাজানার পর্যায়গুলো পেরোতে পেরোতে একদিন নিজের ঘরে তাকিয়ে মনে হয়, বহুদিন ঝাঁট দেয়া হয়নি এই আঙিনা। ঠিক যেমন লালন বলেছেন তাঁর গানে, আমার ঘরখানায় কে বিরাজ করে।/ জনম ভরে একদিনও তারে দেখলাম না রে। তখন আজীবন ‘জন্ম অন্ধ মন’নিয়ে ব্যক্তি অনুভব করে, আপনারে আপনি চিনিনে।

সে আত্মসংশয়ের পথও কিন্তু লালন অন্য গানে ঠিকঠাক বাতলে দিয়েছেন, যাকে সহজ কথায় বলা যায় ‘আত্মমূল্যায়ন’- আপন ঘরের খবর নে না। অনা'সে দেখতে পাবি কোনখানে সাঁইর বারামখানা।

এই বাউল তাঁর একতারার সুরে, চলমান গানের স্রোতে বড় সহজে মিশিয়ে দিয়েছিলেন সব ধর্মকে, নতুন করে নির্মাণ করেছিলেন অসাম্প্রদায়িকতার এক সংজ্ঞা। সময়ের সাথে তাঁর প্রাসঙ্গিকতা হারায়নি, বরং আধুনিকতার মারপ্যাঁচে, এক আঁজলা স্বস্তির খোঁজে বারবার ফিরে যাওয়া যায় লালনের কাছে। দেশের চলমান অস্থির এই সময়ে লালনকে বড় দরকার মনে হয়। চর্চার মাধ্যমে, বারংবার অনুধাবনের মাধ্যমে তাঁকে বাঁচিয়ে রাখা জরুরি।

অনিন্দিতা চৌধুরী বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী

anindetamonti3@gmail.com

Share if you like

Filter By Topic