Loading...

জিশা টিপট: যে চায়ের পাত্রের দাম কোটি টাকার ঘরে!

| Updated: July 27, 2022 16:18:33


ছবি: ইউবাই ভিয়েতনাম ছবি: ইউবাই ভিয়েতনাম

কাদামাটির তৈরি ছোট্ট একটি জিনিস যা কিনা হাতের তালুতে দিব্যি এঁটে যায়, তার দাম ৯০,০০০ মার্কিন ডলার (টাকার মূল্য যা প্রায় এক কোটির কাছাকাছি)। বিষয়টি চমকে দেওয়ার মতোই। লালচে বেগুনি রঙের এক বিশেষ ধরনের কাদামাটি দিয়ে তৈরি টিপটের দাম কারুকার্য ভেদে ১৫০ থেকে ৯০,০০০ মার্কিন ডলার হয়। দামের অংকটা শুনে স্বভাবতই জানতে ইচ্ছে করে কোন বিশেষত্বের কারণে এর মূল্য এত বেশি!

‘জিশা’ নামক এক ধরনের পাথুরে কাদামাটি দিয়ে তৈরি করা হয় বলে এর নাম জিশা টিপট। এটি চায়নার অন্যতম হাতে তৈরি এক বিশেষ টিপট এবং ইক্সিং মৃৎশিল্পের অংশবিশেষ। চায়নার বিখ্যাত ‘গং ফু চা’ বানানোর একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ এই জিশা টিপট। ইতিহাসবিদদের মতে, প্রাচীনকালের সর্বপ্রথম বানানো টিপটগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম এবং চায়নার মিং সাম্রাজ্য চলাকালীন কোনো এক প্রতিভাধর শিল্পীর হাতেই এমন সুন্দর জিনিসের সৃষ্টি হয়েছে। সেসময় চায়নায় ধীরে ধীরে পোর্সেলিনের জায়গা দখল করে নেয় এবং জনপ্রিয় হয়ে উঠে এই টিপট।  

এই টিপট তৈরির উপকরণ এবং চমৎকার কারুকার্যের কারণে এটি বহুমূল্য এবং অবিস্মরণীয়ও বটে। যে লালচে বেগুনি কাদামাটি দিয়ে এই টিপট বানানো হয় তা এক ধরনের বিরল কাদামাটি যা সাংহাই শহরের উত্তর পশ্চিমাঞ্চল থেকে প্রায় ১০০ মাইল দূরে অবস্থিত তাইহু হ্রদের কিনার থেকে সংগ্রহ করা হয়। কাদামাটির এই খাদ বা খনিগুলো প্যালিওজোয়িক ডিভোনিয়ান যুগের, অর্থাৎ আজ থেকে প্রায় ৩৫ লক্ষ বছর আগে প্রাকৃতিকভাবে এগুলো তৈরি হয়েছিল।

সূক্ষ গঠনবিন্যাস ও ছিদ্রযুক্ত হওয়ায় এই কাদামাটি উচ্চগুণ সম্পন্ন এবং খুব সহজেই যেকোনো আকৃতি প্রদান করা যায়। এই কাদামাটিতে অক্সিডাইজড আয়রন থাকে যার ফলে বিভিন্ন মাত্রায় আগুনে পোড়ালে ভিন ভিন্ন রঙের পাত্রে রূপান্তর হয়। জিশা টিপট সাধারণত গাঢ় বাদামী লাল-বেগুনি ও লালচে কমলা রঙের হয়।

এই টিপটগুলো হাতে বা মেশিনের সাহায্যে বা উভয় পদ্ধতির সমন্বয়ে বানানো হয়। প্রত্যেকটি অংশ আলাদা আলাদাভাবে বানিয়ে পরে সবগুলো একত্রে জোড়া লাগিয়ে বানানো হয় এই জিশা টিপট।

জিশা টিপটের আকার ছোট হয় এবং এটা এতটা ছোট যে তা হাতের তালুতে নিমেষেই ধরা যায়। এতে একবারে কেবলমাত্র এক কাপ সমপরিমাণ চা বানানো যায়। এই কাদামাটি সূক্ষ ছিদ্রযুক্ত হওয়ার কারণে তা দিয়ে তৈরি টিপটে চায়ের সুঘ্রাণ খুব সুন্দরভাবে বজায় থাকে। এই টিপটগুলো টেকসই এবং উচ্চ তাপমাত্রাতেও এটা নষ্ট হয় না। সঠিকভাবে ব্যবহার করলে দীর্ঘদিন পরেও এই টিপট ঠিক একইভাবে কাজ করে।

এ তো গেল এই বিশেষ টিপটের গঠনগত ও গুণগত দিক। এবার আসা যাক এর সৌন্দর্যগত বর্ণনায়। একজন শিল্পী তার কল্পনাশক্তি আর দক্ষতার সমন্বয়ে এই পাত্রের গায়ে দৃষ্টিনন্দন সব নকশা ফুটিয়ে তোলেন। এসব টিপটের গায়ে জ্যামিতিক প্যাটার্নে আঁকা জীবন্ত সব জিনিসের অবয়ব থেকে শুরু করে যেকোনো নকশারই দেখা মেলে। নিত্যদিনের ব্যবহারের জন্য কিছু পাত্র যেমন খুব সাধাসিধে বা একদম নকশা ছাড়াই বানানো নয়, তেমনি কিছু পাত্র হয়ে উঠে সেরা শিল্পকর্মের অনন্য নিদর্শন।

আর এইসব কারণে জিশা টিপটের মূল্য সূচক সেই অতীত থেকেই ঊর্ধমূখী। অতীতে বলা হত, একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের তাবত সম্পদের সমমূল্য হচ্ছে একটি জিশা টিপট।

শবনম জাবীন চৌধুরী ইউনিভার্সিটি  অব এশিয়া প্যাসিফিকের ফার্মেসি বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন।

zabin860@gmail.com

Share if you like

Filter By Topic