নব্বই দশকের শিশুরা অনেকটা না পুরনো- না আধুনিক ছাঁচে বেড়ে উঠেছিল, তাই জীবনের রঙিন সময়গুলো নিয়ে বেড়ে ওঠাদের জন্য সেই সময়ের জাদু কাটেনি। অনেকটা চোখের পলকে ৩০টি বছর কেটে গেলেও নস্টালজিয়া ঘিরে নাইন্টিজ এখনো তুলনাহীন।
আজকের এ লেখায় আমরা ঢুঁ মারব নাইন্টিজের খুব পরিচিত আর সুলভ খাবারের গলিতে, যার স্বাদ-গন্ধ-রঙ ছড়িয়ে আছে আমাদের শৈশবে।
হাওয়াই মিঠাই
টুংটাং আওয়াজে এক ম্যাজিকম্যান এগিয়ে আসছে। কাঁধে তার কাঁচের একটা বাক্স। বাক্সের বাইরে নীল কাঠের ফ্রেম, আর তার ভেতরে থরে থরে সাজানো কিছু গোলকাকৃতির তুলোট বল। দেখলেই মনেহয় বিশেষ কিছু। জায়গাভেদে আটআনা বা এক টাকা করে বিক্রি হতো।
আজকাল বড় বড় কাঠিতে করে যেসব ভিন্নরঙা পলিথিনে ভরা মেঘ দেখা যায়, ওগুলোরই পূর্বসুরী এরা। নামটাও একদম মানানসই, হাওয়াই মিঠাই। হাতের মুঠোয় ধরতেই লাজুকলতার মতো মিইয়ে যেত, মুখে পুরতে না পুরতে সব ভেলকি উধাও! শুধু জিভে লেগে থাকা মিষ্টি একটা স্বাদ, শৈশবের মতোই।
কটকটি
কিছুদিন আগে অনলাইনে একটা জিনিস বিক্রি নিয়ে মোটামুটি হাসাহাসি হয়ে গেলেও, তাদের ব্যবসা খুব একটা মন্দ চলেনি। কেননা শখের মতো স্মৃতির দামও বেশ উঁচু। যে জিনিসটার কথা বলছি, তা একটি অদ্ভুত খাদ্যবস্তু এবং তার বিনিময়মূল্য সেই সময়টাতে টাকাপয়সার চেয়ে বেশি ছিল রদ্দি কাগজ বা পুরনো কাপড় বা আপাতদৃষ্টিতে ফেলনা জিনিসপাতিতে। সেসব জমিয়ে রাখাই হতো যাতে মন ভরে কটকটি খাওয়া যায়। তাই টাকা দিয়ে কোনোদিন কটকটি কিনে খাবেন, সেকথা বোধহয় তৎকালীন বাসিন্দারা কখনো ভাবতেও পারেননি।
ছান্দসিক নামখানা এসেছে এর খাওয়ার শব্দ থেকে, শক্তপোক্ত খাবারটি খেতে মুখ থেকে শব্দ হতো কট-কট। দুই কাঁধে ভাঁড় ঝুলিয়ে ঘুরে বেড়াতেন যে ভাঙারি কিংবা রদ্দি-সংগ্রাহকেরা, তাদের ঝুলিতেই থাকত এ বস্তু। তাজা সংবাদপত্র পড়া হোক বা না হোক, পুরনো কাগজের মূল্য বেশ বুঝত বাড়ির ছেলেপুলেরা। তাইতো হাতে হাতে বিনিময়ে মুখভর্তি কটকটিতে পার হয়ে যেত শৈশবের ব্যস্ত বিকেলগুলো।
শনপাপড়ি
এ অবশ্য সুন্দর প্যাকেটের ভেতর থাকা সাজানো-গোছানো শনপাপড়ির কথা হচ্ছে না। এ বস্তু থাকত প্লাস্টিকের বোয়ামে। পাড়ার চেনাজানা চাচা-মামার দোকানের সামনের দিকেই থাকত বোয়ামটা। দুটাকা-তিনটাকা দিলে পত্রিকা কাটা কাগজে মুড়িয়ে দু পিস দিয়ে দিত। গোল মোটা চাকতির মতো শনপাপড়ি বস্তুত চিনিমিশ্রিত ময়দার ঢেলা ছাড়া তেমন কিছু নয়। তবে সাথে লেগে থাকা গুঁড়ো চেটে খাওয়া শিশুদের কাছে পৃথিবীর সবচাইতে ভালো মিষ্টি ছিল এটা।
বাবলগাম/ চুইংগাম
আজকাল শিশুরা কি আগের মতো চুইংগাম খায়? সে খেতেই পারে, তবে নব্বই দশকে চুইংগামের প্রতি আকর্ষণের কারণটা ঠিক খাদ্যবস্তুটি (অথবা চর্ব্যবস্তু) ছিল না। ছিল এর সাথে পাওয়া ট্যাটু। বিভিন্ন কার্টুন অবয়ব, পছন্দের কমিক চরিত্র, ফুল বা পশুপাখির ছবি। সবচেয়ে দুঃখে পড়তে হতো তখন, যখন সেই ট্যাটুতে কোনো সম্পূর্ণ ছবি না পেয়ে অর্ধেক অর্ধেক পাওয়া যেত। শিশুমনের নান্দনিক বোধে তাতে বেশ ছেদ পড়ত, এতে কোনো সন্দেহ নেই। বাবলগামের বাবল ফুলিয়ে নাকেমুখে আঠালো
এছাড়া আরেকটি বিশেষ ধরনের চুইংগামের কথা না বললেই নয়। ধরুন, আপনার কোনো বন্ধু যেচেপড়ে আপনাকে চুইংগাম সাধছে। সবুজ রঙের একেবারে সাধারণ চুইংগামের প্যাকেট থেকে এক স্ট্রিপ গাম বেরিয়ে আছে। আপনি খুশি হয়ে ওটা যেই টানতে যাবেন, ওমনি শক! ছোটখাটো একটা আকারে নিরাপদ এবং প্রকারে অপমানজনক ইলেকট্রিক শক খেয়ে আপনি বেশ হড়কে গেলেন, আর বন্ধুটির জয়ের হাসি কে দেখে! মজা করে বলা যায়, এ প্রজন্মের অবিশ্বাসী মনোভাব সেই চুইংগাম (নাকি নয়?) বিষয়ক প্রতারণা থেকেই জন্মেছে।
হজমি গুঁড়া
সাধারণত হজমি বলতে আমরা ফার্মেসিতে রাখা ট্যাবলেট বা কাঁচের বোয়ামে রাখা বড়িগুলো বুঝি, এটা ঠিক তা নয়। এ যেন ভিনগ্রহেরই কোনো বস্তু। শহুরে অঞ্চলে কেমনটা মিলত সে জানা নেই, তবে গ্রামাঞ্চলে এর জনপ্রিয়তা ছিল তুঙ্গে। মাত্র এক টাকায় বিশাল লম্বা পলিথিনের প্যাকেট মিলত, যাতে অন্তত ১০টি ছোট প্যাকেট তো থাকতই। আর ভেতরের বস্তুটির চেহারা আরো সহজভাবে বোঝাতে গেলে বলা যায়, কয়লার গুঁড়ো। এর স্বাদ যারা জিভে গ্রহণ করেছেন, তাদের নিশ্চয়ই পড়তে গিয়েই মুখে জল চলে এসেছে। ঠিক এমনই ছিল স্বাদটা। পুরোটাই অম্লীয়, এবং ভীষণ তীব্র। তাই খালি খালি খাওয়া যেত না।
বন্ধুরা মিলে হজমি পার্টিই হতো যেন। একটা কাগজে কালো গুঁড়োগুলো নিয়ে, বাসা থেকে চুরি করে আনা লবণ মরিচের গুঁড়ো সঠিক অনুপাতে মিশিয়ে নিতে হতো। এ কাজ যে করবে, তাকে হতে হবে এ বিষয়ে অভিজ্ঞ ও পটু। মেশানোর পর শুরু হতো বিলিব্যবস্থা।
সে সময়ে আশেপাশের সব পাড়া-পড়শি বাচ্চা-কাচ্চারাই ছুটে এসে হাত পাততো। এবং বণ্টনকারী অতি সুচারুভাবে সেই গুঁড়ো বিলি করতেন, পাতে কারো কম পড়ত না। আঙুল দিয়ে সবাই চেটে চেটে একটা ভীষণ মজার কিছু খাচ্ছে, স্বাস্থ্য বা নিরাপত্তার কোনো চিন্তাই নেই কারো মুখমণ্ডলে। এ বিষয় বাবা-মায়েদের জন্য যে খুব দুশ্চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়াত, তাতে সন্দেহ নেই। তাইতো ও বস্তুটি ছিল পারিবারিকভাবে নিষিদ্ধ।
কাঠি আইসক্রিম
সাইকেলের ঘণ্টি বাজিয়ে আওয়াজে আরেক জাদুকরও আসতেন স্কুলের মাঠে, গ্রীষ্মের দুপুরগুলোয়। তার কাছে এক নিজস্ব হিমঘর, আর তাতে বন্দী হরেক রকমের স্বাদ-নির্যাস। সবচেয়ে বেসিক আইসক্রিম ছিল চিনি মেশানো বরফ। সবচেয়ে কম মূল্যেরও। তবে একটু বিলাসিতা করতে চাইলে রঙ আর স্বাদের বাহারে আম-লিচু-কমলা যেমন ছিল, তেমনি ছিল কোকাকোলা স্বাদের কাঠি-বরফও।
সবচাইতে বিশেষ আকর্ষণ বোধকরি ছিল হালকা কাগজের প্যাকেটে মোড়ানো মালাই আইসক্রিম, উপরে নারকেলের কুচি ছড়ানো। পকেটে একটু পয়সা থাকলেই ঠোঁট দুটো রঞ্জিত হতো হরেক রঙে, ওতে শিক্ষকের বকুনি উপরি পাওনা।
পথেঘাটে পাওয়া শৈশব-সংস্কৃতিতে মিশে থাকা কোনো খাবারই খুব একটা স্বাস্থ্যকর ছিল না, তবে বোধকরি উদরযন্ত্রের সক্রিয়তা একটু বেশিই ভালো ছিল! নয়তোবা পথের স্বাদেই তা অভ্যস্ত হয়েছিল জীবনের প্রথম দিকটায়। ক্রমশ আধুনিকতার দিকে যাত্রা করতে করতে মাঝে মাঝে ক্লান্ত বিকেলে নাড়া দিয়ে যায় হাওয়াই মিঠাই কিংবা আইসক্রিমওলারা। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে চলা জিভ এখন কিছুটা দেশান্তরী হলেও সেইসব ফেলে আসা ভিটেমাটি মনে করে সে-ও খানিক অশ্রুপাত না করে হয়তো পারে না।
অনিন্দিতা চৌধুরী বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী।
anindetamonti3@gmail.com