একটি আমের বাক্স আর তাতে কিনা রয়েছে মাত্র দুটি আম! আবার সেই দুটি আম বিক্রি হলো ৩,৭৪৪ ডলারে! এও কী সম্ভব! সাধারণ মানুষ মাত্রই এ কথা জানলে রীতিমত চক্ষুচড়ক গাছ হয়ে উঠবে। ২০১৭ সালে জাপানে সর্বোচ্চ দামে বিক্রিত এই আমের নাম মিয়াজাকি আম। জাপানিজ ভাষায় একে বলা হয় ‘তাইয়ো-নো-তামাগো’ যার অর্থ হচ্ছে সূর্যের ডিম।
জাপানের মিয়াজাকি শহরে এই আমের চাষ হয়। এটি সেদেশের বহুল জনপ্রিয় একটি আম। বলা হয়ে থাকে ১৯৭০ থেকে ১৯৮০, এই দশকেই প্রথম মিয়াজাকি আমের চাষ শুরু হয়। সাধারণত এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত এই আম পাওয়া যায় তবে মে-জুনে সবেচেয়ে বেশি বিক্রি হয়। বিলাসবহুল ফলের দোকানে স্বচ্ছ কাঁচের ঘরে সুন্দর তাকে খুব সুন্দর করে এই আমগুলোকে সাজিয়ে রাখা হয়।
একেকটি মিয়াজাকি আমের ওজন সাধারণত ৩৫০ গ্রামের কাছাকাছি হয় এবং মিষ্টতার দিক দিয়ে অন্যান্য আমের তুলনায় প্রায় ১৫ শতাংশ বেশি মিষ্টি হয়। আমগুলো হলুদ বা সবুজ রঙের না হয়ে জলন্ত আগুনের মতো গাঢ় লাল হয়ে থাকে। আরেকটা মজার ব্যাপার হচ্ছে ডিমগুলো দেখতে অনেকটা ডাইনোসরের ডিমের মতো।
সূর্যডিমে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, বেটা-ক্যারোটিন ও ফলিক এসিড।
সাধারণত কেজিতে আম কেনা হলেও এই সূর্যের ডিম আম বিক্রি হয় জোড়ায় জোড়ায়। প্রতি জোড়া আম বাংলাদেশি টাকার হিসেবে বললে ১০,০০০ থেকে ৩,৫০,০০০ টাকায় বিক্রি হয়। তবে এই আমের দাম এতো বেশি হওয়ার কারণ কী?
এটি হয়তো কোনো বিরল প্রজাতির আম তাই এর এতো দাম – এমনটা ভেবে থাকলে সেই ধারণাটা কিন্তু একদম ধোপে টিকবে না। মূলত এই আম চাষের পেছনে যে শ্রম ব্যয় হয় এবং শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যে পরিমাণ যত্নে এই আম পরিণত হয় সেই কারণেই দামটা সকলের চোখ কপালে তুলে দেওয়ার মতো অবস্থার সৃষ্টি করে।
মিয়াজাকি আম চাষের জন্য প্রয়োজন হয় দীর্ঘ সময় যাবত সূর্যালোকের উপস্থিতিতে থাকা, উষ্ণ আবহাওয়া এবং পর্যাপ্ত বৃষ্টি।
আম চাষীরা শুরুতেই প্রতিটি আমকে ছোট একটি জালি ব্যাগ দিয়ে ঢেকে দেয়। যার ফলে আমের প্রতিটি কোণায় কোণায় সূর্যের আলো এসে পড়ে এবং পুরো আমের গায়ের রং অনেকটা রুবি পাথরের মতো লাল হয়। এই জালি ব্যাগ ব্যবহারের আরো একটি সুবিধা রয়েছে, গাছ থেকে আম পড়ার সময় গায়ে কোনো আঁচড় লাগে না।
সাধারণত আম পাকতে শুরু করলে গাছ থেকে আম পাড়া হয়। কিন্তু এই আমগুলো পেকে পড়ে গেলে সংগ্রহ করা হয়। এতে আমের সম্পূর্ণ পক্কতা নিশ্চিত হয়। এই আমগুলো খেতে কিন্তু চমৎকার সুস্বাদু।
উপহার হিসেবেও এই আমের রয়েছে বিশেষ কদর। জাপানে উচ্চ মানের এবং দামী ফল উপহার হিসেবে প্রদান করাটাকে সম্মান প্রদর্শনের প্রতীক বলে মনে করা হয়। বিভিন্ন ব্যবসায়িক অনুষ্ঠান, বিশেষ উপলক্ষ, সামাজিক প্রথা বা সফর শেষে ফিরে আসার পর এই আম উপহার হিসেবে প্রদান করার রেওয়াজ রয়েছে।
যাদেরকে এই উপহার দেওয়া হয়, তারা এই আমগুলোকে সুন্দর করে সাজিয়ে রাখেন। উপহারের এই বিশেষ ফলগুলোকে তারা হয়তো কখনোই গ্রহণ করেন না। চাষ পদ্ধতির পাশাপাশি উপহার হিসেবে এর কদরের কারণে মিয়াজাকি আমের এতো দাম!
শবনম জাবীন চৌধুরী ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের ফার্মেসি বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন।
zabin860@gmail.com
