জলবায়ু পরিবর্তনের গতিপথ বুঝতে কম্পিউটার মডেল


ক্যামেলিয়া হডসন ও আলেকজান্ডার হিল | Published: August 12, 2021 12:06:35 | Updated: August 12, 2021 15:33:28


জলবায়ু পরিবর্তনের গতিপথ বুঝতে কম্পিউটার মডেল

চরম আবহাওয়াজনিত ঘটনা দ্রুত বাড়ছে এবং রেকর্ড সৃষ্টি হচ্ছে। প্রায় বিনা ঘোষণায় নেমে আসা জাতীয় প্রাকৃতিক দুর্যোগমালার সঙ্গে বৈশ্বিক জলবায়ু উষ্ণতার সরাসরি সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার জটিল কার্যক্রমের দিকেও নজর পড়ছে। এ প্রেক্ষাপটে অনেক গবেষক আরো নির্ভুল কম্পিউটার ভিত্তিক মডেল ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করছেন।

কখন চরম আবহাওয়াজনিত ঘটনাবলী ঘটে আর জলবায়ুর পরিবর্তন না ঘটলে এগুলো কি আরো শক্তিশালী, দীর্ঘায়িত ও মারাত্মক হতো এমন সব প্রশ্নের দিক আলোকপাত করতে গিয়ে যুক্তরাজ্যের এনভায়রনমেন্ট এজেন্স এর প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডগ উইলসন বলেন, চরম আবহাওয়াজনিত প্রায় প্রতিটি ঘটনার পরই এমন প্রশ্ন ওঠে... সে সব ক্ষেত্রে পরিবর্তিত জলবায়ুর ক্ষেত্রে আমরা কী দেখতে পাবো বলে আশা করছি, তাই বলার চেষ্টা করা হয়। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলেই সুনির্দিষ্ট কোনো ঘটনা ঘটছে এমনটি বলার চেষ্টা আমরা করছি না।

ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন ইনিশিয়েটিভ (ডব্লিউডব্লিউএ) এর বিজ্ঞানীরাসহ অন্যান্যরাও চরম আবহাওয়াজনিত ঘটনাবলী ব্যবচ্ছেদে তাদের সময় ব্যয় করছেন বা এর কাছাকাছি ধরণের তৎপরতা চালাচ্ছেন। এর কারণ হলো, বিশ্বের কোনো ঘটনাই শুধু জলবায়ু বদলে যাওয়ার ফলে ঘটে না।

উত্তর আমেরিকার তাপপ্রবাহের কারণেই কানাডার লিটন গ্রামের তাপমাত্রা গা-ঝলসানো ৪৯.৬ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডে গিয়ে ঠেকেছিল। জুলাই মাসে ডব্লিউডব্লিউএ এ বিষয়ে বলেছিল যে মানুষের তৎপরতায় জলবায়ুর পরিবর্তন ছাড়া তাপমাত্রা এমন গা-ঝলসানো পর্যায়ে যেতে পারে না।

আবার গত বছরের সাইবেরিয়ার তাপপ্রবাহ নিয়েও এ গোষ্ঠী একই রকম ঘোষণা দেয়। সাইবেরিয়ার ভেরখোয়ানস্কে তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল। ডব্লিউডব্লিউএ বলেছিল, জলবায়ুর পরিবর্তন ছাড়া এরকম তাপমাত্রা ওঠা প্রায় অসম্ভব।

অবশ্য, এই দুই ক্ষেত্রে এমন কঠোর ভাষাব্যবহার অর্থাৎ সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনকে দুযোর্গের নিয়ামক হিসেবে উল্লেখ করাকে ভিন্নভাবে দেখা হয়েছে। ডব্লিউডব্লিউএ-র সঙ্গে সক্রিয় কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ু বিজ্ঞানী ফ্লাভিও লেহনার তাপপ্রবাহ সংক্রান্ত এ বক্তব্যকে অস্বাভাবিক হিসেবে বর্ণনা করেন।

যোগসূত্র চিহ্নিত করা অনিবার্য নয়: বিজ্ঞানীরা বলেন, ২০১৪-১৫ সালে ব্রাজিলের তীব্র খরার সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের উল্লেখযোগ্য যোগসূত্র নেই। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাহিদাই আংশিক ভাবে এ খরার সৃষ্টি করেছে।

এ সব আবহাওয়া-ডিটেকটিভ বা সত্যানুসন্ধীর তৎপরতার বিশাল অংশই নির্ভর করে কম্পিউটার ভিত্তিক জটিল মডেলব্যবস্থার ওপর।

[বলা দরকার যে গবেষণার একটি ক্ষেত্র হলো অ্যাট্রিবিউশন বা আরোপণ বিজ্ঞান। প্রধানত জলবায়ু গবেষণায় এই ক্ষেত্রটি ব্যবহৃত হয়। খরা, ভয়াবহ বন্যা, সামুদ্রিক ঝড়, অতি তাপ বা ঝড়ের অপ্রচলিত গতিপথ জাতীয় চরম আবহাওয়ার কিছু ঘটনা জলবায়ু পরিবর্তনে জন্য দায়ী হতে পারে কিনা তা পরীক্ষা করার চেষ্টাই এর মাধ্যমে করা হয়।]

জলবায়ুর গবেষণাকালে আরোপণ বিজ্ঞানীরা বিশ্বের জলবায়ু ব্যবস্থার কম্পিউটার মডেল বা সিমুলেশন তৈরি করেন। এতে বিশ্বের হাজার হাজার কাল্পনিক দিনের দৃশ্যকল্প তুলে ধরা হয়। ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতিতে একটি নির্দিষ্ট মাত্রার ঘটনা কতবার ঘটতে পারে তা বের করার জন্য এমনটি করা হয়।

২০০ বছর আগে বিশ্বে মানবসৃষ্ট উষ্ণ পরিস্থিতি শুরুর পূর্বের দৃশ্যকল্প, বিশ্বের বর্তমান পরিস্থিতি এবং ভবিষ্যতের দৃশ্যকল্প এতে তুলে ধরা হতে পারে। এতে বিশ্ব ১.২ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড উষ্ণ হয়ে উঠেছে বলে এরই মধ্যে দেখা গেছে। প্রতি দৃশ্যকল্পে এমন ঘটনা কতোবার ঘটতে পারে গবেষকরা তা তুলনা করে দেখেন। জলবায়ুর পরিবর্তন ফলে এ ধরণের ঘটনা আরও বেশি ঘটতে পারে কিনা সে বিষয়ে বিজ্ঞানীরা সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর চেষ্টাও করেন।

এ সব মডেল নিখুঁত নয়। এর মাধ্যমে বৈশ্বিক জলবায়ুর পরিবর্তনকে আন্দাজ করা যায় তবে স্থানীয় আবহাওয়ার ক্ষেত্রে বিশদ বিবরণের অভাব এ ধরণের মডেলে থেকে যায় বলে জানান অস্ট্রেলিয়ার মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থ অ্যাটমোস্ফিয়ার অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টের অধ্যাপক ক্রিশ্চিয়ান জ্যাকব।

উদাহরণ হিসেবে দাবানলে কথা তুলে ধরা যায়। বিশদ বিবরণের মডেল ছাড়া দাবানল বিশ্লেষণ করা বেশ কষ্টসাধ্য। এ ধরণের দাবানল তুলনামূলক ক্ষুদ্র অঞ্চলজুড়ে ঘটে থাকে। স্থানীয় আবহাওয়া এবং দাবানলসৃষ্ট পরিস্থিতি এ ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করতে পারে।

আবহাওয়াজনিত ঘটনা দ্রুত বাড়ছে এবং রেকর্ড সৃষ্টি হচ্ছে। আর এ প্রেক্ষাপটে অনেক গবেষক আরো নির্ভুল মডেল ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করছেন।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ু পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক রয়েল সোসাইটির গবেষক টিম পামার বলেন, সাম্প্রতিক চরম আবহাওয়াজনিত ঘটনাবলীয় দায় জলবায়ু পরিবর্তনের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না। তিনি বলেন, আমাদের কাছে যে সরঞ্জাম এবং যন্ত্রপাতি আছে তা পর্যাপ্ত নয়।

একই সাথে তিনি আরও বলেন, এ সব ঘটনার সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের কোনো যোগ নেই এমনটি মনে করাও ভুল উপসংহারে পৌঁছানহবে। শক্তিশালী কম্পিউটার মডেল এ সব প্রশ্নের জবাব দিতে হয়ত পারবে। তবে সে জন্য ব্যাপক প্রক্রিয়াকরণ শক্তির প্রয়োজন। এ কাজে ব্যবহারের জন্য সুপার কম্পিউটার দরকার যা তৈরি এবং ব্যবহার দুইই খুবই ব্যয়বহুল।

লেহনার বলেন, জলবায়ু বিজ্ঞানের জন্য আমাদের উল্লেখযোগ্য আরো অনেক বেশি তহবিল দরকার। জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে এবং সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া চরম আবহাওয়াজনিত দুর্যোগকে বুঝতে পারা এবং এ বিষয়ে পূর্বাভাস দেওয়ার ক্ষেত্রে আমরা জ্ঞানদ্বারা সীমাবদ্ধ নই বরং কম্পিউটার ব্যবহার করার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ। অর্থাৎ আমাদের সীমাবদ্ধতা সম্পদের সীমাবদ্ধতা ।

জলবায়ু গবেষণার অর্থ সংগ্রহের জন্য আন্তর্জাতিক জলবায়ু মডেলিং কেন্দ্র নির্মাণের আহ্বান জানায় যুক্তরাজ্যের স্বতন্ত্র বৈজ্ঞানিক অ্যাকাডেমি রয়েল সোসাইটি। চলতি বছর নীতিনির্ধারকদের বিফ্রিংকালে এ আহ্বান জানান হয়। এই ব্রিফিংয়ে বলা হয়, জলবায়ু পরিবর্তন দ্রুতবেগে বাড়ছে, এ সময়ে ব্যাপক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতার জন্য বিশদ এবং নির্ভুল তথ্য এখন বিশ্বের প্রয়োজন হয়ে দেখা দিয়েছে। কোনও কোনও ঘটনা বিস্তারিত ভাবে তুলে ধরতে কম্পিউটার মডেলের অক্ষমতাই ভবিষ্যতে জলবায়ু বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করবে। বিশেষ করে এটি ঘটবে আঞ্চলিক এবং স্থানীয় পর্যায়ে।

[ফাইনান্সিয়াল টাইমসে (এফটি) প্রকাশিত নিবন্ধের বাংলায় রূপান্তর করেছেন সৈয়দ মূসা রেজা।]

Share if you like