সাম্প্রতিক মাসগুলোতে চরম আবহাওয়াজনিত ধারাবাহিক ঘটনাবলীর দিকে দুনিয়ার নজর পড়েছে। এ নিয়ে বৈজ্ঞানিক এবং রাজনৈতিক আলোচনায় উঠে এসেছে জলবায়ুর ভূমিকার কথা । অথচ ইতিপূর্বে বৈজ্ঞানিক বা রাজনৈতিক আলোচনায় জলবায়ুর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে খুব কমই। প্রায় বিনা ঘোষণায় নেমে আসা জাতীয় প্রাকৃতিক দুর্যোগমালার সঙ্গে বৈশ্বিক জলবায়ু উষ্ণতার সরাসরি সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার জটিল কার্যক্রমের দিকেও নজর পড়ছে।
চীনের হেনান প্রদেশে গত মাসে বন্যার ফলে প্রাণ হারালেন অন্তত ৩০২ ব্যক্তি। চরম আবহাওয়া উস্কে দেওয়ার বিশ্লেষণে দক্ষ একদল বিজ্ঞানী প্রলয়ঙ্করী এ বন্যার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে প্রকাশ করলেন নিজেদের অক্ষমতা।
রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাতের ধারায় জেংঝাও নগরীর গোটা অঞ্চল তলিয়ে যায়। সয়লাব সাব স্টেশনগুলোতে পানিবন্দি অসহায় মানুষের ছবি অন্যদের মতো এ সব বিজ্ঞানীদেরকেও আতংকিত করে তোলে। তাদের কাজের সঙ্গে জড়িত মূল দুটো প্রশ্ন ছিল: জলবায়ুর পরিবর্তন কি এমন দুর্যোগকে আরও বেশি করে ডেকে আনবে? এই সব দুর্যোগ কী আরও প্রলয়ঙ্করী হতে থাকবে?
চীনে যখন ঝড় আঘাত হানে তখন, জুলাই মাসের গোড়ার দিকে, জার্মানি এবং বেলজিয়ামে বন্যা কেনও এতোটা প্রলয়ঙ্করী হয়ে উঠেছিল সে রহস্য উদ্ঘাটনে পুরোপুরি মাথা ঘামাতে থাকেন বিজ্ঞানীরা। এ সময়ে ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন ইনিশিয়েটিভ (ডব্লিউডব্লিউএ) -এর কাজের চাহিদা তীব্রভাবে বাড়তে থাকে। এ গোষ্ঠীটি ২০১৪ সালে সাতটি মূল স্বেচ্ছাসেবী গবেষক দল নিয়ে গঠিত হয় । বহুবছর ধরে এ সংস্থার তহবিলের যোগান দেওয়া হচ্ছিল না। এ ছাড়া, এতে নিয়োজিত গবেষকরা অন্যত্র চাকরি করেন।
জার্মানির বন্যার মাত্র দুই সপ্তাহ আগে উত্তর আমেরিকার এক ভয়াবহ তাপপ্রবাহ নিয়ে একই প্রশ্ন তোলা হয়। এদিকে, রেকর্ড তাপমাত্রা দেখা দেওয়ার পর দাবানলে জ্বলছে তুরস্ক, গ্রিস এবং ইতালি।
”জনবল যোগাড়ের জন্য আমাদেরকে লড়াই করতে হচ্ছে,” বলে জানালেন ডব্লিউডব্লিউ-র সহ-নেতা গ্রেট জান ভ্যান ওল্ডেনবার্গ। বিশ্ব উষ্ণতর হয়ে ওঠার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ডব্লিউডব্লিউ-র কর্মপরিধি বাড়তে থাকবে বলেও তিনি মনে করেন। কর্মপরিধি বাড়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ”দাবানল বা বন্যার মতো ঘটনাবলী আরও বিধ্বংসী হতে থাকবে।”
জলবায়ুর উষ্ণ হয়ে ওঠাকে কি সাম্প্রতিক ঘটনাবলীর জন্য দায়ী করা যাবে? একজন সাদামাটা পর্যবেক্ষকের কাছে গত দুই মাসের চরম আবহাওয়াজনিত ঘটনাবলীকে তাপমাত্রা বৃদ্ধির সুস্পষ্ট পরিণতি বলেই মনে হতে পারে। বছরের পর বছর ধরে অনেক বিজ্ঞানী এ নিয়ে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে এসেছেন।
কিন্তু কোনও সুনির্দিষ্ট বন্যা, দাবানল বা ঝড়ের ঘটনার সঙ্গে জলবায়ুর পরিবর্তনের বড় ঘটনাকে সরাসরি সম্পর্কিত করার বিষয়টি এখনও একটি বিকাশমান বিজ্ঞান। বাস্তবে এমন কিছু অনুশীলন করা সত্যিই এখনো বেশ কষ্টসাধ্য।
স্থানীয় আবহাওয়া পরিস্থিতি, ভূপ্রকৃতি, মানবীয় কার্যক্রম এবং প্রাকৃতিক পরিবর্তনশীলতাসহ ধারাবাহিক নানা ঘটনাবলী প্রাকৃতিক দুর্যোগের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে। জলবায়ুর পরিবর্তন ছাড়াও তাপপ্রবাহের মতো চরম ঘটনাবলীও ঘটতে পারে।
অবশ্য, জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে চরম আবহাওয়াজনিত ঘটনাবলী ঘন ঘন ঘটছে এবং এ সব ঘটনা তীব্রতর হয়ে উঠছে। জলবায়ুর পরিবর্তনের সঙ্গে এর সম্পর্কের বিষয়টি বেশ ‘ভালো ভাবেই প্রমাণ করা’ হয়েছে। যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া দফতরের জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত অন্যতম বিশেষজ্ঞ পিটার স্কট এ কথা জানালেন। পাশাপাশি তিনি আরো বলেন, ”যখন কোনও সুনির্দিষ্ট ঘটনা জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে ঘটছে কিনা বা জলবায়ু পরিবর্তন এমন ঘটনার ক্ষেত্রে কি ধরণের প্রভাব ফেলেছে স্পষ্ট করে জানতে চাওয়া হয় তখন তার বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা দেওয়া কষ্টকর হয়ে ওঠে।”
জলবায়ুর প্রভাব সংক্রান্ত বিজ্ঞান যদি আরো সঠিক হয়ে ওঠে তা হলে এর প্রভাব কি পড়বে সে বিষয়ে তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করা যাবে। এর মধ্য দিয়ে জলবায়ু সংক্রান্ত ভবিষ্যত ঘটনাবলীর নিয়ে আগের চেয়ে বেশি করে সুনির্দিষ্ট পূর্বাভাস দেওয়া যাবে। এ ছাড়া, ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্রগুলো সুচারুরূপে চিহ্নিত করা সম্ভবপর হবে। এতে সমাজ আসন্ন ঘটনাবলীর জন্য প্রস্তুতি বা তার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী সরকার ও কোম্পানিদের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের বিষয়টি জোরালোভাবে প্রমাণ করা গেলে সে সব মামলার অবস্থান আরো শক্তিশালী হবে।
এ ক্ষেত্রে বিশাল চ্যালেঞ্জ বিরাজ করছে। ধরুন, ইউরোপে জলবায়ু পরিবর্তনের জেরে কতোটা অধিক মাত্রায় বৃষ্টি হলে তা বন্যা ডেকে আনে- এমন প্রশ্নের জবাব দেওয়াটা সত্যিই বেশ ঝামেলাপূর্ণ বলে জানালেন স্কট। তিনি বলেন, “এমন সব প্রশ্ন বিজ্ঞানের সর্বাধুনিক অগ্রগতির দিকেই আমাদেরকে ঠেলে দিচ্ছে।”
এ ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা অনেকটা অগ্রগতি লাভ করেছেন। উত্তর আমেরিকার তাপপ্রবাহের কারণেই কানাডার লিটন গ্রামের তাপমাত্রা গা-ঝলসানো ৪৯.৬ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডে গিয়ে ঠেকেছিল। জুলাই মাসে ডব্লিউডব্লিউএ এ বিষয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘোষণা দেয়। ডব্লিউডব্লিউএ বলে, “মানবীয় তৎপরতায় জলবায়ুর পরিবর্তন ছাড়া তাপমাত্রা এমন গা-ঝলসানো পর্যায়ে যেতে পারে না।”
গত বছরের সাইবেরিয়ার তাপপ্রবাহ নিয়েও এ গোষ্ঠী একই রকম ঘোষণা দেয়। সাইবেরিয়ার ভেরখোয়ানস্কে তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড লিপিবদ্ধ করা হয়। ডব্লিউডব্লিউএ বলে, জলবায়ুর পরিবর্তন ছাড়া এরকম তাপমাত্রা প্রায় অসম্ভব।
ডব্লিউডব্লিউএ’এর সঙ্গে সক্রিয় থাকা কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ু বিজ্ঞানী ফ্লাভিও লেহনার বলেন, ”দিনে দিনে আবহাওয়ার ব্যাপক পরিবর্তন হয়, সে কথা আমরা জানি। এখন প্রশ্ন হলো, কখন চরম আবহাওয়াজনিত ঘটনাবলী ঘটে? জলবায়ুর পরিবর্তন না ঘটলে কি এগুলো আরও শক্তিশালী, দীর্ঘায়িত এবং মারাত্মক হতো?”
এরপরও বিজ্ঞানীরা তাদের সিদ্ধান্তকে খুব বেশি এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করেন। ভ্যান ওল্ডেনবার্গ স্বীকার করেন, “যখনই জলবায়ু বিষয়ক নতুন কিছু প্রকাশ করি তখন ভোররাত ৪টা সময় ঘুম ভেঙ্গে যায়। সংখ্যাগুলো ঠিক আছে ঘুম ভেঙ্গে সে বিষয়ে নিশ্চিত হই। এই দুঃশ্চিন্তা করার প্রয়োজন আছে এবং আমরা যতটা সম্ভব সত্যের কাছাকাছিই থাকতে চাই।”
[ফাইনান্সিয়াল টাইমসে (এফটি) প্রকাশিত নিবন্ধের বাংলায় রূপান্তর করেছেন সৈয়দ মূসা রেজা।]
