ছিকর যেভাবে হারিয়ে গেল


মাহমুদ নেওয়াজ জয় | Published: June 15, 2022 17:32:54 | Updated: June 16, 2022 10:30:34


ছিকর যেভাবে হারিয়ে গেল

মাটির বিস্কুট আফ্রিকার অনেক দেশে খুব জনপ্রিয়। কারণসহজভাবে ক্ষুধা মেটে এতে। এই দেশগুলো দীর্ঘসময় ধরে ছিল উপনিবেশ। তারপর একসময় স্বাধীনতা পেলেও বিদেশি ঋণের বেড়াজাল ও সাম্রাজ্যবাদী হস্তক্ষেপের কারণে পড়ে যায় চরম সংকটে। প্যাট্রিক লুমুম্বা বা টমাস সানকারার মতো গণনায়কদেরও হারাতে হয়। তারপর দারিদ্র‍্যের দুষ্টচক্রে পড়ে গিয়ে আর উঠে দাঁড়ানো হয়নি। তাই ক্ষুধা নিবারণের জন্য মাটির তৈরি বিস্কুট এখনো বেশ প্রচলিত ওখানে।

তবে শুনতে মোটামুটি অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্য যে, একসময় বাংলাদেশের মানুষও মাটির বিস্কুট খেতো। এর পেছনে ছিল বিভিন্ন কারণ। তার ভেতর ক্ষুধা নিবারণ যেমন ছিল, আবার ছিল প্রয়োজনীয় খনিজ উপাদানের প্রাপ্তি ও রক্তস্বল্পতা রোধ।

এই বিস্কুট মূলত তৈরি হতো মাটি পুড়িয়ে। প্রধানত হবিগঞ্জসহ বৃহত্তর সিলেটের বিভিন্ন অঞ্চলে এর প্রচলন ছিল।

এই বিস্কুটকে বলা হতো ছিকর। তৈরি হতো আঠালো ধরনের এঁটেল মাটি দিয়ে। গত শতাব্দীর ৭০ থেকে ৯০ - এর দশকের মাঝের সময়টায় হবিগঞ্জ জেলার নিম্নবিত্ত থেকে হতদরিদ্র মানুষদের মাঝে বহুল প্রচলিত একটি খাবার ছিল এই ছিকর।

ছিকর শব্দটি একটি ফারসি শব্দ। ছিয়া অর্থ কালো, কর অর্থ মাটি। 'ছিয়াকর' শব্দের অর্থ কালো মাটি অর্থাৎ পোড়ানো মাটি৷ এই শব্দটিই পরে লোকমুখে হয়ে গেছে ছিকর।

এঁটেল মাটি সংগ্রহ করে তা পুড়িয়ে তৈরি করা হতো ছিকর।

এজন্য পাহাড়ি টিলায় গর্ত খুঁড়ে লম্বা বাঁশের সাহায্যে গভীরে গিয়ে মিহি ধরনের এঁটেল মাটি সংগ্রহ করা হতো । তারপর তা মাখিয়ে নিয়ে নরম রুটির মত করে কাই বানানো হতো৷ এরপর ছাঁচে ফেলে প্রথমে মন্ড তৈরি করে নেয়া হতো। তারপর তা পছন্দসই কেটে কেটে টুকরো করে নেয়া হতো।

পরে বিশেষ এক পদ্ধতিতে সেই টুকরোগুলো আগুনে পুড়িয়ে তৈরি করা হতো ছিকর। বিভিন্ন আকৃতির ছিকরের প্রচলন ছিলো সেসময়। কোনোটি দেখতে হতো প্রচলিত লম্বাটে বিস্কুটগুলোর মত। আবার কোনোটি ছিল ললিপপের মত আকৃতির।

এলাকা ভেদে ছিকরের ছিল আলাদা স্বাদ। কোনো কোনো এলাকায় কাই মাখানোর সময় মেশানো হতো গোলাপ/ ক্যাওড়ার জল। এতে সুন্দর ঘ্রাণ ও হালকা টক ধরনের স্নিগ্ধ একরকম স্বাদ হতো৷ আবার কোথাও কোথাও মেশানো হতো আদার রস। এতে মাটির গন্ধের ব্যাপারটা কেটে যেত, ঝাঁঝালো একরকম স্বাদ আসতো৷

ক্ষুধা নিবারণের জন্য অনেকে এটি নিয়মিত খেতেন। তবে এর আলাদা আবেদন ছিল গর্ভবতী নারীদের কাছে। প্রচলিত ধারণা ছিল ছিকর রক্তশূণ্যতা দূর করে ও খনিজের যোগান দেয়। গর্ভাবস্থায় যথেষ্ট প্রয়োজন হয় খনিজের। কিন্তু জিওল মাছ (শিং/মাগুর/কই) খেতে পারার সামর্থ্য সবার ছিল না। তাই সে জায়গা নিয়ে নিয়েছিল ছিকর। পাশাপাশি এর ছিল আলাদা স্বাদ। অনেকে স্বাদের কারণেও ভক্ত হয়ে যেতেন এর। তাই গর্ভবতীদের পাশাপাশি নিম্ন আয়ের মানুষদেরও বেশ পছন্দের ছিল এটি।

অনেকের বিশ্বাস ছিল, এটি খেলে রোগ-বালাই থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। যদিও এই ধারণার পক্ষে কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা বা চিকিৎসকের সমর্থন মেলেনি।

মৌলভীবাজারে পাহাড়ি এলাকায় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বসবাস ছিল । স্থানীয়ভাবে ডুকলা নামে তারা পরিচিত। এদের মধ্যে নারীরা এসব ছিকর তৈরি করে বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিক্রি করতেন ।

আবার কুমার বা মৃৎ শিল্পীদের (মাটির জিনিস বানান যারা) কেউ কেউ ছিকর তৈরি করে বাজারে বিক্রি করতেন। তবে গত বিশ বছরে ক্রেতার সংখ্যা ক্রমাগত কমে যাওয়ায় ছিকরের প্রচলন এখন নেই বললেই চলে।

এছাড়া এ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলার দিনারপুরে পাহাড়ি টিলা থেকে বিভিন্ন এলাকার কুমাররা মিহি মাটি সংগ্রহ করতেন। তবে এখন এই কাজের সঙ্গে জড়িত লোকের সংখ্যা প্রায় শূণ্যের কোঠায় নেমে এসেছে।

এছাড়া বানিয়াচং, বাহুবল ও মাধবপুরে ছিকরের মাটি পাওয়া যেত প্রচুর পরিমাণে। তা সত্ত্বেও এখন আর ছিকর তেমন মেলেনা।

এর পেছনে যেমন আছে দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করা বা হতদরিদ্র মানুষদের অবস্থার কিছুটা উন্নয়ন, তেমনি আছে সচেতনতা বৃদ্ধির ব্যাপারটিও। এখন মানুষ বোঝে যে এর ভেতর আসলে রক্তশূণ্যতা দূর করার উপাদান তেমন নেই৷ গর্ভবতী নারীরাও এখন এক্ষেত্রে আগের চেয়ে অনেক সচেতন হয়েছেন।

লেখক বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে চতুর্থ বর্ষে পড়ছেন৷

mahmudnewaz939@gmail.com

Share if you like