অনুষ্ঠান কিংবা উৎসব সর্বত্র পোলাও সমানভাবে সমাদৃত। পোলাও ছাড়া উৎসবের খাবার টেবিল যেন জমেই না। স্বাদের পাশাপাশি এর মোহনীয় ঘ্রাণ এর পছন্দের শীর্ষে থাকার অন্যতম কারণ। কিন্তু পোলাও ছাড়া ভাতের মধ্যেও পোলাও এর সুঘ্রাণ পাওয়া সম্ভব এক ধরনের পাতার মাধ্যমে যার নামও পোলাও পাতা।
বাংলাদেশের অনেক জায়গায়ই পোলাও পাতার গাছ দেখা যায়। এটি কোনো প্রকার যত্ন ছাড়াই বাড়ির আশেপাশে কিংবা বাগানের কোণে বেড়ে উঠতে পারে। কিন্তু দিনে দিনে এর ব্যবহার বাড়ার সাথে সাথে এখন বিভিন্ন নার্সারিতে এর চারা বিক্রি হচ্ছে। শহরের মানুষ আগ্রহ নিয়ে এ চারা কিনছেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পোলাও পাতা চাষের জন্য তারা বেছে নিচ্ছেন বাড়ির ছাদকে, অনেক ক্ষেত্রে বারান্দাকেও।
পোলাও পাতার গাছের আকৃতি ও পাতার চেহারা দেখতে অনেকটাই কেয়া গাছের মতো। তবে এটি কেয়া গাছের তুলনায় আকারে কিছুটা ছোট হয় এবং দেখতে অনেকটা ঝোপালো প্রকৃতির। পোলাও পাতা গাছ বহুবর্ষজীবী, তাই একবার লাগালে অনেক বছর বেঁচে থাকে। এতে আনারস গাছের মতো মোথা থেকে কিছু পাতা চারদিকে খাড়াভাবে তলোয়ারের মতো বাড়তে থাকে।
পোলাও পাতা দৈর্ঘ্যে ৫০-৬০ সেন্টিমিটার এবং প্রস্থে ৩-৪ সেন্টিমিটার হয়। পাতা দেখতে চকচকে সবুজ রঙয়ের, পুরু চামড়ার মতো, একটু শক্ত এবং কিনারা মসৃণ প্রকৃতির হয়। এছাড়াও এ পাতার অগ্রভাগ তীক্ষ্ণ এবং সুচালো। মূলত এ পাতায় পোলাওয়ের মতো ঘ্রাণ থাকায় নাম রাখা হয় পোলাও পাতা।
পোলাও পাতা সরাসরি রান্না করে খাওয়া যায় না। এটি মূলত খাদ্যদ্রব্যে সুগন্ধি হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। বিশেষ করে, সুগন্ধবিহীন সাধারণ চাল দিয়ে ভাত রান্নার সময় এই পাতা ব্যবহারে সেসব ভাতেও পোলাওয়ের ঘ্রাণ আসে। এক্ষেত্রে ভাত রেঁধে মাড় ফেলার সময় ভাতের সাথে পোলাও পাতা মেশানো হয়। গরম ভাতের স্তরে স্তরে পোলাও পাতা ৩-৪ সেন্টিমিটার আকারের টুকরো করে ছিটিয়ে দেওয়া হয়। এরপর ঢাকনা দিয়ে ভাতের পাত্রের মুখ ঢেকে দেওয়া হয়। এভাবে কিছুক্ষণ রেখে দেওয়া হলেই ভাতে পোলাওয়ের ঘ্রাণ পাওয়া যায়।
অনেকে আবার চা বানানোর জন্যও এ পাতা ব্যবহার করে থাকেন। চা বানানোর সময় চায়ের পানি যখন ফুটতে শুরু করে তখন কয়েক টুকরো করে পোলাও পাতা ছিটিয়ে দিতে হয়। তাহলেই চায়ের মধ্যে পোলাওয়ের ঘ্রাণ পাওয়া যায়!
একইভাবে বিভিন্ন রকম স্যুপ, জাউভাত, ফিরনি, পায়েস, সেমাই, ক্ষীর ইত্যাদি খাবারে পোলাও পাতা মিশিয়ে এগুলোতে পোলাওয়ের ঘ্রাণ নিয়ে আসা হয়, যা আলাদা স্বাদে বৈচিত্র্যের সৃষ্টি করে।
কিভাবে করবেন পোলাও পাতা চাষ?
পোলাও গাছ খুব সহজে বাড়ির ছাদে কিংবা বারান্দায় চাষ করা সম্ভব। এ গাছের চারা মূলত গাছের কান্ড থেকে উৎপন্ন করা হয়। গাছের কান্ডের যে গিঁট থাকে, তা থেকে এ চারা কুশির মতো বের হয়। এসব চারা লাগিয়ে নতুন গাছ জন্মানো যায়।
পোলাও পাতা চাষ করার জন্য তাই প্রথমেই এর কান্ড থেকে চারাগাছ সংগ্রহ করতে হবে। এখন চাইলে নার্সারি থেকেই খুব সহজে এ চারাগাছ সংগ্রহ করা সম্ভব। সংগ্রহের পর প্রথমে গাছ মাটিতে লাগিয়ে বড় করতে হবে। বড় হওয়ার পর এর কান্ডের চারপাশ থেকে তেউড় বের হবে। এ তেউড় বা ছোট চারা গাছ থেকে কেটে আলাদা করে বীজতলায় পুঁতে নিয়ম করে পানি দিতে হবে। এর কিছুদিন পরই তা থেকে শিকড় বেড়িয়ে আসতে দেখা যাবে।
শিকড় বের হওয়ার পর সেসব চারা সরাসরি জমিতে লাগানো যেতে পারে অথবা বাড়ির আঙিনায় কিংবা ছাদে ঝোপ করার জন্য এক জায়গায় কয়েকটা গাছ লাগানো যেতে পারে। যাদের বড় বারান্দা আছে তারা চাইলে সেখানেও করতে পারে।
শিকড়সহ চারা নতুন করে লাগানোর পর নিয়মিত পানি দেওয়া ছাড়া আর বিশেষ কোনো যত্নের প্রয়োজন হয় না। তবে চারা লাগানোর সময় মনে রাখা দরকার এ গাছ আধোছায়া এবং রোদেলা জায়গায় ভালো জন্মায়। অর্থাৎ বেশি ছায়াযুক্ত স্থানে এ গাছ লাগানো যাবে না।
এ গাছ লাগানোর সময় কিংবা পরে কোনো রাসায়নিক সার মাটিতে মেশানোর দরকার নেই। তবে লাগানোর আগে মাটির সাথে বেশি করে জৈবসার মিশিয়ে দিলে পরবর্তীতে গাছের চেহারা ও বৃদ্ধি বেশ ভালো হবে।
তুলনামূলক কম যত্ন ও খরচে পোলাও পাতা খুব সহজেই বাড়ির ছাদে চাষ করা সম্ভব। পাশাপাশি পোলাও পাতা প্রচন্ড কষ্ট সহ্য করতে পারে এবং বাড়েও ভালো। এছাড়া বছরের যেকোনো সময় এ গাছ থেকে পাতা তোলা যায়। তবে খেয়াল রাখতে হবে, তোলার সময় গোড়ার দিকের বয়স্ক পাতা যেনো আগে তোলা হয়। তা না হলে সেগুলো পুরোনো হয়ে নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
মোঃ ওমর ফারুক তপু বর্তমানে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে যন্ত্রকৌশল বিভাগে পড়াশোনা করছেন।
jafinhasan03@gmail.com