Loading...

চোখ যে মনের কথা বলে

| Updated: August 16, 2021 22:07:05


চোখ যে মনের কথা বলে

..বলেছে সে, “এতদিন কোথায় ছিলেন?

পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন।

আচ্ছা, এই শেষের লাইনটিতে জীবনানন্দবাবু “পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে” বাক্যাংশটি ঠিক কেন ব্যবহার করেছেন বলে মনে হয়? বনলতার অভিব্যক্তি বোঝানোর জন্য? স্রেফ “পাখির নীড়ের মতো চোখ তোলা” দেখেই অভিব্যক্তি কীভাবে বোঝা গেল? তবে কি চোখেরও কোনো ভাষা আছে?

আছে বৈকি! যখনও মানুষের স্বরযন্ত্র উন্নত হয়নি, তখনও মানুষ অনেকরকম যোগাযোগ চোখে করত। কয়েকমাসের শিশুর যখন মুখে কথা বলা সম্ভব হয় না, সে চোখের ভাষা দিয়েই যোগাযোগের সম্পর্ক স্থাপন করে তার মা-বাবার সঙ্গে। এমনকি আজও, প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ক্ষেত্রেও, যে কথা বলা অসম্ভব কিংবা কঠিন, চোখের ভাষাতেই আর সিকিভাগ প্রকাশ হয়ে যাওয়াটা বিচিত্র নয়। সত্যি কথা বলতে, শারীরিক ভাষার একটা বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে এই চোখের ভাষা।

স্প্যানিশ কবি গুস্তাভো অ্যাডোলফো ব্যাকার একবার বলেছিলেন, “দৃষ্টির সাহায্যে কথা বলতে পারা মানুষ চোখ দিয়ে চুম্বনও করতে পারে।” এই কথাটি এত বাজেভাবে সত্যি যে, মাঝে মাঝে আমরা ভুলে যাই যে আমরা নিজের অজান্তেই মাঝে মাঝে চোখের ভাষায় অনেককিছু বলে বা করে ফেলি। যেখানে মুখের কথা বা শারীরিক অঙ্গভঙ্গিকে নানানভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, সেখানে স্রেফ এই চোখের ভাষাকে নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাই মানুষের সবচেয়ে কম।

চোখের ভাষার ব্যাপারটি বুঝতে হলে আগে যোগাযোগের জায়গাটা বোঝা দরকার। যোগাযোগ সম্ভবত একজন মানুষের জীবনের সবচে বেশি এবং ধারাবাহিকভাবে করা কাজ। যোগাযোগ মানেই যে কেবল মৌখিক যোগাযোগ, তা নয়। সামনাসামনি যোগাযোগের জন্য মুখের ভাষা, স্পর্শ, শারীরিক অঙ্গভঙ্গি ইত্যাদি অনেকগুলো মাধ্যমই আছে। পরিপূর্ণ যোগাযোগের জন্য এদের সবগুলোই কমবেশি গুরুত্বপূর্ণ হলেও, ভাব প্রকাশের বা যোগাযোগের সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় মাধ্যম হচ্ছে এই চোখের ভাষা।

চোখের ভাষা বলতে যে শুধু অক্ষিগোলক কিংবা চোখের তারার নড়াচড়াকেই বোঝানো হয়, তা কিন্তু নয়। বরং চোখের ভ্রু, পাঁপড়ি, তারা, পাতা সবকিছু মিলিয়ে গঠিত একটি পূর্ণাঙ্গ দৃষ্টি থেকেই চোখের ভাষার পাঠোদ্ধার করা হয়।

যেমন ধরুন, হঠাৎ করে অঞ্জন দত্তের গানের মত একদিন বৃষ্টিতে বিকেলে আপনার সাথে পুরনো চেনা কারো দেখা হয়ে গেল। দূর থেকে দু’জনের চোখে চোখ পড়লো, আপনি মুখে একটা হাসি ঝুলিয়ে নিজের ভ্রুটা একটু ওপরে তুলে দুলিয়ে আবার স্বাভাবিক করে আনলেন। অপর ব্যক্তিটিও তাই করলেন। দু’জনেই অনায়াসে বুঝে গেলেন যে, চোখে চোখে “হ্যালো!” কিংবা “কী অবস্থা?” জাতীয় কিছু একটা কথা হয়ে গেল।

এটা হচ্ছে স্বাভাবিক লোকের কাছে বোধগম্য চোখের ভাষা। তা বলে সবরকমের চোখের ভাষাই সব লোকের কাছে বোধগম্য নয়। যেমন ধরুন, এই জায়গায় যদি আপনার প্রেমিক বা প্রেমিকা থাকত, তবে তাকে দেখার সাথে সাথে আপনার চোখের তারা বা পিউপিলটি ডায়ালেটেড, অর্থাৎ প্রসারিত হয়ে যেতে পারে। কিংবা এমনও হতে পারে যে আপনার চোখের পাতা ঘন ঘন কাঁপতে পারে। পছন্দের মানুষ বা প্রিয় মানুষের সাথে দেখা হলে এ দু’টি জিনিসই হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

অবশ্য শুধু পছন্দের মানুষকে দেখলেই যে এ দু’টি বিষয়ের সম্মুখীন হবেন, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। হয়তো আপনি কোনোকিছু নিয়ে প্রচণ্ড বিরক্ত, অথবা রেগে আছেন; সেক্ষেত্রেও আপনাকে চোখের পাতাগুলোর ঘন ঘন কাঁপুনি সহ্য করতে হতে পারে। খুব মনোযোগ দিয়ে অনেকগুলো বিষয় একইসাথে চিন্তা করছেন, এমন অবস্থায়ও চোখের পাতার কাঁপুনি যথেষ্ট স্বাভাবিক একটি বিষয়।

খুব পছন্দের কাউকে দেখলে যেমন চোখের তারা প্রসারিত হয়, ঠিক তেমনিভাবে খুব অপছন্দের কিছু দেখলে, বা আমাদের অখুশি বা দুঃখিত করে তোলে, এমন কিছু দেখলেও আমাদের চোখের তারা প্রসারিত হয়।

ধরুন, আপনি আপনার কোনো আত্মীয়ের বাসায় গেলেন। সেই আত্মীয়ের একটি ছোট ছেলে আছে, যাকে এক পর্যায়ে অমুক ছড়াটা আবৃত্তি করে শোনাতে বলা হলো। ছেলেটি গড়গড় করে আবৃত্তি করল ঠিকই, কিন্তু পুরোটা সময়ই সে তাকিয়ে রইল মেঝে কিংবা সিলিংয়ের দিকে। আপনার দিকে, বা তার নিজের বাবা-মায়ের দিকে একবারও তাকাল না। এমন অভিজ্ঞতার সাথে সবারই কমবেশি পরিচয় আছে। যাকগে, এইযে কারো চোখে চোখ না রেখে অন্যদিকে তাকিয়ে কথা বলা বা কোনো কাজ করা, এটা স্পষ্ট লজ্জার ইঙ্গিত।

কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, মানুষ যখন মিথ্যা কথা বলে, তখনও অনেকসময় সে এই একই কাজ করে, অন্যদিকে তাকিয়ে থাকে। তাছাড়া সামাজিক দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মানুষদেরও এই সমস্যাটি থাকে। যদিও লজ্জিত কিংবা সামাজিক দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মানুষদের ক্ষেত্রে অন্য দিকে তাকিয়ে থাকাটা যতটা অবশ্যম্ভাবী, মিথ্যে কথা বলা মানুষদের ক্ষেত্রে তা ততটা অবশ্যম্ভাবী নয়। অনেক মিথ্যেবাদীই যথেষ্ট স্বাভাবিক থেকে মিথ্যে কথা বলতে পারে।

বিষয়গুলো যে খুব সহজে বোধগম্য, তা নয়। ক্ষেত্রবিশেষে পরস্পরবিরোধীও বটে। তবে চোখের ভাষা বোঝার জন্য আসলে শুধু চোখের দিকে তাকিয়ে থাকাটাই যথেষ্ট নয়, বরং পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি ও আলোচনার প্রসঙ্গের দিকে নজর রাখাটাও আবশ্যক! তাছাড়া শুধু চোখের ভাষা দেখেই কারো সম্পর্কে কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলাও কাম্য নয়।

শুভদীপ বিশ্বাস বর্তমানে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগ, তৃতীয় বর্ষে পড়াশোনা করছেন।

shuvodipbiswasturja1999@gmail.com

Share if you like

Filter By Topic