চলচ্চিত্রে হুমায়ূন আহমেদ


অনিন্দিতা চৌধুরী | Published: November 13, 2021 18:31:15 | Updated: November 14, 2021 11:06:57


চলচ্চিত্রে হুমায়ূন আহমেদ

বাংলা কথাসাহিত্যের নন্দিত রাজপুত্র তিনি। তবে শুধু সাহিত্যের অলিগলিতেই তার বিচরণ ছিল না, ক্যামেরার রিলেও তিনি গল্প বলার মাধ্যমে আমাদের হাসিয়েছেন, কাঁদিয়েছেন। আজ তার ৭৪তম জন্মদিনে কথা হবে তারই চিত্রনাট্য ও পরিচালনায় থাকা চলচ্চিত্রগুলো নিয়ে।

আগুনের পরশমনি (১৯৯৪)

এটি তার জীবনের প্রথম পরিচালিত সিনেমা। এ সিনেমার কাজ চলাকালীন বিভিন্ন অভিজ্ঞতা, শুরু থেকে শেষের সবটা কাহিনী নিয়ে ছবি বানানোর গল্প নামে একটি বইও রয়েছে তার। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রথমে ১৯৭১ নামের বইটি নিয়ে কাজ করতে চাইলেও পরে আগুনের পরশমণির দিকে ঝোঁকেন তিনি। সরকারি অনুদানে নির্মিত হবার কথা থাকলেও শেষের দিকে অর্থসঙ্কটে পড়েন। ধারদেনা করে ছবির কাজটি শেষ করেন। এ যেন প্রথম সন্তান প্রসবের মতো এক পরিচালকের বেদনা। তবে সেই সন্তান তাকে এনে দিয়েছিল কাজের তৃপ্তি এবং স্বীকৃতির উপহার- দুটোই।

শ্রাবণ মেঘের দিন (১৯৯৮)

কেহ গরিব অর্থের জন্যে, কেহ গরিব রূপে/ এই দুনিয়ার সবাই গরিব, কান্দে চুপে চুপে। নিজের ভেতরকার সবটা দারিদ্র্যকে উকিল মুন্সীর গানে কোন ফাঁকে অতিক্রম করে গিয়ে গাতক মতি গলা ছেড়ে গায়, আসরভরা লোকেরা চাদরমুড়ি দিয়ে মশগুল হয় তার ছড়িয়ে দেয়া সুরের ভুবনে। বিরহী প্রেমের জাদু, শহর-গ্রামের মেলামেশা, মুক্তিযুদ্ধের পরোক্ষ প্রভাব, দুই প্রজন্মের বন্ধন ইত্যাদি এক এক করে গল্পের গাঁথুনি তৈরি করেছে। পরিচালনা ও অভিনয়ের শৈলীতে পোক্ত হয়েছে চলচ্চিত্রের ভিত। আবহমান গ্রামের ছবিতে প্রকৃতির খুব কাছে থেকে পর্যবেক্ষণ করা গেছে আশপাশটা।

দুই দুয়ারী (২০০০)

বরষার প্রথম দিনে ঘন কালো মেঘ দেখে আনন্দে কাঁপা হৃদয়ের স্তুতি গেয়ে দুই দুয়ারীর আবির্ভাব হলো দুই সহস্রাব্দের প্রথম ধাপে। মাথায় সাদা ক্যাপ, হাতে গিটার। এক আধুনিক ভবঘুরেরূপে গাড়ির সামনে এসে পড়লেন নায়ক রিয়াজ। চলতি ধারার সিনেমার গ্ল্যামার আর হুমায়ূন আহমেদের নির্দেশনা- দুই মিলিয়ে পুরোটা সময় পর্দা মাতালেন তিনি। ট্র্যাজিক হিরোরূপে মাহফুজও কম যাননি। এ সিনেমায় অনেকটা তথাকথিত ত্রিভুজ প্রেমের গল্প দেখাতে গিয়ে আবার নিজস্ব কায়দায় ফেরত এলেন হুমায়ূন।

চন্দ্রকথা (২০০৩)

ও কারিগর, দয়ার সাগর/ ওগো দয়াময়, চান্নি পসর রাইতে যেন আমার মরণ হয়। চন্দ্রাহত এই লেখক চাঁদকে বিভিন্নভাবে বন্দনা করেছেন, কখনো চাঁদের আলোয় দেখেছেন প্রিয় মুখ তো কখনো কবিতায় অপেক্ষা করেছেন গৃহত্যাগী জোছনার। সেই চাঁদের আলো ভরা রাতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের বাসনা ছিল তার। চাঁদ এসেছে বিভিন্ন নাটকের নামেও- চন্দ্র কারিগর, চন্দ্রগ্রহণ ইত্যাদি। তবে তার চন্দ্রপ্রেম নাম হয়ে সিনেমায় এলো চন্দ্রকথার মাধ্যমে। জমিদারবাড়ির ঠাঁটবাটের আড়ালে মিশে থাকা নিষ্ঠুরতা বারবার দাগ কেটে যায় এ সিনেমায়।

শ্যামল ছায়া (২০০৪)

মুক্তিযুদ্ধে বাবাকে হারিয়েছেন হুমায়ূন আহমেদ। সেই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ব্যক্তিগত দুঃখও কম নয় তাই। নিজের বিভিন্ন রচনায় মুক্তিযুদ্ধ এসেছে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে, বিভিন্ন রূপে। সিনেমার পর্দায় নিজের উপন্যাসকে রূপায়নে শ্যামল ছায়ায় মুক্তিযুদ্ধ এল দ্বিতীয়বার।

একটা নৌকায় বেশ কিছু যাত্রী। সকলেরই এক নিয়তি, এক গন্তব্য। একই পথে চলছেন তারা তবু কী অদ্ভুতভাবে আলাদা সবাই। সেই আলাদা আলাদা জীবনগুলোকে মিলিয়ে দেবার গল্পটাই এ সিনেমার মূলে আছে। ইংরেজি পরিভাষায় গালভরা শব্দগুচ্ছ শেয়ারড পেইন বা শেয়ারড সাফারিংস-এর একটি ভালো উদাহরণ হতে পারে এটি। আকস্মিকতা কীভাবে মানুষের জীবনকে খোলনলচে পালটে দেয়, এক ঝটকায় সব নিরাপত্তাবোধ পরিণত হয় অনির্দিষ্টকালীন অনিশ্চয়তায়- সে ছবিই দেখতে পাই এই ছায়াছবিতে।

নয় নম্বর বিপদ সংকেত (২০০৬)

আবোল-তাবোল বা ননসেন্স নিয়ে আরেক বিখ্যাত সাহিত্যিক সুকুমার রায় বেশ চর্চা চালিয়েছেন এক কালে। হুমায়ূন আহমেদের ভাষ্যমতে, তেমনই এক অনর্থক সিনেমা হলো এটি। তবু অনর্থের মধ্যেও অর্থ থাকে না, তা নয়। পারিবারিক সম্পর্কের শিথিলতা, একে অপরের সাথে স্নায়ুযুদ্ধ, এগোতে থাকা সময়ের সাথে ক্রমশ বাড়তে থাকা আত্মকেন্দ্রিকতা ইত্যাদি বিষয় যেন হাস্যরসের মাধ্যমেই উঠে এসেছে এ সিনেমায়। দর্শক একটু এসব বিষয় নিয়ে ভেবে সিরিয়াস মুখ করতে যাবেন সময়ই হয়তো পর্দার লোকেদের অন্য একটা সংলাপ শুনে হাসিতে ফেটে পড়লেন। তার অন্যসব নাটক বা সিনেমার সাথে হাস্যরসের মিলটি এখানেও আছে। তবে দর্শককে কাতুকুতু দিয়ে হাসানোর স্বভাব ছিল না তার, সহজাতভাবেই হাসাতে পারতেন বলে।

আমার আছে জল (২০০৮)

রোমান্টিক ট্র্যাজেডি ঘরানার এই সিনেমাটিও তার একই নামের উপন্যাস থেকে করা। মজার বিষয় হচ্ছে, রুমালী নামে হুমায়ূন আহমেদের একটি উপন্যাসের প্লট ছিল সিনেমা বানানোর। আর তাতে পরিচালক চরিত্রটি যে সিনেমার কাজ করছিলেন, তার গল্প পড়ে বোঝা যায়,ওটি আমার আছে জলই ছিল। আমার আছে জল উপন্যাসটি প্রকাশ পায় ১৯৮৫ সালে, আর রুমালী ১৯৯৭ সালে। ২০০৮ সালে মুক্তি পাওয়া সিনেমাটির ধারণা খুব সম্ভব ১০ বছর আগেই মাথায় এসেছিল তার। তাই কিছুটা খামখেয়ালী স্বভাবের এই মানুষটির দূরদর্শিতার অভাব ছিল, তা বলা যায় না একদম।

ঘেটুপুত্র কমলা (২০১২)

বাঙালি সংস্কৃতির বিভিন্ন উপাদান নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় সিদ্ধহস্ত ছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। প্রায় হারিয়ে যাওয়া এমনই এক উপাদান ঘেটু বা ঘাটুগান। বর্ষাকালে হাওরাঞ্চলে নৌকা ঘাটে ভিড়িয়ে হতো এ গান। হাওরবাসীর বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম এই ঘেটুগানের সাথে জড়িয়ে ছিল কিছু বিষাদময় গল্পগাথা। ঘেটুশিল্পীদের সেই বিষাদই উঠে এলো এই পরিচালকের শেষ সিনেমায়। এটিকে তিনি নিজের সবচাইতে পরিপক্ব সিনেমার উপাধি দিয়েছিলেন। কমলানাম্নী এক ঘেটুশিল্পী কিশোরের দুঃখময় জীবনকে ঘিরে নির্মিত এ সিনেমায় ঘেটুগানের সাথেও পরিচিত হবেন দর্শক। কালো যমুনার জলে যৌবন ভেসে যাওয়ার সুর কিংবা শুয়াচান পাখিকে বারবার গভীরভাবে ডাকবার আকুতিতে নিমজ্জিত হবে চক্ষুকর্ণ উভয়েই।

অনিন্দিতা চৌধুরী বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী। anindetamonti3@gmail.com

Share if you like