Loading...
The Financial Express

চকের ভাস্কর, চকের জাদুকর জাহেদ

| Updated: April 08, 2022 09:36:29


ভাস্কর মোহাম্মদ সামিউল আলম জাহেদ ভাস্কর মোহাম্মদ সামিউল আলম জাহেদ

হাতে থাকত বেত, চক আর ডাস্টার। কেউ দুষ্টুমি করলে তার নাম টুকে রাখতেন কাগজে। কারণ তিনি ছিলেন ক্লাসের ক্যাপ্টেন। বলা হচ্ছে কুমিল্লার সন্তান মোহাম্মদ সামিউল আলম জাহেদের কথা। বর্তমানে তিনি একজন ভাস্কর। নবম শ্রেণীতে ক্যাপ্টেন থাকাকালীন নিজের ভাস্কর সত্তার সন্ধান পান তিনি। এখন তার আবিষ্কার গোটা দেশে চকের ভাস্কর্য নামে খ্যাত।

শুরুর গল্প

শিক্ষকের চক ব্যবহারের পর অবশিষ্ট যে চক বেঁচে যেত, তাতে একদিন কম্পাস খুঁচিয়ে কিছু একটা করার চেষ্টা করলেন। সুন্দর কিছু হলো বটে। ভাবলেন আরও কিছু করা যায় কিনা। পরে একে একে বিখ্যাত সব মানুষ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, শেরে বাংলা একে ফজলুল হক, মহাত্মা গান্ধীসহ আরও অনেকের ভাস্কর্য তৈরি করেন। 

যদিও শুরুতেই তিনি অনুধাবন করতে পারেননি এগুলো ভাস্কর্য ধরনের কিছু, তবে দিন কে দিন জানার পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বোধগম্যতায় পরিপক্বতা আসে।

নতুন ভাবনার ভাস্কর্য গড়া প্রসঙ্গে তিনি যোগ করেন “মানুষের বহুরুপী সত্তা শুরুর দিকে আমাকে ব্যাপক ভাবাত। চোখের পলকে বদলে যাওয়া, দুর্বলতার সুযোগ নেওয়া বা দুর্বলের প্রতি সবলের অত্যাচার এজাতীয় বিষয়গুলোকে আমি প্রতীকীর সাহায্যে ভাস্কর্যে আনার চেষ্টা করতাম। যেমন, কখনো আমি মানুষকে বিষধর সাপের সাথে তুলনা করে চকে তুলে আনি, কখনো কোনো নারীকে দিয়েছি ফুলের রূপ।”

ভাস্কর সামিউলের তৈরি চকের ভাস্কর্য

চকের ভঙ্গুরতা প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, “কোনো এক সন্ধ্যায় ‘বাংলার রমণী’ নামে এক ভাস্কর্য তৈরি করি। মাথায় তার কলস। আমার খুব পছন্দের একটি কাজ ছিল। কিন্তু পরদিন সকালে ভীষণ দুঃখ পাই। পোকা জাতীয় কিছু একটা ভাস্কর্যটি নষ্ট করে ফেলে।”

“ব্যাপক চিন্তায় পড়ে গেলাম। এত কষ্ট করে প্রাণ দিয়ে গড়া জিনিস খেয়ে ফেলবে পোকায়? পরিত্রাণ পেতে চকের উপর নানামুখি পরীক্ষা চালাই। এক পর্যায়ে ফেবিকলের আঠায় চক ভিজিয়ে খেয়াল করলাম, চক আঠা শুষে নিতে পারে। পরে তুলি দিয়ে সুন্দর করে আঠা মুছে চক রোদে শুকানোর পর ম্যাজিকের মত একটা ব্যাপার চোখে পড়লো। গড়নে চক হলো বেশ মজবুত, দেখতেও প্রায় পাথরের মতো। দুশ্চিন্তা কেটে গেল, আবার শুরু করলাম।”

শিল্পীমন বনাম বাস্তবতা

প্রসঙ্গে ঢুকতে একটি গানের লাইন না বললেই নয় - যারে ঘর দিলা সংসার দিলা রে, তারে বৈরাগী মন কেন দিলা রে। 

শিল্পীর কাছে সৃষ্টি মানেই আনন্দ। সৃষ্টির জন্য যা যা করা প্রয়োজন তিনি তার সবটাই করতে চান। কিন্তু বাস্তবতা তাকে ঘুরায়, ভাবায়, পীড়া দেয়। তবুও শিল্পী যে দমে যান না, তার জলন্ত উদাহারণ ভাস্কর সামিউল আলম জাহেদ। 

তিনি বলেন “যেহেতু ভাস্কর্য নিয়েই আলাদা টান কাজ করতো, তাই চেয়েছিলাম চারুকলায় পড়তে। কিন্তু জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এবং চারুকলার পরীক্ষা একই দিনে অনুষ্ঠিত হওয়ায় পড়লাম দ্বিধায়। সিদ্ধান্তের জন্য সাহায্য চাইলাম আব্বার কাছে। শেষমেশ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়েই পরীক্ষা দিলাম। বিষয় পেলাম অর্থনীতি।”

বুকে চারুকলা আর হাতে অর্থনীতির বই নিয়ে অনার্স-মাস্টার্স (২০০৫-২০১২) সমাপ্ত করলেন। এরমাঝে থেমে থেমে চলছিল ভাস্কর্যের কাজ। বানাতেন, ড্রয়ারে রাখতেন, কাউকে বলতেন না। নিজেই দেখে আনন্দ – দুঃখের দোলাচলে পড়তেন। 

এই সৃষ্টির খবর কি কেউ জানবে না? – ঘুরেফিরে এই প্রশ্নই মাথায় ঘুরতো তার। একটা সময় নিজ শহরের এক আর্ট স্কুলে ভর্তি হন। কিন্তু কেন জানি নিজেকে খুঁজে পাচ্ছিলেন না সামিউল।

“তখন আবার মিডিয়াতেও আমার সৃষ্টি প্রকাশের একটা প্রচেষ্টা চালাই। কিন্তু না, কিছুতেই কিছু হচ্ছিল না। শেষমেশ সন্ধান পাই ঢাকা আর্ট কলেজের। আমার দ্বিতীয় জন্ম বলা যায় এই কলেজই আমাকে দিয়েছে।”

ঢাকা আর্ট কলেজ ও পুরষ্কার প্রসঙ্গ

“কলেজে (২০১৩-২০১৮) আসার পর থেকে অন্যরকম এক অনুভূতি কাজ করত। পরিবেশ, বন্ধু, স্যারের অনুপ্রেরণা, সবকিছুই যেন আমাকে গভীরভাবে ভালোবাসত। কলেজের প্রিন্সিপাল স্যার ডক্টর গোবিন্দ রায় আমার চকের ভাস্কর্য দেখে একরাশ মুগ্ধতা প্রকাশ করেন। বললেন, কলেজের এক যুগ পূর্তি (২০১৭) অনুষ্ঠানে তোমার ভাস্কর্যগুলো দেখতে চাই। স্যারের কথা মতো অংশগ্রহণ করি। প্রাপ্তির খাতায় যোগ হয় পুরষ্কার।”

সেখানে নতুনভাবে নিজেকে খুঁজে পান জাহেদ। পরে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে ২০২১ সালে পঞ্চম জাতীয় ভাস্কর্য প্রদর্শনীতে তার ২০০টি শিল্পকর্ম থেকে ৭২টি জমা দেন এবং জাতীয় পর্যায়ে পুরষ্কার জেতেন।

৫ম জাতীয় ভাস্কর্য প্রদর্শনী ২০১১ – পুরস্কার নিচ্ছেন সামিউল

ভিন্ন শিল্পে আগ্রহ এবং ভাস্কর্য তৈরিতে সময়

একটি ভাস্কর্য তৈরিতে জাহেদের মোটামুটি এক ঘন্টা সময় যায়। উদাহরণ দিয়ে জানালেন, কদিন আগেই লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চিকে চকে আনতে সময় লাগলো প্রায় দেড় ঘন্টা।

“নিজেকে খুঁজে পাওয়ার পর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সবসময়ই কাজে আসে। কিন্তু জোরজবরি করে কিছু একটা শেখার চেষ্টা থেকে নতুন কিছু পাওয়া যায় না। ঘুরেফিরে একই জিনিসের পুনরাবৃত্তি ঘটে।”

শিল্পীর প্রতি পরিবারের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন থাকা চাই

“আমি মনে করি, একজন শিল্পীর সাদামাটা জীবনের লোভ থাকে সবচেয়ে বেশি। বড় বড় দালান তাকে ছুঁতে পারে না, বিশাল অংকের টাকা উপার্জনের তার তেমন খেয়াল থাকে না। তাই, শিল্পীর পরিবার যদি সহজ চিন্তায় বাঁচেন, সৃষ্টিশীল মানুষের উপর যদি অর্থনৈতিক চাপ তৈরি না করেন, এর চাইতে ভালো সহযোগিতা আর হয় না।”

জাহেদ কুমিল্লা কালেক্টরেট স্কুল এন্ড কলেজে পড়ান। এর বাইরে খুব সামান্য অর্থের বিনিময়ে বাচ্চাদের আর্ট শেখান। আর বলতে গেলে অর্থ উপার্জন নিয়ে তার বড় কোনো পরিকল্পনা কোনোকালে ছিল না, এখনো নেই। তিনি শেষদিন পর্যন্ত এসব নিয়েই থাকতে চান।

সর্বশেষ কাজ ও ভবিষ্যত ভাবনা

“গত ১৮ - ২৫ মার্চ কুমিল্লায় আয়োজিত দ্বিতীয় চারুকলা প্রদর্শনীতে আমার চারটি শিল্পকর্ম ঠাঁই পায়। এর মধ্যে দু'টো ছিল ভাস্কর্য বাকি দু'টো পেইন্টিং। ভাস্কর্যের নাম ছিল, বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ এবং গোমতীর কান্না। ভবিষ্যত ভাবনা বলতে চকের ভাস্কর্যের মাধ্যমে গোটা বিশ্বে দেশের ঐতিহ্য তুলে ধরতে চাই এবং ব্যাপারটিকে কিভাবে বিষয়ভিত্তিক কিছু করা যায় সে চেষ্টা জারি থাকবে,” বলেন জাহেদ।  

যারা সৃষ্টিশীল কোনো কাজের সঙ্গে আছেন, তাদের জন্য জাহেদের পরামর্শ, “যা-ই আসুক, সাদরে গ্রহণ করুন। আপনি নতুন কিছু করলে, শুরুতেই তা সবার দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্যতা পাবে না, তাই চেষ্টাটুকু অব্যাহত রাখা দরকার।”

আর কখনোই শিল্প এবং কাজকে গুলিয়ে ফেলা উচিত নয় বলে মনে করেন জাহেদ। অনেকেই একমত না-ও হতে পারে, কিন্তু তার মনে শিল্প হচ্ছে মনের খোরাক, তা থেকে অর্থ উপার্জনের চিন্তা আসলে শিল্প হয়ে যায় কাজ।

“আর কাজ আপনাকে টাকা দিতে পারে, স্বস্তি দিতে পারে না।”

সঞ্জয় দত্ত ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে পড়াশোনা করছেন।

ই-মেইল: sanjoydatta0001@gmail.com



Share if you like

Filter By Topic