আপনার প্রিয়জনটি কি আপনার ওপর রাগ করে আছেন? কীভাবে রাগ ভাঙাবেন, বুঝতে পারছেন না? চিন্তার কোনো কারণ নেই, চকলেট নামক একটি একটি অতি সাধারণ (কিংবা অসাধারণ) খাদ্য আপনার উদ্দেশ্য সফল করে দিতে পারে। অতএব দেরি না করে প্রিয় মানুষটিকে একখানা চকলেটের বার উপহার দিয়ে দিন। ব্যাস, ল্যাঠা চুকে গেল! কোন ধরনের বা কোন স্বাদের চকলেট উপহার দেবেন, তাও স্থির করতে পারছেন না? চিন্তার কিছু নেই, আসুন জেনে নিই।
চকলেটের প্রকারভেদে যাওয়ার আগে চকলেট তৈরির ইতিহাস খানিকটা বলে নেওয়া দরকার। চকলেট জিনিসটা ঠিক কবে আবিষ্কার হয়েছে, দিন-তারিখ ধরে তা বলে দেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু এটা জেনে রাখতে পারেন, কোকোয়া বা ক্যাকাও থেকে তৈরি এই খাদ্যবস্তুটির ধারণা আপনার আমার ভাবনার চাইতেও পুরোনো। দু’হাজার বছর আগে যোকোয়াট্ল বলে একটি খাদ্যদ্রব্যের কথা পাওয়া যায়, যা ক্যাকাও বিনকে গাজন প্রক্রিয়ায় পচিয়ে তৈরি করা হতো। অবশ্য খাদ্যদ্রব্য না বলে একে পানীয় বলাই শ্রেয়, কারণ বস্তুটি ছিল তরল, তেতো এবং অ্যালকোহলধর্মী। পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মতে, এই পানীয়টির প্রচলন তারও আগে, মোটামুটিভাবে ১৪০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের দিকে। যেহেতু ক্যাকাও ফলের বীজ থেকে এটি তৈরি করা হতো, অতএব বলা যায়, এই যোকোয়াট্লই হচ্ছে আধুনিক চকলেটের পূর্বপুরুষ।
এ তো গেল ইতিহাস। এবার বিভিন্ন রকম চকলেট সম্পর্কে একটু জেনে নেওয়া যাক, যাতে করে আপনি উপহারের জন্য সঠিক স্বাদের চকলেটটি বেছে নিতে পারেন-
১. মিল্ক চকলেট
মিল্ক চকলেট হচ্ছে সেই চকলেটটি, যেটা আমরা সাধারণ দোকানে, বাজারে কিংবা সুপারশপে দেখতে পাই। এটি চকলেটের সঙ্গে দুধ যোগ করে তৈরি হয়, হতে পারে সেটা পাউডার দুধ, কিংবা তরল অথবা কনডেন্সড মিল্ক। ড্যানিয়েল পিটার নামে সুইজারল্যান্ডের একজন কনফেকশনার সর্বপ্রথম এমন চকলেট তৈরি করেন ১৮৭৫ সালে। সাধারণত মিল্ক চকলেটের আদর্শ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এটি ডার্ক চকলেট থেকে স্বাদে অনেকগুণ মিষ্টি এবং নরম। মিল্ক চকলেট তৈরির জন্য কমপক্ষে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ কোকোয়া দরকার এবং তার সঙ্গে দরকার কমপক্ষে ১২ শতাংশ দুধ। মিল্ক চকলেটের সবচেয়ে সুন্দর ব্যাপার হচ্ছে এর সুগন্ধ। চকলেট বারে প্রথম কামড়টি দেওয়ার আগে এর মধ্যকার ক্যারামেলাইজড চিনি, ভ্যানিলা, চকলেট আর দুধ মেশানো গন্ধ ভালো করে না নিলে স্বাদটা যেন ঠিক জমে না! তা ছাড়া মিল্ক চকলেটে আছে ক্যাফেইন, থিয়োব্রোমিন, ট্রিপটোফ্যান, টাইরোসিন ইত্যাদি চমৎকার রাসায়নিক, যা নিমেষেই মন ফুরফুরে করে দিতে পারে।
২. হোয়াইট চকলেট
নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে, এই চকলেটটির রং অন্য সব চকলেটের মতো বাদামি কিংবা কালচে-বাদামি নয়, বরং ধবধবে সাদা। এর কারণ হচ্ছে, অন্য সব চকলেটের মতো এতে কোকোয়া পাউডার ব্যবহার করা হয় না, পরিবর্তে ব্যবহার করা হয় কোকোয়া বাটার। সঙ্গে অবশ্যই পাউডার দুধ, মিল্ক ফ্যাট, লেসিথিন আর চিনিও থাকে। ১৯৩০ সালে নেসলে কোম্পানি সর্বপ্রথম এই চকলেট আবিষ্কার করে। তখন অবশ্য হোয়াইট চকলেটের বারগুলো ‘গ্যালাক’ নামে বিক্রি করা হতো।
আমেরিকার ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের নির্দেশনা অনুযায়ী, হোয়াইট চকলেট হিসেবে স্বীকৃত হতে হলে চকলেটের মধ্যে অবশ্যই কমপক্ষে ২০ শতাংশ কোকোয়া বাটার, ১৪ শতাংশ পাউডার দুধ, ৩. ৫ শতাংশ মিল্ক ফ্যাট এবং ৫৫ শতাংশ চিনি কিংবা মিষ্টিকারী দ্রব্য থাকতে হবে। এ কারণে এই বিশেষ চকলেটটি বেশ ভালোরকম মিষ্টি; মিষ্টি যেকোনো সম্পর্কের উপহার হিসেবে এটিও খুব ভালো পছন্দ হতেই পারে!
৩. ডার্ক চকলেট
ডার্ক চকলেটের বিশেষত্ব হলো, হোয়াইট কিংবা মিল্ক চকলেটের মতো এতে কোনো দুগ্ধজাত দ্রব্য নেই, যার জন্য ডার্ক চকলেট খাবার পর জিভটা অনেকখানি তেতো হয়ে থাকে। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে, তেতো স্বাদ সত্ত্বেও পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার শতকরা ৩৫ ভাগই অন্যান্য চকলেটের চেয়ে ডার্ক চকলেটকে অগ্রাধিকার দেয়। সাধারণভাবে ডার্ক চকলেটের উপাদানগুলো হচ্ছে ক্যাকাও বিন, সয় লেসিথিন, চিনি এবং অল্পস্বল্প ভ্যানিলার মতো নির্যাস। ক্যাকাও বিনের আধিক্যের জন্য মিল্ক চকলেটের থেকে এর রং অনেক বেশি কালো এবং গাঢ়।
ডার্ক চকলেট পুষ্টিগুণে বেশ সমৃদ্ধ। এতে থাকে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট এবং জিংক, ফাইবার, আয়রন, ম্যাগনেসিয়াম, কপার, ফসফরাস ইত্যাদি খনিজ, যা গ্রহণকারীর হৃৎপিণ্ডকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে, এবং একই সঙ্গে শরীরে রক্ত চলাচলেরও উন্নতি ঘটায়।
৪. সেমি-সুইট চকলেট
এই চকলেটটি ডার্ক চকলেটের চেয়ে কিছুটা মিষ্টি, কারণ এতে চিনির আধিক্য একটু বেশি। যেখানে ডার্ক চকলেটে চিনির পরিমাণ ৫ থেকে ১০ শতাংশ হয়, সেখানে সেমি-সুইট চকলেটে প্রায় ৩০ শতাংশ চিনি থাকে। এ চকলেট সাধারণত বেকিংয়ের কাজে ব্যবহৃত হয়, কারণ এতে মিষ্টতা এবং চকলেটের ফ্লেভারের মধ্যে একটা সুন্দর ভারসাম্য থাকে। তাই যেকোনো ধরনের রেসিপিতে এই সেমি-সুইট চকলেট সুন্দরভাবে মানিয়ে যায়।
৫. বিটার-সুইট চকলেট
এটি সেমি-সুইট চকলেটের চেয়ে একটু বেশি তেতো স্বাদের, কারণ এতে ক্যাকাও পাউডারের পরিমাণ সেমি-সুইট চকলেটের চেয়ে প্রায় ১৫ শতাংশ বেশি থাকে, যে কারণে এর রংও হয় বেশ গাঢ়। অনেক দেশে ডার্ক চকলেট আর বিটার-সুইট চকলেটকে প্রায় একই জিনিস বলে মনে করা হয়। যেমন, ইউরোপের দেশগুলোতে বিটার-সুইট চকলেটকেই ডার্ক চকলেট বলা হয়, যেহেতু দু’টোর রংই প্রায় এক।
তা ছাড়া বেকিংয়ের ক্ষেত্রেও বিটার-সুইট চকলেট সেমি-সুইট চকলেটের একটি ভালো বিকল্প। যদি বেক করার সময় হাতের কাছে সেমি-সুইট চকলেট না থাকে, তবে খানিকটা মিষ্টি যোগ করে বিটার-সুইট চকলেটও ব্যবহার করতে পারেন।
৬. সুইট জার্মান চকলেট
এটি মূলত বেকিং চকলেট। এই বিশেষ ধরনের চকলেটটি প্রথম আবিষ্কার করেন জনৈক স্যামুয়েল জার্মান; তার নামানুসারেই এই চকলেটের নাম হয় সুইট জার্মান চকলেট। সুইট জার্মান চকলেটের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এতে সরাসরি চিনি যোগ করা হয়, যে কারণে সেমি-সুইট চকলেট থেকে এটি বেশি মিষ্টি। এই চকলেটটি সাধারণত ব্যবহৃত হয় জার্মান চকলেট কেক তৈরিতে, যার ভেতরে এই সুইট জার্মান চকলেটের তিনটি আলাদা আলাদা স্তর থাকে
৭. রুবি চকলেট
চকলেটের জগতে নবতম সংযোজন এই চকলেটটি প্রথম তৈরি করা হয় চীনে, ২০১৭ সালে। রুবি চকলেট মূলত তৈরি হয় রুবি কোকোয়া থেকে, যা প্রাকৃতিকভাবে শুধুমাত্র ব্রাজিল এবং ইকুয়েডরেই পাওয়া যায়। রুবি কোকোয়ার কারণেই রুবি চকলেটের মধ্যে একটা গোলাপি আভা লক্ষ করা যায়। যদ্দূর জানা যায়, রুবি চকলেটের স্বাদ নাকি অনেকটা হোয়াইট চকলেট আর বেরি ফলের মিশ্র স্বাদের মতো, যদিও এই চকলেটের রেসিপিতে বেরি ব্যবহারের কোনো নামগন্ধও নেই!
সেই অ্যাজটেকদের আমল থেকে আজ পর্যন্ত চকলেট যেকোনো উদ্যাপনের একটি অঙ্গ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আজকের দিনে এসে চকলেট শুধুই একটি মিষ্টিজাতীয় খাদ্য নয়, মানুষের আবেগ-অনুভূতি সঙ্গে অনেকটাই জড়িয়ে গেছে এই আপাত কালচে-বাদামি খাদ্যটি। তাইতো জন্মদিন হোক বা বিয়ের প্রস্তাব, চকলেটের শক্তিশালী উপস্থিতি সবক্ষেত্রেই লক্ষণীয়। এভাবেই আরও হাজার হাজার বছর চকলেট টিকে থাকুক, ফোঁকলা দাঁতের কোনো বাচ্চার হাসি কিংবা উপহারের বাক্সে এক চিলতে আনন্দ হয়ে।
শুভদীপ বিশ্বাস তূর্য শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে পড়াশোনা করছেন। ইমেইল: shuvodipbiswasturja1999@gmail.com
