চট্টগ্রাম নগরীর আগ্রাবাদে অবস্থিত জাতিতাত্ত্বিক জাদুঘরে বাংলাদেশের প্রায় ২৫টি জাতি এবং বিদেশি ৫টি জাতির বিভিন্ন নিদর্শন স্থান পেয়েছে।
১৯৬৫ সালে চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে ১.২৫ একর জায়গার উপর এ জাদুঘর নির্মিত হয়। এশিয়া মহাদেশের দুইটি জাতিতাত্বিক জাদুঘরের মধ্যে আকার-আয়তন ও সংগ্রহের দিক দিয়ে এটি বৃহত্তম। বর্তমানে জাদুঘরটি বাংলাদেশ প্রত্নতত্ব অধিদপ্তরের আওতায় পরিচালিত হচ্ছে।
জাদুঘরের ভেতর প্রবেশ করলে দেখা যায় পুরো জাদুঘরটি ৫ টি কক্ষে বিভক্ত যেখানে একটি কেন্দ্রীয় হলঘরসহ রয়েছে ৪ টি গ্যালারি।
কেন্দ্রীয় হলরুমে স্থান পেয়েছে বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ব্যবহার্য অলংকার, বাসন-কোসন এবং তাদের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত বিভিন্ন উপাদান। এরমধ্যে কোমরের বিছা, হাতবালা, পায়ের খাড়ু, কানের দুল, গলার মালা, ইত্যদি যে কোনো দর্শনার্থীর নজর কাড়বে।
এছাড়া কক্ষটিতে আরো স্থান পেয়েছে বাঙ্গালী মেয়েদের চুড়ি, মালা, মাথার ক্লিপসহ আরো কিছু জিনিস। পাশাপাশি খুমি, বম, ত্রিপুরা, তঞ্চংগ্যা, চাক, খ্যাং, লুসাই, পাঙ্খো, হাজং, মনিপুরি, গারো, ওঁরাও, মুন্ডা, সাঁওতাল, এবং পলিয়া জনগোষ্ঠীর ব্যবহার্য বিভিন্ন ধরনের উপাদান রয়েছে এখানে। অন্যদিকে ঐ কক্ষের দেয়ালে কাচের বাক্সে স্থান পেয়েছে পাকিস্তানের সিন্ধু অঞ্চলের মানুষের জীবনধারণের বিভিন্ন নিদর্শন।
হলরুম পেরিয়ে বামপাশের প্রথম গ্যালারিটি দুটি কক্ষে বিভক্ত। প্রথম কক্ষে ঢুকলে দেখা যাবে বাঙালি সংস্কৃতির নানা চিত্র।
কক্ষের একেবারে সামনের দিকে চোখে পড়বে নদীমাতৃক বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনের উপাখ্যান যেখানে জেলে জাল হাতে দাঁড়িয়ে আছে, আর পাশে জেলেপত্নী ঘোমটা মাথায় দাঁড়িয়ে চিরচারিত রূপে। এছাড়া গ্রামীণ মানুষের পোশাক-পরিচ্ছদ এবং তাদের নিত্য ব্যবহার্য বিভিন্ন দ্রব্যও সেখানে স্থান পেয়েছে।
গ্রামবাংলার পরিচিত চরকাও দেখতে পাবেন নিজ চোখে। কাঠের তৈরি এ চরকিটি গ্যালারির একপাশে পরম যত্নে স্থান পেয়েছে। এছাড়া রয়েছে সুপ্রাচীন বাংলার বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র, বাঁশের তৈরি জিনিসপত্র, মূর্তি।
একই গ্যালারির দ্বিতীয় কক্ষে রয়েছে পাকিস্তানের সিন্ধি, পাঞ্জাবী এবং পাঠানদের বিভিন্ন অস্ত্রশস্ত্র ও পোশাক। এছাড়া পাকিস্তানের সোয়াত অঞ্চলের বিভিন্ন নিদর্শনও এখানে আসলে দেখা মিলে।
তৃতীয় এবং চতুর্থ গ্যালারির প্রত্যেকটিতে একটি করে কক্ষ রয়েছে। সেগুলোতেও উপজাতি জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন দ্রব্য স্থান পেয়েছে। এর মধ্যে তৃতীয় গ্যালারিতে গেলে ভারতীয় এবং রাশিয়ান জনগোষ্ঠীর জাতিসত্তার বিভিন্ন নিদর্শন দেখতে পাওয়া যায়।
তবে এখানকার আরেকটি জিনিস দর্শনার্থীদের নজর কাড়বে। সেটি হলো বিভিন্ন পশুপাখির মৃতদেহ ঔষধ প্রয়োগে অক্ষতভাবে সংরক্ষন করা হয়েছে এখানে।
এসব পশুপাখির মধ্যে রয়েছে বন বিড়াল, হাঁস, ডাহুক, দোয়েল পাখি, ঘুঘু, বক, মাছরাঙ্গা, কবুতর ইত্যাদি। এছাড়া সত্যিকারের বাঘ এবং হরিণের চামড়া, হরিণের মাথার খুলি, ইত্যাদি জিনিসও দেখা যাবে এখানে এলে।
জাদুঘরটি রবিবার বাদে সপ্তাহের বাকী ছয়দিন দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকে। তবে সরকার ঘোষিত সাধারণ এবং নির্বাহী আদেশে ছুটির দিন এ জাদুঘর বন্ধ থাকে। ২০ টাকা দিয়ে টিকেট কিনে ঘুরে আসা যাবে এ জাদুঘরটি।
জাতিতাত্ত্বিক জাদুঘরের বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে জানতে জাদুঘরটির গ্যালারি অ্যাসিস্ট্যান্ট মোহাম্মদ রুহুল ইসলামের সঙ্গে কথা হয় লেখকের। দর্শনার্থীদের সবচেয়ে ভালো সেবাটুকু দেয়ার কথাতেই তিনি জোর দেন।
“আমাদের জাদুঘরের পক্ষ থেকে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন জিনিস সংযোজন করা হয় যাতে করে দর্শনার্থীরা বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর পরিচয় সম্পর্কে আরো ভালোভাবে জানতে পারে। বর্তমানে সরকারি ছুটির দিন শুক্রবার এবং শনিবার দর্শনার্থীদের সংখ্যা অন্যান্য দিনের চেয়ে বেশি থাকে।”
কথা হয় জাতিতাত্ত্বিক জাদুঘরের গবেষণা সহকারী আবু বকর সিদ্দিকের সঙ্গে। তিনি বলেন, “বর্তমানে আমাদের সংগ্রহে আরো কিছু জাতিগত নিদর্শন রয়েছে। সেগুলো আগামীতে দর্শনার্থীদের উদ্দেশে জাদুঘরে রাখার চেষ্টা করছি।”
তিনি আরো জানান, “শিশুদের কথা মাথায় রেখে একটি শিশু কর্ণার করারও পরিকল্পনা আছে। সেখানে শিশুদের বিভিন্ন খেলার সামগ্রী এবং বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানের ছবি লাগানোর ব্যবস্থা করা হবে যাতে করে শিশুরা বিনোদনের পাশাপাশি কিছু শেখার সুযোগ পায়।”
তানজিম হাসান পাটোয়ারী বর্তমানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং ও ইন্স্যুরেন্স বিভাগে পড়াশোনা করছেন।
tanjimhasan001@gmail.com
