বাংলাদেশে ভিনদেশী পতাকা ওড়ানো কোনো নতুন ঘটনা নয়। ফুটবল বিশ্বকাপের সময় তো ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশের পতাকায় ছেয়ে যায় রাজধানীসহ সারাদেশ। কেউ কেউ আবার ভিনদেশের পতাকার উপরে নিজ দেশের পতাকাটাও রাখেন।
ফুটবল বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ভাল না থাকায় আর অদূর ভবিষ্যতে ফুটবল বিশ্বকাপের মূল আসরে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের কোনো সম্ভাবনা না দেখতে পাওয়ায় এ দেশের ফুটবলপ্রেমীরা অন্যদেশগুলোকে সমর্থন করে থাকেন। আর বিদেশি কোনো মেহমান আসলেও সংশ্লিষ্ট দেশের পতাকা বাংলাদেশের পতাকার পাশাপাশি ওড়ানো হয়। সেটা রাষ্ট্রাচারের অংশ হিসেবেই করা হয়ে থাকে।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের টিটোয়েন্টি ক্রিকেট সিরিজে বাংলাদেশি দর্শকদের পাকিস্তানকে সমর্থন, জার্সি পরিধান আর পতাকা বহন করা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে আলোচনা সমালোচনা চলেছে।
এর আগেও পাকিস্তান ক্রিকেট দল বাংলাদেশে এসে খেলেছে। তবে তখন এ বিষয়টা আলোচিত হয় নি। কারণ হলো এত সমর্থক-দর্শক হয়তো তারা আগে দেখে নি, যা দেখা গেছে মিরপুরের গ্যালারিতে। পাকিস্তানের জার্সি গায়ে ও পতাকা হাতে উল্লাস করে গলা ফাটিয়েছেন বেশ কিছু বাংলাদেশী দর্শক।
স্বাগতিক দেশের বিপক্ষে সফরকারী দলের জন্য এমন সমর্থন খুব কমই চোখে পড়ে। পাকিস্তানের ব্যাটসম্যান ফখর জামান এতটাই অভিভূত যে তার মনে হয়েছিল, পাকিস্তানেই খেলছেন তারা।
বাংলাদেশের অনেক দর্শকের এই উল্লাসকে অনেকে অশোভন বলেছেন। তাদের যুক্তি হলো, খেলাটা হচ্ছে বাংলাদেশের সাথে। আর ক্রিকেটে বাংলাদেশের অবস্থান তুলনামূলকভাবে ভাল; অন্তত অন্যান্য খেলার তুলনায়। সেখানে অন্য দেশের সমর্থন নিজেদের দেউলিয়াত্বের পরিচয় প্রকাশ করে।
কেউ কেউ আবার বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় সংঘটিত পাকিস্তানের তৎকালীন শাসকগোষ্ঠির মানবতাবিরোধী অপরাধগুলোর কথা মনে করিয়ে দিয়ে বলেছেন, যে দেশের আমাদের উপর নির্যাতন চালিয়েছে সে দেশের সমর্থন করাটা দেশপ্রেমের সাথে মানানসই নয়।
আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলাদেশের সাথে অনুষ্ঠিত ম্যাচে পাকিস্তান সমর্থনের পক্ষেও যুক্তি পাওয়া গেছে। অনেকেই বলছেন, এই সমর্থন শুধুমাত্র খেলার জন্য। এটার সাথে অন্য কিছুকে মেলানো অযৌক্তিক। যেহেতু দুটি দেশ সম্মতির ভিত্তিতে সিরিজ আয়োজন করেছে সেহেতু এখানে অতীতের ভিন্ন কোনো ঘটনা এখানে অপ্রাসঙ্গিক।
কারো কারো মতে, বর্তমানে বাংলাদেশের ক্রিকেট যোগ্য নেতৃত্বের মাধ্যমে সঠিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে না। যে কারণে দিন দিন দেশের ক্রিকেট অধপতনের দিকে ধাবিত হচ্ছে। সেই হতাশা থেকেই তারা নিজ দেশ বাদ দিয়ে ভিন্ন দেশকে সমর্থন করেছেন।
প্রথমে জেনে নেওয়া যাক দেশে পতাকা বিষয়ে কী ধরণের বিধিবিধান রয়েছে। বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা বিধি (পিপলস রিপাবলিক অব বাংলাদেশ ফ্ল্যাগ রুলস ১৯৭২) অনুযায়ী, বাংলাদেশে অবস্থিত কূটনৈতিক মিশনসমূহের চ্যান্সারি ভবন এবং কনস্যুলার অফিসসমূহে, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র প্রধান, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রীরা বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় সফরের সময় বিদেশের 'জাতীয় পতাকা' উত্তোলন করার অনুমিত রয়েছে। তবে সেটা বাংলাদেশের পতাকার মর্যাদা ও দেশের স্বার্থ সমুন্নত রাখার জন্য বিভিন্ন শর্ত আরোপ করা হয়েছে।
এতে এটাও বলা হয়েছে এসব বিধির বাইরে বাংলাদেশ সরকারের সুনির্দিষ্ট অনুমোদন ব্যতীত, বিদেশি রাষ্ট্রের পতাকা কোন গাড়িতে বা ভবনে উত্তোলন করা যাবে না।
বিবিসি বাংলায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খেলার মাঠে বা অন্য কোন দেশের সমর্থনে পতাকা ওড়ানোর বিষয়ে আইনে সুনির্দিষ্ট করে কিছু বলা নেই। এ নিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল আইসিসির হ্যান্ডবুক, রুল বুক বা ল'জ অব ক্রিকেটেও কোন বিধিবিধান নেই।
বাংলাদেশের ক্রিকেট বোর্ডের মিডিয়া বিভাগ জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট চলাকালে মাঠে বা অনুশীলনে পতাকা ব্যবহারের বিষয়ে কোন সুনির্দিষ্ট বিধি বিধান নেই বিসিবির।
এমনিতে দ্বিপাক্ষিক ম্যাচ চলাকালে বাংলাদেশসহ বিশ্বের যেসব মাঠে খেলা চলে সেসব মাঠে অংশগ্রহণকারী দেশ দুটি এবং আয়োজক বোর্ডের পতাকা ওড়ানোর রীতি আছে।
তবে ২০১৪ সালে মিরপুরের মাঠে এশিয়া কাপ টুর্নামেন্ট চলাকালে দর্শক গ্যালারিতে বিদেশি পতাকার আধিক্য নিয়ে তীব্র সমালোচনার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড দর্শকদের মাঠে প্রবেশের সময় ভিনদেশি পতাকা বহনে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল। যদিও এ নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে তুমুল সমালোচনা হলে একদিন পরেই সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয় বোর্ড।
এ নিয়ে আলোচনা সমালোচনার মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রী আ.ক.ম মোজাম্মেল হক সম্প্রতি বলেছেন, সংশ্লিষ্ট বিধি-বিধান পরীক্ষা করে খেলার মাঠে দর্শকদের পাকিস্তানের পতাকা বহন নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আর একটা ভিডিওতে দেখলাম, মিরপুর স্টেডিয়ামে এক দর্শকের গায়ে থাকা পাকিস্তানের জার্সি জোরপূর্বক খুলে নিচ্ছেন আরেক দর্শক। খুলে নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হচ্ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তানের নৃশংসতার কথা। একই যুক্তিতে পাকিস্তানি সমর্থকদের বিরুদ্ধে স্টেডিয়ামের সামনে এবং আরো দু'একটা জায়গায় কর্মসুচি পালন করা হয়েছে।
স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তানের সে সময়ের শাসকদের ভূমিকা নিঃসন্দেহে শুধু নিন্দনীয় নয়, মানবতা বিরোধী অপরাধ। তবে আমরা জানি, স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তানের ভূমিকা বিবেচনায় রেখেই দেশের নীতিনির্ধারকরা পাকিস্তানের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে তা চালিয়ে যাচ্ছেন। এরই অংশ হিসেবে ক্রিকেটেও বাংলাদেশ আর পাকিস্তানের সম্পর্ক বিদ্যমান রয়েছে। বিশ্ব ক্রিকেট নিয়ন্ত্রক সংস্থায় বিভিন্ন ইস্যুতেও এ দুটি দেশ পারস্পরিক সমর্থন অব্যাহত রেখেছে বলেই ধারণা করা যায়।
এই বিবেচনায় পাকিস্তানের সমর্থন করা আইনগত ভাবে কোনো অপরাধ হবে না। বিধি-বিধান দিয়ে বা জোরপূর্বক বিদেশি পতাকা বহন পুরোপুরি বন্ধও করা যাবে না। আর পতাকা বহন বন্ধ করা গেলেও জার্সি পরিধানের বিষয়ে তো কোনো আইন নাই। কেউ পতাকা-জার্সি ব্যবহার না করেও তো খেলার মাঠে সমর্থন করতে পারে। সেটা তো বন্ধ করা যাবে না।
অন্য দেশকে সমর্থন করাও যেমন বাংলাদেশের মত দেশের নাগরিকদের জন্য শোভনীয় নয়, তেমনি কাওকে জোরপূর্বক এই সমর্থন করা থেকে বিরত রাখাও অসম্ভব।
আমাদের ভাবতে হবে নিজ দেশের বিপক্ষে যেয়ে পাকিস্তান বা অন্য কোন দেশকে সমর্থন করাটা দেশের জন্য ক্ষতিকর কিনা? দেশের বিপক্ষে পাকিস্তান বা অন্য যে কোনো দেশের সমর্থন দেশের অগ্রগতিকে কিছুটা হলেও শ্লথ করে দেয় কিনা?
হয়তো ইউরোপ-আমেরিকার মত দেশে ভিন দেশের সমর্থন তাদের তেমন ক্ষতি করবে না। কারণ সেসব রাষ্ট্রসমূহ অনেক আগেই নিজ নিজ রাষ্ট্রব্যবস্থা, অর্থনীতিসহ সব বিষয়গুলো শক্তিশালী করে ফেলেছে। আমাদের দেশ এখনো সেই মাত্রায় উন্নত ও সমৃদ্ধ নয়। এ জন্য প্রয়োজন দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের প্রতি সব নাগরিকের গঠনমূলক আকঙ্খা, গঠনমূলক ভুমিকা নাগরিকদের একতা ও সংহতির বিকাশ।
এ আকাঙ্ক্ষার জন্ম হতে পারে জাতীয়তাবোধ থেকে যা নিজ দেশকে এগিয়ে নিতে নিজ নিজ গঠনমূলক দায়িত্ব পালনে প্রেরণা জোগায় ও জাতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
হয়তো কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠির কারণে কোনো ক্ষেত্রে আমাদের দেশ পিছিয়ে আছে। সে জন্য কি আমরা অন্য দেশের সমর্থন করবো নাকি পিছিয়ে থাকার কারণ দূর করতে নাগরিক হিসেবে ভূমিকা রাখবো- এই প্রশ্নের জন্ম দেয় জাতীয়তাবোধ।
rhmithunbcl@gmail.com
