ক্রেতাদের খুবই কাছে আছি। ৯৯ শতাংশ ক্রেতার তিন মাইলের মধ্যেই আছি।
এসব কথা নিশ্চিত ভাবে বলতে পারবে সে রকম ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হয়ত গুটিয়েক বা একেবারেই হাতে গোনা। তবে তাদের সামাজিক দায় বেশি এবং তা মুনাফা মুনাফা অর্জনের চেয়ে। তা যদি নাও হয়, তাহলে অন্তত দুটোই সমান। আর এটি বিলেতের জনগোষ্ঠীর অন্তরে লালিত হয়ে আসছে।
হ্যাঁ। বিলেতের বা ব্রিটেনের ডাক বিভাগের কথাই বলা হচ্ছিল। উল্লেখিত সব বৈশিষ্ট্যই এর রয়েছে। যুক্তরাজ্যব্যাপী ডাকঘরের সাড়ে ১১ হাজার শাখা সক্রিয়। প্রতি সপ্তাহে এসব শাখায় বা ডাকঘরে ৯০ লাখের বেশি মানুষের যাতায়াত।
ব্রিটেনের একটি শাখা ডাকঘর
তার মানে এই নয় যে ৩৬১ বছরের পুরানো এই সংস্থার সবকিছুই ঠিকঠাক চলছে। যুক্তরাজ্যের বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ছে। তার সাথে তাল রেখে নিজ কাজকর্ম ও সেবাদানের ধরণ বদল করে টিকে থাকতে গিয়ে রীতিমতো হিমসিম খেতে হচ্ছে ডাক বিভাগকে। এছাড়া, কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়ার ঘটনা ক্ষতিকারক বিষফোঁড় হয়ে দেখা দিয়েছে। যার পরিণামে ডাক বিভাগের অনেক অনেক সাব-পোস্টমাস্টারকে চাকরি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। ভুল বিচারের জেরে এমনটি ঘটেছে। যুক্তরাজ্যব্যাপী কর্ম ও সেবা তৎপরতা চালু রাখার জন্য কোটি কোটি পাউন্ড স্টারলিং চাইতে হবে ডাক বিভাগকে। চলতি বছরের শেষের দিকে সে টাকার জন্য সরকারের কাছে হাত পাতার কথা রয়েছে। কিন্তু ওই কেলেঙ্কারির ঘটনায় ডাক বিভাগকে এবারে সরকারের সামনে রীতিমতো নতজানু হয়ে দাঁড়াতেহবে।
কেলেঙ্কারির ঘটনায় স্পষ্ট এবং কঠোর অবস্থান নিয়েছে ডাক বিভাগ। কিন্তু তারপরও যে আদলে সংস্থাটি চলছে তা দিয়ে আজকের দিনে ব্যবসা চালানো সম্ভব কি না – ডাক বিভাগকে নিয়ে সেই দীর্ঘস্থায়ী প্রশ্ন আবার চাগিয়ে উঠবে। বায়েস ব্যবসা বিদ্যালয়ের অধ্যাপক বারবারা কাসু বলেন, ‘মনে হয় নতুন রাজস্ব আর আয় করতে পারছে না ডাকঘর। আর ডাক বিভাগ এবারে সত্যিই এক সন্ধিক্ষণে এসে পড়েছে, এমন পরিস্থিতিতে ব্যবসা কি করে চালু রাখবে সে সিদ্ধান্ত নিতেই হবে।’
ডাক বিভাগের খরচ আবারো কমানো এবং কাঠামো কাটছাঁট করা প্রায় অনিবার্য। পাশাপাশি এতেজন মানুষের সাথে ডাকঘরের সম্পর্ক আরো টানাপড়েনে পড়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। ব্রিটেনের একটি ডাকঘরের শাখা পোস্টমাস্টার সামি আহমেদের কথায় এমনি আভাস পাওয়া গেল। ১৯০ বছরের পুরানো তার শাখা ডাকঘরটি ওয়েস্ট ইয়র্কশায়ারে অবস্থিত। এর খুব কাছাকাছি রয়েছে ব্রুন্টি বোনদের অবস্থান-যেখান থেকে তাঁরা সাড়া জাগানো কালজয়ী উপন্যাসগুলো লিখেছিলেন (জেন আয়ার, ওয়াদারিং হাইটস ইত্যাদি)। সামি আহমেদ বলেন, তার শাখাটি বন্ধ করে দেওয়া হবে এবং এই জায়গায় থেকে দশ মিনিট দূরে একটি পাহাড়ের ওপরে খোলা হবে খাওয়ার দোকান এবং সেখানে সরিয়ে নেয়া হবে এ শাখা ডাকঘরকে। অবশ্য এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করছেন স্থানীয়রা। এরই মধ্যে এক হাজার মানুষ প্রতিবাদ-পত্রে সই করে তা কর্তৃপক্ষের কাছে পেশ করেছেন।
ক্ষুব্ধ সামি বলেন, “ডাক বিভাগ কর্তৃপক্ষ ঢাকগুড়গুড় ভাবে সব সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। খরচ কমানো এবং টাকা বাঁচানো ছাড়া এই শাখা ডাকঘরকে সরিয়ে নেওয়ার পেছনে কি কারণ থাকতে পারে তা বুঝে ওঠা দায়।”
২০১২ সালে নবগঠিত বেসরকারি রয়্যাল মেইল বিতরণ ব্যবস্থা থেকে ডাক বিভাগকে আলাদা করে নেওয়া হয়। ব্রিটেনের রাষ্ট্রীয় এই সংস্থা একইসাথে ব্যাংক ও ডাক সেবা দিচ্ছে। ভ্রমণবিষয়ক সেবা, বিল দেওয়া, সরকারি আমলাতান্ত্রিক কাজকর্ম করছে। ব্রিটেনের তীব্র প্রতিযোগিতার বাজারে এভাবে বাণিজ্যিক রূপ নিয়ে নগদ লাভের মুখ দেখার কোশেশ করছে ডাকঘর বিভাগ।
তবে ব্রিটেনের জীবন ব্যবস্থায় ডাকঘর বিভাগের একটা সামাজিক দায়বদ্ধতা আছে। এখানেই ডাক বিভাগের সাথে অন্যান্য ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানের প্রধান পার্থক্য রেখা আঁকা হয়েছে। করোনায় বিশ্বমারির কঠোর দিনগুলোতে শাখা ডাকঘরগুলো জীবনতরী হয়ে ওঠে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে বিশ্বমারির কঠিন সময়ে দোকানপাট ও ব্যাংক বন্ধ হয়ে যায়। অকূল পাথারে পড়া ছো্ট ব্যবসায়ী এবং বয়সী ও বিপদগ্রস্ত মানুষদের তখন সেবা যোগায় ডাকঘর।
গত একদশকে ডাক বিভাগে ব্রিটেন সরকারকে দুই বিলিয়ন বা ২০০ কোটি পাউন্ড স্টারলিং বিনিয়োগ করতে হয়েছে। ডাক বিভাগের আধুনিকায়ন খাতে গেছে এ বিপুল পরিমাণের টাকা। ২০২১-২২ সালের জন্য সরকারের কাছ থেকে ডাক বিভাগ পেয়েছে ২২ কোটি ৭০ লাখ পাউন্ড স্টারলিং। এই হিসাবের মধ্যে চার হাজার গ্রামীণ ডাকঘর চালু রাখা বাবদ পাঁচ কোটি পাউন্ড স্টারলিং ভর্তুকিও রয়েছে। ডাক বিভাগ বন্ধ করে দেওয়ার বিষয়টি ব্রিটেনের রাজনৈতিকমণ্ডলে স্পর্শকাতরতা স্পষ্ট হয় এই পরিসংখ্যানে।
হরাইজন কেলেঙ্কাকারিতে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এজন্য ডাক বিভাগর প্রয়োজন আরো কোটি কোটি পাউন্ড স্টারলিং ।এ টাকা যোগানোর সহায়তা করতে হবে ব্রিটিশ সরকারকেই। (যুক্তরাজ্যের ডাকবিভাগ ১৯৯৯ সালে হরাইজন নামে একটা হিসাবরক্ষণ সফটওয়্যার চালু করে। ২০১৩ সালের মধ্যে দেশটির সাড়ে ১১ হাজার শাখায় এর ব্যবহার শুরু হয়। হরাইজনের মাধ্যমে দৈনিক ৬০ লাখ লেনদেন হতে থাকে।তবে ১৯৯৯ সালের পর থেকেই হরাইজনে নানা ত্রুটিবিচ্যুতি এবং এ কারণে লোকসান গোনার খবর দিতে থাকেন সহকারী পোস্টমাস্টাররা।) পরবর্তীতে এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে শতশত সহকারী পোস্টমাস্টারের বিরুদ্ধে কথিত তহবিলতসরুপ, চুরি, ভুয়া হিসাব দেখানো প্রভৃতি অভিযোগ আনা হয়। ফলে কেউ কেউ চাকরি হারান, জেলে যান কেউ কেউ। সামাজিকভাবে মানহানি হওয়ায় অবমানাকর পরিস্থিতিতে পড়েন অনেকে, ঘটে বিবাহবিচ্ছেদ। চর্তুমুখো চাপে দিশেহারা হতভাগ্যদের শরীর ও মন ভেঙে পড়ে। উপায়ন্তর না দেখে কেউ কেউ আত্মহত্যার মতো চরম পথ বেছে নিতে বাধ্য হন। ব্রিটেনের সংসদ সদস্যরা এ মর্মান্তিক কেলেঙ্কারিকে দেশটির বিচারবিভাগের সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বড় গর্ভপাতের ঘটনা বা বিপর্যয় বলে অভিহিত করেন।
হরাইজন সফটওয়্যার ঘিরেই বিশাল কেলেংকারী তৈরি হয়
আসন্ন শরতে ব্রিটেনে সরকারের ব্যয়ের ব্যাপক পর্যালোচনা হবে। এই পর্যালোচনা পরবর্তী তিনবছর দেশটির মন্ত্রিসভার বাজেট নির্ধারণ করে থাকে। শরৎকালীন পর্যালোচনার সময়ে পর্যাপ্ত আর্থিক সহায়তার আবেদন জানাবে ডাক বিভাগ। এজন্য যে সব যুক্তি দেওয়া হচ্ছে সেগুলো হলো, প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন গরিব অঞ্চলগুলোকে ধনী অঞ্চলের ‘সমপর্যায়ে’নিয়ে আসার এবং বিশ্ব মহামারীর দেশটিকে ‘আরো ভালোভাবে গড়ে তোলার’যে উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা করেছেন, এ সহায়তা সে কাজে শক্তি যোগাবে। কিন্তু বিশ্বমারি-পরবর্তী ৩০০ বিলিয়ন পাউন্ড স্টারলিং ঘাটতি মোকাবেলা করতে হিমসিম খাচ্ছে ব্রিটিশ সরকার। আর সরকারি টাকা পাওয়ার জন্য ব্রিটেনে এমন তীব্র প্রতিযোগিতা আগে কখনো দেখা যায়নি।
ব্রিটেনের মানুষ যখন চায় জাতীয় স্বাস্থ্য, পুলিশ এবং স্কুলের খাতে আরো বেশি টাকা-কড়ি বরাদ্দ করা হোক, সেসময়ে ডাক বিভাগরে জন্য বিশাল অঙ্কের বরাদ্দ চাওয়া হলে তাতে বড়ো ধরণের সাহসই দেখানো হবে। বাকিংহামের রক্ষণশীল সংসদ সদস্য গ্রেগ স্মিথ বলেন, “হজম করার জন্য বিষয়টা খুবই কঠিন পাচ্য খাবার হিসেবে গণ্য হবে ... আমার এলাকার মানুষ এরই মধ্যে ডাক বিভাগের সেবাকে অতিমাত্রায় খরুচে হিসেবে দেখছে।”
[ফাইনান্সিয়াল টাইমসের নিবন্ধ থেকে বাংলায় রূপান্তর সৈয়দ মূসা রেজা]
