প্রতিনিয়ত পরিবর্তন ছোঁয়া বর্তমান যুগ কিংবা ভবিষ্যৎ সময় - যা একরকম ধ্রুব সত্যের মতো বহমান। আর তাইতো এখন সঠিক অনুমানে পরিবর্তন পড়তে পারাটাই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনীয় বিষয়। গত দশ বছর আগেকার প্রাতিষ্ঠানিক আচরণ নিয়ে বিশ্লেষণে গেলে এখন যে তা বৃহৎ পরিসরে নতুন মোড় নিয়েছে, বলাই বাহুল্য। একটা সময় ছিল, কর্মীর ওপর কঠোর আচরণ করতে পারাটাই যেন কর্তাব্যক্তির নিজেকে উপস্থাপনের উত্তম পথ হিসেবে বিবেচিত হতো। কিন্তু, কর্তার বহুলাংশে কর্তৃত্ব খরচের সে দিনটি আজ আর নেই। এখনকার কর্মীদের প্রধান এবং অন্যতম চাওয়া - বসটি যেন বন্ধুসুলভ হয়।
যে বা যারা নিজের কর্মীদের কাছের লোক হয়ে নিজেকে কর্তার কাতারে রাখতে চান - আমাদের আজকের লেখাটি মূলত তাদের জন্য।
স্বাধীনতা
প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ক্ষেত্রে কর্তাব্যক্তি হিসেবে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ গুণটি হলো - কর্মীদের পর্যাপ্ত স্বাধীনতা দেওয়া। কর্মীর যদি কর্মক্ষেত্রে যেকোনো পরিস্থিতিতে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে দশবার ভাবার দরকার পড়ে, সে ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান প্রধান কখনোই দক্ষ হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করতে পারেন না। অন্যদিকে তিনি বরং ক্রমশ কর্মীদের অপছন্দের কেউ হয়ে উঠতে থাকেন।
সমদর্শন
মর্ত্যলোকের সর্বত্রই সমতা শব্দটি বড্ড বেশি সুন্দর এবং উন্নত। কারণ যেকোনো কিছুর উন্নয়নের মূলে থাকে ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা। তাই একজন প্রতিষ্ঠান প্রধানের উচিত কর্মীর পদ বিবেচনা না করে, প্রয়াস এবং কাজ অনুযায়ী সমান দৃষ্টি স্থাপন করা। আসলে সব কর্মীই চায়, তার কর্মস্থলের শেকড়স্বরূপ মানুষটির মধ্যে যেন সমদর্শন ক্ষমতা থাকে।
পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ
বন্ধু কিংবা আত্মীয় যখন প্রতিষ্ঠান প্রধানের পক্ষপাতী আচরণে শামিল হয়, তখন খুব স্বাভাবিকভাবেই অন্য কর্মীদের কাছে বিষয়টি খুব বেশি দৃষ্টিকটু লাগে। অহরহ এমন অনেক উদাহরণ দেওয়া সম্ভব, যেখানে কর্তাব্যক্তি তার প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আত্মীয় কিংবা বন্ধুর নানাবিধ দোষ কৌশলে আড়াল করে রাখেন।
অনুপ্রেরণা
সব কাজ সব সময় সবার করা হয়ে ওঠে না। কিন্তু যখন কোনো কাজ ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও আদতেই সম্পন্ন করা জরুরি হয়ে পড়ে, তখন প্রয়োজন হয় অনুপ্রেরণা নামক জাদুর কাঠির। প্রতিষ্ঠান প্রধান যদি তার প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োজনে কোনো কাজ কর্মীর ওপর জোরপূর্বক চাপিয়ে দিতে যায়, বিষয়টি মোটেও দক্ষতার পরিচায়ক নয়। এ ক্ষেত্রে কর্মীর প্রয়োজন পড়ে উৎসাহী মনোবল কিংবা সাহসের। কর্তাব্যক্তি বিষয়টি পুরোদস্তুর রক্ষা করতে পারলে, নিঃসন্দেহে কর্মীদের পছন্দের কেউ হয়ে উঠতে পারেন।
সফল যোগাযোগ
মুখের কথা বোঝার চাইতে মনের কথা বুঝতে পারা যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু সবাই এ কাজটি খুব ভালোভাবে রক্ষা করতে পারে না। বরং অনেক প্রতিষ্ঠানের মালিক তার প্রতিষ্ঠান কর্মীদের সঙ্গে বাহ্যিক লেনদেনকেই বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকে। কাজটি আসলে নিতান্তই অদক্ষতার বাহক। কর্মী সব সময়ই চায়-কর্তাব্যক্তি যেন একই সঙ্গে তার ভেতর এবং বাইরের সত্তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা অন্তত করে।
বলার সুযোগ দেওয়া
এমন অনেক বস আছেন, যারা কর্মীর কথা বলা কিংবা শোনার ক্ষেত্রে খুব বেশি অনাগ্রহ প্রকাশ করেন। আসলে সব মুখেরই কিছু না কিছু বলার থাকে, সেগুলো আমলে নেওয়া না নেওয়া পরের কথা। কিন্তু প্রথম ধাপ হিসেবে ওগুলো শুনতে না পারলে, কখনোই নিজেকে ভালো কোনো মর্যাদায় ফেলা যায় না। তাই কর্মীর পছন্দের কেউ হতে চাইলে কর্তাব্যক্তির উচিত বলতে দেওয়া এবং মনোযোগ দিয়ে তাদের শোনা।
সহমর্মিতা
মানুষ বরাবরই সমস্যা নির্ভর। নানাবিধ জঞ্জাল থাকা যেন তার জীবনে একরকম নিশ্চিত। অনেক সময় একজন কর্মী ব্যক্তিগত সমস্যার বদৌলতে প্রাতিষ্ঠানিক বিভিন্ন কাজে পিছিয়ে পড়েন। এমতাবস্থায় কর্তাব্যক্তির সহমর্মিতা মিশ্রিত আচরণ খুব বেশি প্রয়োজন। আবার একজন কর্মীর প্রত্যাশা জুড়েও এমনটাই থাকে। কর্মীর পছন্দের প্রতিষ্ঠান প্রধান হতে চাইলে সহমর্মিতার ভান্ডারটিও সমৃদ্ধ করা দরকার।
সোজাসাপ্টা পদ্ধতি
স্বচ্ছ গালি, অস্বচ্ছ বুলির চাইতে উত্তম। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দেখা যায়, কর্তাব্যক্তি কাজ প্রসঙ্গে সমালোচনা বা আলোচনা সোজাসাপটা না করে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে করে থাকেন, কখনো বা বাঁকা কথাও বলেন। ব্যাপারটি একজন কর্মীকে মোটেও ভালো বোধ করায় না। তাই, কর্মীর কাছে নিজেকে উল্লেখযোগ্য করে তুলতে চাইলে সোজাসাপ্টা পদ্ধতিতে কথা বলা-মানসম্মত একটি ব্যাপার।
ভালো কাজের প্রতিদান
আমরা সবাই-ই ভালো কাজের প্রতিদান হিসেবে কিছু একটা চাই। বিষয়টি আমাদের আত্মিক অনুপ্রেরণায় মহৌষধসুলভ আচরণ করে। তদ্রুপ, নিজের ভালো কাজটির জন্য প্রতিষ্ঠান প্রধানের উপহার একজন কর্মীকে আরও দ্বিগুণ উদ্দীপনা দান করে। একজন যোগ্য কর্তাব্যক্তি হিসেবে কর্মীর পছন্দের কেউ হয়ে উঠতে চাইলে অবশ্যই বিষয়টি মাথায় রাখা উচিত।
যোগ্য এবং ভালো কর্তাব্যক্তি হয়ে ওঠার মানে শুধু এ-ই নয় যে, তা কেবলমাত্র প্রতিষ্ঠান প্রধানের নিজস্ব প্রয়োজনেই কাজে আসে, বরং প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের ক্ষেত্রেও এটি অন্যতম উপাদান হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
লেখক বর্তমানে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে অধ্যয়নরত। ই-মেইল: sanjoydatta0001@gmail.com
