কেন শোকে আচ্ছন্ন হই, কীভাবে তা সামলাই


অনিন্দিতা চৌধুরী | Published: March 17, 2021 16:16:28 | Updated: March 18, 2021 09:59:33


-Representational image

মানুষের জীবনে বিভিন্ন কারণে শোক জন্ম নেয়। প্রিয়জনের মৃত্যু, সম্পর্কে বিচ্ছেদ, কর্মজীবনে ব্যর্থতা ইত্যাদি বহু কারণেই ব্যক্তি শোকগ্রস্ত হতে পারে। শোকের প্রকার, সময়, ব্যক্তি ও কারণভেদে আলাদা আলাদা হয়। তবে এই আলাদা বিষয়ের মধ্যেও একটি সাধারণ প্যাটার্ন রয়েছে। শোকে প্রবেশ ও শোক থেকে বেরিয়ে আসার যাত্রায় কিছু ধাপ রয়েছে যা মোটামুটি সবার ক্ষেত্রেই এক। ১৯৬৯ সালে এলিজাবেথ কুবলার-রস নামক একজন সুইস মনোচিকিৎসক শোক যাপনের পাঁচটি এমন ধাপ চিহ্নিত করেন, যা কুবলার-রস পদ্ধতি হিসেবে পরিচিত। ধাপগুলোর ইংরেজি নামের আদ্যক্ষর মিলিয়ে DABDA বা ডাবডাও বলা হয়।

এ পদ্ধতি তাঁর অন ডেথ অ্যান্ড ডায়িং বইয়ে প্রথম প্রকাশ পায়। নিজের রোগীদের কেস স্টাডি থেকে কুবলার রস এই ধাপগুলো খুঁজে পান এবং জনসমক্ষে প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেন। এ পদ্ধতি যেন পৃথিবীর সকল শোকগ্রস্ত মানুষের জন্য এক আশ্বাসবাণী, এ-ও একদিন কেটে যাবে। তবে অন্য সব তত্ত্ব এবং পদ্ধতির মতো এটিও বহু সমালোচনার অংশীদার হয়েছে, কারণ অনেকে ধরে নিয়েছেন এতে থাকা ধারাবাহিকতা অনুযায়ীই সবার শোক শুরু ও শেষ হবে, এমনটা বলা হয়েছে। সমালোচনার উত্তরে কুবলার-রস বলেছেন, এই ধাপগুলো অত্যাবশ্যকীয়ভাবে সরলরৈখিক না-ও হতে পারে। এমনকি সবাই মধ্যভাগে থাকা প্রতিটি পর্যায়ের সম্মুখীন না-ও হতে পারে। আজকের লেখায় আমরা কুবলার-রস পদ্ধতির পাঁচটি ধাপ সম্পর্কে জানব।

প্রথম ধাপে থাকছে অস্বীকৃতি বা ডিনায়াল। শোক কোনো পূর্বনির্ধারিত বিষয় নয়, যখন ব্যক্তি সবচেয়ে কম আশা করে, বেশির ভাগ সময় তখনই শোক তার ওপর কোনো ঘটনা বা দুর্ঘটনার মধ্য দিয়ে জেঁকে বসে। তাই খুব স্বাভাবিক একটি প্রতিক্রিয়া হিসেবে চলে আসে অস্বীকার করার প্রবণতা। কঠোর বাস্তব এক ঝটকায় মেনে নেবার চাইতে না মেনে নিয়ে তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়াই সহজ মনে হয় তখন। ধরা যাক, কেউ তার কাছের কোনো আত্মীয়ের মৃত্যুসংবাদ পেল বা নিজের কোনো বড় অসুখের কথা জানতে পেল। তার প্রথম প্রতিক্রিয়াই থাকবে, খবরটি সত্য নয়। তার মনে হবে, কোথাও কোনো ভুল হয়েছে এবং ঠিক খবরটি যেকোনো সময় চলে আসবে, সবার ভুল ভেঙে যাবে। মিথ্যে আশা জন্ম নেয় এ পর্যায়েই।

অস্বীকৃতির পর আসে রাগ। তখন ব্যক্তি বুঝতে পারে, যা ঘটেছে, তা সত্যিই ঘটেছে এবং এটিই এখন বাস্তবতা। তখন নিজেকে খুব বঞ্চিত বলে মনে হয়। যেকোনো দুর্ঘটনা যত দিন অন্যের সঙ্গে ঘটে, তত দিন সেটি সংবাদ। কিন্তু যখন নিজস্ব পরিসরেই বিষয়টি ঘটে, তখন আর তা থেকে পালানো যায় না। এ অসহায়ত্বের অনুভূতি রাগে রূপ নেয়। মনে হতে থাকে, কেন আমার সঙ্গেই এমন হয়? এ রাগ নিজের মধ্যে থাকে, আবার তখন কেউ সান্ত্বনা দিতে চাইলে তার ওপরও ঝেড়ে ফেলা হয়। গবেষকদের মতে, রাগ এ সময় খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নিজের মধ্যে রাগটা অনুভব করার মধ্য দিয়েই ব্যক্তি বাস্তবতার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে। ব্যক্তিত্বভেদে রাগের পর্যায় সংক্ষিপ্ত বা দীর্ঘ হতে পারে।

যখন রাগ কমতে থাকে, তখন ব্যক্তি কিছুটা স্বীকার করে নেয় বাস্তবতা। যদি সে বিশ্বাসী হয়, তবে চলে আসে দরাদরির পর্যায়। স্রষ্টার সঙ্গে সে দরাদরি শুরু করে, যদি সে বিপদ থেকে মুক্তি পায়, তাহলে এটা করবে-সেটা করবে, কিছুটা এমন। এ সময় নিজেকে দোষারোপের প্রবণতাও দেখা যায়। ব্যক্তি মনে করতে থাকে, যা ঘটেছে, তাতে তার কোনো দোষ ছিল। নিজেকে ভবিষ্যতে শুধরে নেবার বারংবার প্রতিজ্ঞা করতে থাকে সে। এ পর্যায়ে মিথ্যে আশা চূড়ান্ত রূপ নেয়। মনে হয় এখনো নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতেই আছে এবং কিছু একটা করে বাস্তবতা বদলে দেওয়া যাবে।

কিন্তু যখন এত দরাদরি করেও কিছুই বদলানো যায় না, তখন মানবমন গ্রাস করে নেয় বিষণ্নতা। যে ব্যক্তি, বস্তু বা সম্ভাবনা হারিয়ে গিয়েছে, সে শূন্যস্থানে জায়গা করে নেয় বিষাদগ্রস্ত অনুভূতি। এ সময় ব্যক্তি নিজেকে সকল সামাজিক সম্পর্ক থেকে দূরে সরিয়ে ফেলতে চায়। প্রতিদিন সকালবেলা বিছানা থেকে ওঠা বা ছোটখাটো প্রাত্যহিক কাজও তখন বিশাল বোঝার মতো মনে হয়। কোনো কাজ করতে ইচ্ছে হয় না, কাজের ফলাফল নিয়ে নির্লিপ্ততা জন্ম নেবার কারণে। সামনে এগোনোর কোনো কারণ আর ব্যক্তির কাছে অবশিষ্ট থাকে না। এমন সময় আত্মহত্যার প্রবণতাও দেখা দিতে পারে।

বিষণ্নতা থেকে ব্যক্তি শেষমেশ স্থানান্তরিত হয় শোকযাপনের শেষ পর্যায়ে। এর মধ্য দিয়ে বাস্তবতার সঙ্গে পুরোনো যোগাযোগ আবার তৈরি হয়। বিচ্ছিন্নতা থেকে সরে এসে ব্যক্তি আবার পুরোনো কাজ, পুরোনো মানুষের কাছে ফিরে আসে। শোকের স্মৃতি কখনোই ব্যক্তিকে পুরোপুরি ছেড়ে যায় না, তবে তা নিয়মিত জীবনের একটি অংশ হিসেবে নিয়ে সে আবার চলতে শুরু করে। ব্যক্তি যা হারিয়েছে, তা কখনো ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা না থাকলে সেই অপ্রাপ্তিকেই পরিচিত সঙ্গী করে নেবার পর্যায়-গ্রহণযোগ্যতা। ধীরে ধীরে কুয়াশা কাটতে শুরু করে, হয়তো পুরোটা মেনে নেবার পরক্ষণেই রোদ ঝলমল দিন আসে না, তবু নিজেকে সামলে নিয়ে জীবনকে দ্বিতীয় সুযোগ দেওয়া যায়।

Share if you like