কৃষক আন্দোলনের কেন্দ্রভূমে ভোটের পরীক্ষায় মোদীর দল


এফই অনলাইন ডেস্ক | Published: February 10, 2022 13:03:32 | Updated: February 10, 2022 19:11:30


কৃষক আন্দোলনের কেন্দ্রভূমে ভোটের পরীক্ষায় মোদীর দল

বিধানসভা নির্বাচনে ভোট দিচ্ছে ভারতের কৃষক আন্দোলনের কেন্দ্রভূমি উত্তর প্রদেশ, যে নির্বাচনকে বলা হচ্ছে ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে সেমি ফাইনাল। খবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের।

এ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন বিজেপির যোগী আদিত্যনাথের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী অখিলেশ যাদবের সমাজবাদী পার্টির নেতৃত্বাধীন জোট। রাজ্যের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদবকে ২০১৭ সালে বিজেপির কাছে হেরেই বিদায় নিতে হয়েছিল।

এনডিটিভি জানিয়েছে, সাত ধাপের বিধানসভা নির্বাচনে প্রথম ধাপে ভোট হচ্ছে ৫৮ আসনে। বৃহস্পতিবার সকালে ভোট শুরুর এক ঘণ্টা পর শামিল জেলার ম্যাজিস্ট্রেট জাসিত কাউর বলেছেন,কিছু কেন্দ্রে ইভিএম নিয়ে অভিযোগ পেয়েছেন তারা। তবে কোথাও গোলাযোগের খবর নেই।

বিধানসভা নির্বাচনে এই সাত পর্বে ভারতের পাঁচ রাজ্যে ভোট হবে, তবে উত্তর প্রদেশের ভোটযুদ্ধের দিকেই এখন সবার নজর।

সাধারণভাবে নামের আদ্যক্ষর ইউপি দিয়ে পরিচিত উত্তর প্রদেশ ভারতের সবচেয়ে জনবহুল রাজ্য। ২৪ কোটি মানুষের এ রাজ্য একটি স্বতন্ত্র দেশ হলে জনসংখ্যার দিক দিয়ে তা বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম দেশ হত; পাকিস্তান ও ব্রাজিলের চেয়েও বড় হত।

ভারতের পার্লামেন্টে সবচেয়ে বেশি এমপি আসেন উত্তর প্রদেশ থেকে, এ সংখ্যা ৮০। এ কারণে প্রায়ই বলা হয়ে থাকে, যে দল উত্তর প্রদেশে জয়ী হয়, তারাই দেশ শাসন করে। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুসহ ভারতের বেশ কয়েকজন প্রধানমন্ত্রী উত্তর প্রদেশ রাজ্য থেকেই এসেছেন।

ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী পশ্চিমাঞ্চলীয় গুজরাট রাজ্যের মানুষ হলেও তিনি যখন ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে প্রথম প্রার্থী হয়েছিলেন, তখন উত্তর প্রদেশের বারাণসী আসনকেই বেছে নিয়েছিলেন।

২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনেও মোদী এ আসন থেকে পুনরায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। ভারতের গত দুটি সাধারণ নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বিপুল জয়লাভের কৃতিত্ব দাবি করতেই পারেন উত্তর প্রদেশের ভোটাররা। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে দলটি এ রাজ্যে ৭১টি আসন পেয়েছিল। আর ২০১৯ সালের নির্বাচনে পেয়েছিল ৬২টি আসন।

তবে এমন রমরমা সবসময় ছিল না। ১৯৯০ এর দশকের শেষ দিক থেকে রাজ্যের রাজনীতিতে আঞ্চলিক সমাজবাদী পার্টি ও বহুজন সমাজ পার্টির (বিএসপি) আধিপত্য ছিল। দল দুটি পর্যায়ক্রমে ক্ষমতাতেও ছিল। কংগ্রেস ও বিজেপি তখন ছিল পেছনের সারিতে।

তবে প্রধানমন্ত্রী মোদীর জনপ্রিয়তা ও কারিশমার বদৌলতে ২০১৭ সালে এ রাজ্যের বিধানসভার ৪০৩ আসনের মধ্যে ৩১২ আসন পায় বিজেপি। সেবার প্রায় ৪০ শতাংশ পপুলার ভোট যায় গেরুয়ার পক্ষে।

রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে বিজেপি বেছে নেয় যোগী আদিত্যনাথকে। হিন্দু সন্ন্যাসী থেকে রাজনীতিবিদ হওয়া আদিত্যনাথ সমালোচিত হয়েছেন তার বিভক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে। বিজেপির এই কট্টর রাজনীতিবিদ আবারও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার আশায় আছেন।

আদিত্যনাথকে জিতিয়ে আনতে খোদ নরেন্দ্র মোদী বারবার উত্তর প্রদেশে ছুটে গেছেন। বেশ কয়েকবার ওই রাজ্য সফরে করে সভা-সমাবেশে ভাষণ দিয়ে বিজেপিকে আরেকবার সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ভোটারদের।

তবে উত্তর প্রদেশে এবার বিজেপির অবস্থান যথেষ্টই নড়বড়ে। বিতর্কিত কৃষি আইনের জেরে গত বছর যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তখন থেকেই বিজেপির অবস্থান দুর্বল হতে শুরু করে। এক বছরের বেশি সময় ধরে চলা কৃষক বিক্ষোভের মুখে শেষ পর্যন্ত ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার সেই আইন বাতিল করতে বাধ্য হয়।

তাছাড়া, গতবছর করোনাভাইরাস মহামারী মোকাবেলায় রাজ্য সরকারের ভূমিকাও ভোটারদের হতাশা বাড়িয়েছে। কোভিডে মারা যাওয়া শত শত মানুষের লাশ গঙ্গায় ভেসে উঠতে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে সরকারকে।

অবশ্য মহামারীর মধ্যে বিনা মূল্যে রেশন দিয়ে রাজ্য সরকার কিছু প্রশংসাও কুড়িয়েছে। কিন্তু বেকারত্ব আর মূল্যস্ফীতি নিয়ে রাজ্যে অসন্তোষ আছে।

৪৯ বছর বয়সী আদিত্যনাথ নির্বাচনী সমাবেশে দাবি করেছেন, তিনি রাজ্যে অনেক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছেন, অর্থনীতিকে চাঙ্গা করেছেন, আইনশৃঙ্খলার উন্নতি করেছেন। আবার হিন্দু ভোট জিততে মুসলিমবিরোধী বক্তব্যও রেখেছেন তিনি।

তার মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ৪৮ বছর বয়সী অখিলেশ যাদব এবার বিজেপির কাছ থেকে ক্ষমতা পুনরুদ্ধারে কঠোর পরিশ্রম করছেন। ক্ষমতায় গেলে রাজ্যের ঘরে ঘরে বিনামূল্যে বিদ্যুৎ দেওয়া, গরিব নারীদের জন্য পেনশনের ব্যবস্থা করা, কৃষকদের বিনাসুদে ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।

কয়েকটি ছোট আঞ্চলিক দলের সঙ্গে জোট বাঁধার পর আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে অখিলেশের জয়ের সম্ভাবনা বেড়েছে। অন্যদিকে দলিত নেত্রী মায়াবতীর নেতৃত্বে বিএসপিও ক্ষমতায় ফিরতে চাইছে। অবশ্য অনেকেই তার পক্ষে বাজি ধরতে রাজি নন।

মায়াবতী চারবার এ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। ২০১২ সালে তিনি ক্ষমতা হারান। মায়াবতী তার সম্প্রদায়ে জনপ্রিয়, কিন্তু ক্ষমতায় থাকাকালে নিজের এবং অন্যান্য দলিত আইকনের মূর্তি নির্মাণের জন্য কোটি কোটি রুপি ব্যয় করে তিনি সমালোচিত হন।

প্রায় এক দশক ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকায় মায়াবতী স্বাভাবিকভাবেই অনেকটা কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। এবার তার নির্বাচনী প্রচারও খুব একটা জমেনি।

উত্তর প্রদেশে ভোটের মাঠে রয়েছে ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসসহ আরও বেশ কয়েকটি ছোট দল। প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর নেতৃত্ব এবং উদ্যমী প্রচারে কংগ্রেস এবার মানুষের দৃষ্টি কাড়তে পেরেছে।

উত্তর প্রদেশে ধর্ষণ এবং পুলিশি নির্যাতনের শিকার নারীদের পরিবারের কাছে ছুটে গেছেন প্রিয়াঙ্কা। নির্বাচনী প্রচারে নারী ভোটারদের গুরুত্ব দিয়ে খবরের শিরোনাম হয়েছেন।

নির্বাচন ঘিরে প্রিয়াঙ্কার ব্যক্তিগত তৎপরতা অনেক বেশি থাকলেও মাঠ পর্যায়ে কংগ্রেসের প্রতি সমর্থন ততটা দেখা যায়নি।

আকার ও সংখ্যার কারণে উত্তর প্রদেশ ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী যুদ্ধক্ষেত্র। আর ভোটের ময়দানে থাকা দলগুলো এ নির্বাচনকে জীবন-মরণের লড়াই হিসেবে দেখছে।

১৯৮৯ সাল থেকে রাজ্যে কোনো দলই পরপর দুই মেয়াদে জয় পায়নি। বিজেপি এবং আদিত্যনাথ এই ধারা ভাঙতে চায়।

আবার এ নির্বাচনকে আদিত্যনাথের হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতির প্রশ্নে গণভোট হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী মোদীর জন্যও এ নির্বাচন তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগে উত্তর প্রদেশের বিধানসভা নির্বাচন তার জন্য একটি পরীক্ষা। আর বিজেপি উত্তর প্রদেশে হেরে গেলে সেটা কেন্দ্রের ক্ষমতায় থাকা দল এবং প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রিয়তা কমার লক্ষণ হিসেবেই দেখা হবে।

অখিলেশের জন্যও এ নির্বাচনে জয় পাওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ক্ষমতার বাইরে আরেক মেয়াদ থাকলে নেতা হিসেবে দলে তার অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়বে। আর তিনি নির্বাচনে হারলে ছোট আঞ্চলিক গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে তার জোটেরও অবসান ঘটতে পারে।

মায়াবতীর জন্যও জয়ের বিকল্প নেই। গত ১০ বছর তিনি ক্ষমতা থেকে দূরে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, এবারও হেরে গেলে হয়ত আর কখনোই ফিরে আসতে পারবেন না তিনি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, কংগ্রেস এবার আসলে জয়ের জন্য লড়ছে না। তারা আশা করছে, প্রিয়াঙ্কার কঠোর পরিশ্রম দলকে পুনরুজ্জীবিত করতে সাহায্য করবে এবং ভবিষ্যতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখার মত করে দলকে প্রস্তুত করে তুলবে।

রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও উত্তর প্রদেশ ভারতের স্বল্পোন্নত রাজ্যগুলোর একটি । দেশটির সবচেয়ে বেশি গরিব মানুষ এ রাজ্যেই বাস করে।

সম্প্রতি প্রকাশিত একটি সূচক অনুযায়ী, এ রাজ্যের মোট জনসংখ্যার ৩৭ দশমিক ৭৯ শতাংশই গরিব। ৪৪ শতাংশের বেশি মানুষ পুষ্টিবঞ্চিত। লাখো মানুষের বাড়িতে টয়লেট নেই।

ভোট তথ্য

>> উত্তর প্রদেশের বিধানসভার ৪০৩ আসন দখলের জন্য হাজারো প্রতিযোগী ভোটের লড়াইয়ে নেমেছেন।

>> ১ লাখ ৭৪ হাজার ৩৫১টি কেন্দ্রে ভোট দেবেন ১৫ কোটির বেশি ভোটার।

>> সাত ধাপে এক মাসের বেশি সময় ধরে ভোট হবে।

>> নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করতে পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর হাজারো সদস্যকে মোতায়েন করা হয়েছে।

>> বৃহস্পতিবারের পর ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০ ফেব্রুয়ারি, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ৩ মার্চ, ৭ মার্চ ধাপে ধাপে ভোট শেষে গণনা হবে ১০ মার্চ। সেদিনই জানা যাবে ইউপিবাসীর রায়।

Share if you like