কাওয়ালির সেকাল-একাল: বাংলাদেশে কারা গাইছেন, কোথায় গাইছেন


মাহমুদ নেওয়াজ জয় | Published: April 10, 2022 14:29:48 | Updated: April 10, 2022 19:12:40


ছবি: musicgoln.com

'দমাদম মাস্ত কালান্দার' কিংবা 'ইয়ে জো হালকা হালকা সুরুর হ্যায়' - এর মতো গানগুলো অনেকেরই শোনা। গানগুলোয় মূল একজন গায়ক থাকেন। আর সাথে ধুয়া বা তাল দেয়ার জন্য থাকেন আরো বেশ কয়েকজন।

গায়কের হাতে থাকে হারমোনিয়াম। সাথে আরো দুই-একটা হারমোনিয়াম থাকে সঙ্গত দেয়া শিল্পীদের সাথে। আর তার সাথে অন্যরা হাতে হাতে তালি দিতে থাকেন গানের সাথে।

সঙ্গীতের এই ধারাটির নাম কাওয়ালি। আরবি শব্দ 'কওল' থেকে এসেছে এই নাম। 'কওল' অর্থ বলা।

দশম শতাব্দীর দিকের কথা। সুফি সাধকরা খোদাপ্রেমে মশগুল হয়ে তাঁর গুণবাচক নামগুলো বার বার জপতেন। হযরত কুতুবউদ্দিন বখতিয়ার কাকী (রহঃ) কিংবা নিজামউদ্দিন আউলিয়া (রহঃ) এর দরবারে এরকম প্রার্থনামূলক সঙ্গীতের প্রচলন ছিলো। আল্লাহ-রাসূলের মাহাত্ম্য বর্ণনা করা হতো এই গানগুলোতে।

ইমাম আল গাজ্জালি (রহ) প্রথম গজল রচনা করেছিলেন। কাওয়ালির মূলসূত্রও নিহিত ছিল এখানে। পরবর্তীতে নিজামউদ্দিন আউলিয়ার অন্যতম প্রিয় শিষ্য আমির খসরু (রহঃ) সুনির্দিষ্ট কিছু নিয়ম-নীতির ভেতরে এই গানগুলোকে নিয়ে আসেন। এখান থেকেই আনুষ্ঠানিক সূচনা হয় কাওয়ালি গানের। তখন এই আসরকে বলা হতো মাহফিল-ই-সামা

আমির খসরুর প্রচলন করা এই ধারা বিশেষভাবে জনপ্রিয়তা পেয়ে যায় সুফি সাধকদের মধ্যে। সুফিদের ভেতর বিভিন্ন ঘরানার প্রচলন আছে। তবে চিশতিয়া তরিকার অনুসারীদের ভেতরই বেশি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে কাওয়ালি। 'গরিবে নওয়াজ' নামে খ্যাত খাজা মঈনউদ্দীন চিশতী (রহঃ) এর অনুসরণকারীরা চিশতিয়া তরিকার বলে পরিচিত।

সুফিরা মূলত আল্লাহ ও তার বান্দার ভেতর ভয়ের নয়, বরং প্রেমের ও ভালোবাসার সম্পর্ক স্থাপনে বিশ্বাসী। এভাবে স্রষ্টার কাছে নিজের অস্তিত্ব বিলীন করে দেয়াকে বলে ফানা-ফিল্লাহ হওয়া।

সে সময়ে এসব গানের মাধ্যমে বারংবার আল্লাহর নাম জপে তারা আল্লাহপ্রেমে মশগুল হয়ে যেতেন।

ছবি: উইকিপিডিয়া

কাওয়ালির ব্যাপারটি দিল্লী থেকে বাংলায় এসেছে আরো অনেক পরে। সুলতানি আমলে কাওয়ালির পেছনে শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ, গিয়াসউদ্দিন আযম শাহ-দের পৃষ্ঠপোষকতা ছিল।

একসময় ঢাকাই নবাবদের আমন্ত্রণে দিল্লী বা লখনৌ থেকে কাওয়ালি শিল্পীরা এদিকে আসতেন। তখন থেকে কাওয়ালি গানে মানব-মানবীর প্রেম, রাজা-বাদশাদের মাহাত্ম্য বা পানীয়ের গুণগানের ব্যাপারও আসতে থাকে।

কাওয়ালিতে সাধারণত দরবারে বাদশাহর মুখোমুখি বসতেন মূল গায়ক। তাকে বলা হতো মোহরি। আর সাথে আরো কয়েকজন ধুয়া (তাল) দিতেন।

এই তাল দেয়ার জন্য মূলত হাত ব্যবহার করা হয়। কখনো কখনো একতালের খঞ্জরের মতো বাদ্য রাখা হয়।

ছবি: canvasmagazine.com

আবার, কাওয়ালদের সম্মানী বা নজরানা দেয়ার পন্থাটাও ছিলো খুব চমকপ্রদ। কাওয়ালরা গান করার সময় উপস্থিত দর্শক-শ্রোতা মুগ্ধ হয়ে বলতেন 'মারহাবা, মারহাবা।' তার সাথে সাথে পছন্দমত পয়সা-কড়ি ছুঁড়ে দিতেন কাওয়ালদের দিকে।

এই পয়সা-কড়ি তোলার জন্য একজন ব্যক্তিকে নিযুক্ত করা হতো, যাকে বলা হতো 'মেজবান।' মেজবান সব অর্থ-কড়ি ঠিকভাবে সংগ্রহ করে বুঝিয়ে দিতেন কাওয়ালি দলকে।

পাকিস্তান আমলে কাওয়ালি গান ঢাকায় বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বিশেষত পুরান ঢাকা ও মোহাম্মদপুরে। তখন বিয়ে বাড়ি বা বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানেও কাওয়ালির চল ছিলো। পুরান ঢাকায় সেহরির সময় ক্বাসিদার পাশাপাশি মাইকে বাজতো 'ভর দো ঝোলি মেরি ইয়া মোহাম্মাদি', 'ইয়ে মেরি মুর্শিদ, মেরি কামলিওয়ালা'-র মতো গান।

এ সময় ঢাকার খুব নামকরা কাওয়াল ছিলেন চাঁদ রশিদ ও এহতেশাম রেজা খাঁ। এছাড়া আইয়ুব কাওয়াল, ছোট আইয়ুব, পিয়ারু কাওয়াল, আবদুল জব্বার ও হোসেন কাওয়াল জনপ্রিয় ছিলেন।

ছবি: amradhaka.com

এহতেশাম রেজা খাঁ-র পুত্র নাদিম এহতেশাম রেজা খাঁ পরিচিত 'নাদিম কাওয়াল' নামে। তিনি বলেন, আমাদের বংশে কাওয়ালির ইতিহাস তো প্রায় তিনশ বছরের হবে। আমার বাবা এহতেশাম রেজা, দাদা কেয়াম রেজা, তাঁদের পূর্বপুরুষ নবি রেজা বা ওয়ালি রেজাও কাওয়াল ছিলেন। আমার মামাত -ফুফাত ভাইয়েরাও যুক্ত কাওয়ালির সাথে। কেউ ভারতে আছে, তো কেউ পাকিস্তানে। সে হিসেবে আমি মনে হয় ঢাকার একমাত্র বংশগত কাওয়াল।

হাইকোর্টে শাহ শরফুদ্দিনের মাজার কিংবা মিরপুরে শাহ আলীর মাজারে তারা প্রায় নিয়মিত কাওয়ালি করে থাকেন। তবে মাসদুয়েক আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে কাওয়ালির আমন্ত্রণ পেয়ে বেশ আনন্দিত হয়েছিলেন। সেই আনন্দ অবশ্য স্থায়ী হয়নি। অনুষ্ঠানটি দুর্বৃত্ত হামলায় পণ্ড হয়ে যাওয়া নিয়ে বেশ কষ্টবোধ আছে তার। এমন অভিজ্ঞতা আর কোথাও হয়নি।

ষাটের দশকের পর বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রভাবে কাওয়ালির চর্চা কমে যায়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এই জায়গা নেয় সুফি ঘরানার বাউল বা মারেফতি গান। আবদুর রহমান বয়াতি, হালিম বয়াতি, রাজ্জাক দেওয়ানসহ অনেকে এই জায়গা নেন।

তবে আশি/নব্বই দশকের পর নুসরাত ফতেহ আলী খান বা সাবরি ব্রাদার্সের মাধ্যমে আবার কাওয়ালি জনপ্রিয়তা পেতে থাকে। এরা মূলত সুফি ঘরানার কাওয়াল ছিলেন। আবার, বদর মিঁয়াদাদ সুফি ও শিয়া উভয় ঘরানার কাওয়ালি করেছেন। যেমন - বান যা মালাং গাউস দা (গাউসুল আযমকে নিয়ে) কিংবা দম দম হুসেন (ইমাম হাসান - হুসেনকে নিয়ে)

ছবি: amradhaka.com

নাদিম কাওয়াল ছাড়াও ঢাকার অন্যতম আরেক কাওয়াল শাহাবুদ্দিন। তিনি মূলত মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পসংলগ্ন অনুষ্ঠানগুলোতে গান করে থাকেন। এই অঞ্চলটি উর্দুভাষী অধ্যুষিত হওয়ায় উর্দু বা হিন্দি ভাষায় করা কাওয়ালি এখানে খুবই জনপ্রিয়।

শাহাবুদ্দিন প্রায় পাঁচ দশক ধরে যুক্ত আছেন কাওয়ালির সঙ্গে। এছাড়া মোহাম্মদপুরের বিখ্যাত নিয়াজ ব্রাদার্স (নিয়াজ হাসান) বা আশরাফি ব্রাদার্সের কথাও উল্লেখ করা যায়। আশরাফি ব্রাদ্রার্সের অভিজ্ঞতা আছে ভারতেও আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে অনুষ্ঠান করার।

ঢাকার আরেক জনপ্রিয় কাওয়াল সামির হোসেন। তিনি মূলত আজিমপুর-লালবাগ অঞ্চলে গান করেন। আজিমপুর কবরস্থানের বিপরীতে থাকা 'মোবারক শাহ' বাড়িটিই মূলত তার দরগা। এটি পরিচিত 'ছোট দায়রা শরীফ' নামে। এর বর্তমান খাদেম তিনি। এখানে প্রতি শুক্রবার সন্ধ্যায় বসে কাওয়ালি গানের আসর।

এছাড়া মো. নূরে আলম ও ইকবাল কাওয়ালরাও এ সময়ের উল্লেখযোগ্য কাওয়ালি শিল্পী।

কাওয়ালি গানের চর্চা করছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ব্যান্ড 'সিলসিলা'-ও। এখানে ভোকাল হিসেবে আছেন লুৎফর রহমান। তারা 'কুন ফায়া কুন' গানটি কভার করে বিশেষত বেশ আলোচিত হয়েছেন।

কাওয়ালি গান গত প্রায় আটশ-নয়শ বছর ধরে গেয়ে চলেছে স্রষ্টাপ্রেম ও মানবপ্রেমের জয়গাঁথা। একারণে কাওয়ালি শিল্পীদের পড়তে হয়েছে উগ্রবাদীদের রোষানোলে। পাকিস্তানে যেমন আমজাদ সাবরিকে হত্যা করেছিলো তালেবান।

তবে এতকিছুর পরও কাওয়ালি থেমে থাকেনি। স্রষ্টার সাথে তার সৃষ্টির বন্ধনের, ভালোবাসার ও একাত্বতার জয়গান ধ্বনিত হয়েছে ও হচ্ছে কাওয়ালির কালাম বা বাণীতে। যুগে যুগে স্রষ্টার সৃষ্টি হিসেবে মানুষে-মানুষে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের বাণী ছড়িয়ে দিচ্ছে কাওয়ালি গান।

মাহমুদ নেওয়াজ জয় বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে চতুর্থ বর্ষে অধ্যয়নরত।

mahmudnewaz939@gmail.com

Share if you like