Loading...

কল্পনাই যখন ভবিষ্যতের বাস্তবতা

| Updated: July 10, 2021 20:01:58


Representational image Representational image

"যা কিছুই‌ এখন প্রতিষ্ঠিত, তা আগে ছিল শুধুই কল্পনা" উইলিয়াম ব্লেইকের এই কথাটি চিরন্তন সত্য। আমরা আমাদের চারপাশে যা কিছুই দেখি, তা কোনো না কোনো সময় কারো কল্পনা ছিল। পাখির মতো ডানা মেলে আকাশে উড়ে বেড়াবো, স্বপ্ন ছিল আব্বাস ইবন ফিরনাস, লিওনার্দো দা ভিঞ্চিসহ আরো অনেকের, যা সম্পূর্ণ হয়েছে রাইট ব্রাদার্সদের মাধ্যমে। রাইট ব্রাদার্সও একসময় শুধু কল্পনাই করেছেন আকাশজয়ের।

নেলসন ম্যান্ডেলা কল্পনা করেছিলেন বর্ণ-বৈষম্যহীন এক আফ্রিকার। তিনি কারাবন্দি ছিলেন দীর্ঘ ২৭ বছর। এই ২৭ বছর তিনি একই কল্পনা করে গিয়েছেন যে, একদিন তিনি শুধু আফ্রিকাই নয়, বরং সমগ্র বিশ্বকে বর্ণবৈষম্যের বেড়াজাল থেকে মুক্ত করে তুলবেন।

কল্পনাশক্তি আমাদের জীবনকে নতুন দিশা দিতে পারে। তাই কল্পনাশক্তিকে কাজে লাগাতে হয়। আর কল্পনাশক্তিকে কাজে লাগিয়ে কীভাবে বাস্তবে রূপ দেওয়া যায়, তা নিয়ে আজকের লেখা।

আত্মবিশ্বাস

কল্পনাশক্তিকে বাস্তবে রূপান্তরিত করার প্রথম শর্তই হলো আত্মবিশ্বাসী হওয়া। অদম্য ইচ্ছাশক্তি অর্থহীন হয়ে পড়ে, যদি নিজের ইচ্ছাশক্তির প্রতি নিজেরই আস্থা না থাকে। তাই নিজের কল্পনাশক্তিকে হেয় না করে তার উপর আমাদের আস্থা রাখা উচিত। এটাই আত্মবিশ্বাস।

একজন আত্মবিশ্বাসী ব্যক্তি জানেন যে, একদিন তার কল্পনা বাস্তবে রূপান্তরিত হবে। কল্পনাশক্তি তৈরি হয়, যা কখনো হয়নি- তার উপর বিশ্বাস করে। অর্থাৎ, শুরু থেকেই ‘অযৌক্তিক’, ‘অবাস্তব’ ইত্যাদি শব্দের সাথে বসবাস করতে হবে। লোকে অনেক কিছুই বলবে। তাদের পারিপার্শ্বিক যৌক্তিকতা দিয়ে আপনাকে বোঝানোর চেষ্টা করবে। তবে আপনার আত্মবিশ্বাসী হতে হবে। সব অবাস্তব কিছুকে বাস্তবতায় পরিণত করার সাহস থাকতে হবে। তবেই একদিন আপনার কল্পনা যৌক্তিক ও বাস্তবায়িত হবে।

নিজেকে যাচাই

কল্পনাশক্তিকে কাজে লাগাতে হলে নিজের শক্তি-সামর্থ্যের যাচাইটাও করে নেওয়া উচিত। আপনার সবল ও দুর্বল দিকগুলো চিহ্নিত করতে হবে। এছাড়া, কল্পনাশক্তিকে কাজে লাগাতে প্রয়োজনীয় বিষয়গুলোর দিকেও দিতে হবে সূক্ষ্ম নজর।

যাচাই প্রক্রিয়া শেষ হলে কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জনের জন্য আপনার জীবনে যা যা পরিবর্তন করা প্রয়োজন, তা করতে পারেন। অভ্যাসে ছোটখাটো পরিবর্তন কল্পনার বাস্তবে বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।

সম্পদের ব্যবহার

সত্তরের দশকের বিখ্যাত উপন্যাস ‘ইলিউশন: দ্য অ্যাডভেঞ্চার অভ আ রিলাকট্যান্ট মেসিয়া’-এর লেখক রিচার্ড বাক বলেন, "কোনোকিছু বাস্তবে আনতে হলে প্রথমে কল্পনা করতে হবে যে, তা বর্তমানে ইতোমধ্যেই আছে।" কল্পনাশক্তিকে আমাদের অনেক সময় অযৌক্তিক মনে হয়। আমরা মনে করি যে কল্পনাকে বাস্তবে রূপায়িত করার জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ অনুপস্থিত। তাই সঠিক সম্পদের খোঁজ করা এবং তা কাজে লাগানো অত্যন্ত জরুরি।

আপনি নতুন ব্যবসা করতে চাচ্ছেন, কিন্তু বিনিয়োগ করার মতো পুঁজি নেই। তাই ভাবছেন যে ব্যবসা করতে পারবেন না। তাহলে সেটা ভুল। শূন্য থেকেও ব্যবসা শুরু করা যায়। অর্থ বিনিয়োগ করার আগে আপনি বাজার সম্পর্কে ধারণা নিতে পারেন। ছোট ছোট সঞ্চয় করতে পারেন, খরচের খাত পরিবর্তন করতে পারেন, কাঁচামাল সংগ্রহের স্থান সম্পর্কে জেনে নিতে পারেন। এরকম বিভিন্ন উপায়ে সম্পদে্র ব্যবহার করতে পারেন। আপনি নিজেই নিজের সবচেয়ে বড় সম্পদ। তাই নিজের শক্তি-সামর্থ্যকে কাজে লাগিয়ে কল্পনাকে বাস্তবায়িত করা সম্ভব।

কঠোর পরিশ্রম

কঠোর পরিশ্রমী হওয়া মেধাবী হওয়ার থেকে গুরুত্বপূর্ণ। জরুরি নয় যে, আপনি মেধাবী হলে যেকোনো কাজ করতে পারবেন। তাই মেধার পাশাপাশি শ্রম অনেক প্রয়োজনীয়।

ভেবে দেখুন, পৃথিবীর সব আবিষ্কারের নেপথ্যের গল্পগুলো। একটা জিনিস সবক্ষেত্রে লক্ষ্য করবেন। সেটি হলো পরিশ্রম। রাইট ব্রাদার্সের আকাশ ছোঁয়া থেকে মেথিউ ওয়েবের প্রথম ইংলিশ চ্যানেল জয় কিংবা এডমন্ড হিলারির পায়ের নিচে এভারেস্টের চূড়া, সবকিছুই দীর্ঘদিনের অধ্যবসায় ও পরিশ্রমের ফল। যা-কিছু কখনোই হয়নি, তা করা সম্ভব শ্রম দিয়ে।

ধৈর্য

কল্পনাকে বাস্তবায়িত করতে হলে ধৈর্য থাকা প্রয়োজন। সঠিক সময়ে সঠিক কাজটি না করতে পারলে সাময়িকভাবে ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই ধৈর্যধারণ করতে হবে। সময় পরিবর্তনের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

আপনি যদি সৃজনশীল কিছু করতে চান, তাহলে ধৈর্য রাখতে হবে, যতক্ষণ না পর্যন্ত আপনি দক্ষ না হয়ে ওঠেন। উদ্যোক্তা হলেও ধৈর্যধারণের বিকল্প নেই। প্রতিনিয়ত নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করতে পারেন। এতে বৈরী সময়ে ধৈর্য্য ধরতে সহায়তা হবে।

অধ্যবসায়

ধৈর্যধারণের পাশাপাশি লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া জরুরি। বিপদ আসতে পারে, সেইসাথে ব্যর্থতাও। এমন মনে হতে পারে যে, এবারই মনে হয় শেষ। তখনও প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। বাজপাখি যখন ঝড়ের সম্মুখীন হয়, তখন সে চেষ্টা করে বাতাসকে কাজে লাগিয়ে মেঘের উপরে উঠে যেতে এবং এভাবে সে ঝড় থেকে নিজেকে রক্ষা করে। এটি ‘বাজপাখির দর্শন’ নামে পরিচিত। অর্থাৎ, বিপদের সম্মুখীন হলে, বহির্জগতের চাপের ফলে নিজেকে অবনমিত না করে বরং আরো উপরে ওঠার চেষ্টা করা উচিত। প্রতিনিয়ত চেষ্টা করা উচিত। যা কিছু প্রতিবন্ধকতার শুরু করে, তা কাটিয়ে ওঠার জন্য ছোট ছোট পরিবর্তন করা উচিত।

যা করা যাবে না

কল্পনাশক্তিকে কাজে লাগানোর জন্য করণীয়’র পাশাপাশি কিছু অ-করণীয় কাজও রয়েছে।

প্রথমত, লোকের কথায় কান দেওয়া যাবে না। মানুষ আপনাকে সবসময় তার নিজের অভিজ্ঞতা অনুসারে যৌক্তিক কথাগুলো বলবে। আবার অনেকে চাইবে না, আপনি কাজটি করুন বা সফল হন। তাই এসব কথায় কান দেওয়া যাবে না।

 দ্বিতীয়ত, পরিবর্তনকে তাড়িয়ে দেবেন না। পরিস্থিতির সাথে মোকাবিলা করতে হলে খাপ খেয়ে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। তাই সময় বদলে গেলে অনেক কিছুই পরিবর্তন করার প্রয়োজন।

তৃতীয়ত, হার মানা যাবে না। গতানুগতিকতার বাইরে কিছু করতে হলে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে পারেন। তাই বারবার ব্যর্থ হতে পারেন, বারবার পিছিয়ে যেতে পারেন। একে একে বিশ্লেষণ করুন নিজের পদক্ষেপগুলো। খুঁটিয়ে দেখুন, আপনার প্রচেষ্টার কোথাও ত্রুটি ছিল কি না। তারপর আবার চেষ্টা করুন নতুনভাবে। বলিউডের জনপ্রিয় সিনেমা ‘ওম শান্তি ওম’-এর মতো, যদি ক্লাইম্যাক্স সুখকর না হয়, তবে মনে রাখবেন, সিনেমা এখনো শেষ হয়নি।

কথায় আছে, স্বপ্ন কখনো উৎসর্গ করতে নেই, তবে স্বপ্নের জন্য যেকোনো কিছু ত্যাগ করা উচিত। তাই নিজের উপর বিশ্বাস রেখে, হার না মানা পরিশ্রমের মাধ্যমে কল্পনাকে বাস্তবে রূপ দান করা সম্ভব। শেষ করা যায় ওয়াল্ট ডিজনির কথায়, "হাসি হলো নিরন্তর, কল্পনার কোনো বয়স নেই এবং স্বপ্নগুলো চিরন্তন"।

মোঃ ইমরান খান বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত।

mohd.imranasifkhan@gmail.com

 

 

 

 

 

Share if you like

Filter By Topic