লকডাউন, শাটডাউন, সীমিত পরিসরে লকডাউন, কোয়ারেন্টাইন - এসবের মাঝে অনেক তরুণই হারিয়েছেন চাকরি, সময় কেটেছে একা, পড়েছেন বিষণ্নতায়।
করোনার সময়ে তরুণদের এই দুঃখ-দুর্দশা, বিষণ্নতা, মানসিকভাবে ভেঙে পড়া থেকে লড়াই করে নিজেদের পুনরায় গড়ে তোলা, জীবনকে আরেকবার সু্যোগ দেয়ার গল্পগুলো নিয়েই এই লেখাটি।
এস এম সাদমান ইসলাম একজন আড্ডাপ্রিয় মানুষ। বন্ধুদের সাথে সময় কাটাতে তিনি পছন্দ করেন। করোনা পরিস্থিতিতে তার সারাদিন কেটেছে বাসায়।
করোনা যখন থেকে শুরু তখন থেকেই যাবতীয় সতর্কতা অনুসরণ করে বাসায় ছিলাম। তবে নিয়ম মেনে বাজার করতে বের হয়েছিলাম।
করোনায় আক্রান্ত হওয়ার প্রসঙ্গে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল এ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ১২ তম সেমিস্টারের এই শিক্ষার্থী বলেন, ২০২০ সালের অক্টোবরে আমার বাবা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হন। বাবা সুস্থ হওয়ার মাস খানেক পর আমিও আক্রান্ত হই। তখন আরও বেশি একা হয়ে যাই, তাই প্রায়ই বিষণ্ন থাকতাম।
সাদমানের মতই করোনার সময়টি অতিক্রম করেন তামজীদ হোসেন। তবে তিনি করোনায় আক্রান্ত হননি।তামজীদ জানান, আমি এবং আমার পরিবার যতবারই করোনা পরীক্ষা করিয়েছি ততবারই নেগেটিভ এসেছে। তাই এদিক থেকে কোনো সমস্যার সম্মুখীন হইনি। তাছাড়া আগের তুলনায় কাজের পরিমাণ কম ছিল বিধায় লকডাউনের সময়টা ছিল বেশ বিরক্তিকর।
তামজীদ হোসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্যুরিজম এবং হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করে বর্তমানে নিজের প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি টপ ভিউ প্রোডাকশনের সাথে যুক্ত আছেন।
মোঃ মিরাজ হোসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। মাস্টার্সে ভর্তি হবার কয়েক মাস পরই দেশব্যাপী লকডাউন শুরু হয়।
মিরাজ তার করোনাকালীন দিনগুলো সম্পর্কে বলেছেন,করোনার আগে আমার অনেক গুলো টিউশন ছিল। হঠাৎ করে দেশব্যাপী লকডাউন দেওয়ার ফলে কয়েকটি টিউশন চলে যায়। লকডাউনে টিউশন না থাকায় সারাদিন বাসায় ছিলাম। টিউশন চলে যাওয়ায় হাতখরচও বন্ধ হয়ে যায়। সব মিলিয়ে সময়টা ছিল অসহনীয়।
মিরাজের মতো কাজের অভাবে ভুগেছেন তামজীদও। তিনি বলেন, করোনাতে আমার কাজের পরিমাণ অনেকটাই কমে যায়; প্রজেক্টের কাজগুলোও বন্ধ ছিল। তবে আমি আগে থেকেই ফ্রিল্যান্স করতাম তাই অনলাইনে কিছু কাজ করে হাতখরচটা চলে যেত।
তবে মিরাজ মনে করেন, করোনার অন্যান্য ক্ষতির চেয়ে মানসিক ক্ষতিটাই প্রকট ছিল। তিনি বলেন, আর্থিক ক্ষতির তুলনায় শারীরিক ক্ষতিই করোনাতে বেশি হয়েছে। আর সারাদিন বাসায় থেকে দুশ্চিন্তা হতো, এক সময় মনোবল হারিয়ে ফেলতে শুরু করি আমরা।
উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের একাদশ শ্রেণীর ছাত্রী আফরোজা খাতুনের অবস্থাও কিছুটা এমনই ছিল। কলেজের ক্লাস ঠিকমতো শুরু হয়নি, ছিল না কোনো দিকনির্দেশনা।
উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হওয়ার কারণে এমনিতেই অনেকে অবহেলা করে। কলেজ কর্তৃপক্ষও এই শিক্ষাব্যবস্থাকে গুরুত্ব সহকারে দেখে না; আমাদেরকে সিলেবাসও দেয়া হয় নি। অনেক কষ্ট করে পড়াশোনা শুরু করে আবার বন্ধ হয়ে যাবার উপক্রম হলে আমি মানসিকভাবে ভেঙে পড়ি। দুশ্চিন্তা ও বিষণ্নতায় দিনগুলো কেটেছে।"
ঘুরে দাঁড়ানো
মিরাজ বলেন, "করোনায় যখন মনোবল হারিয়ে ফেলেছিলাম তখন বন্ধু এবং শুভাকাঙ্ক্ষীরা পাশে ছিলেন। বিভাগে অনলাইন ক্লাস শুরু হওয়ায় মাস্টার্স সম্পূর্ণ করতে পেরেছি। টিউশন আবার পেয়েছি, তাছাড়া যুক্ত হয়েছি শিক্ষাবিষয়ক একটি অনলাইন প্রজেক্টের সাথে। সব মিলিয়ে এখন ভালোই আছি।"
আফরোজার ভালো থাকার মূলমন্ত্র ছিল নিজেকে ব্যস্ত রাখা। তিনি বলেন, লকডাউনের সময় নিজেকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করেছি। আমি মনে করি, ব্যস্ততাই মানুষের বিষণ্নতা দূর করতে পারে। প্রতিনিয়ত খবরের কাগজ পড়তাম, বিশেষ করে ভালো খবর গুলো যেন নিজেকে ইতিবাচক রাখতে পারি। তাছাড়া নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী এসাইনমেন্ট করতে শুরু করেছি। পড়ালেখা আবার শুরু হওয়ায় এখন বেশ ভালো আছি।
তামজীদ হোসেন বলেন, টপ ভিউ প্রোডাকশনের কাজ আমি এরইমধ্যে পুনরায় শুরু করেছি। করোনাকালে নিজেকে আরও গুছিয়ে নিয়েছি, দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য কাজ করেছি, আত্মবিশ্বাস অর্জন করেছি।
করোনাজয়ীদের একজন সাদমান মনে করেন অপরকে সহায়তা করার মাধ্যমে অন্তরে প্রশান্তি আসে। তিনি বলেন, আমার পরিচিত অনেককেই পারিবারিক ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে সহায়তা করি। এই বিষয়টি আমাকে মানসিক প্রশান্তি দিয়েছে।
প্রায় দুই বছর অতিক্রান্ত হবার পর এভাবেই অনেকে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। বিভিন্ন কাজে নিজেদের ব্যস্ত রেখে, দক্ষতা অর্জন করে, মানুষকে সহায়তা করে, প্রার্থনা, ইত্যাদির মাধ্যমে তারা সব সময় উজ্জীবিত থেকেছেন। তারা অনুপ্রাণিত হয়েছেন, অপরকেও করেছেন অনুপ্রাণিত।
মোঃ ইমরান, বর্তমানে গণযোগাযোগ এবং সাংবাদিকতা বিভাগের মাস্টার্সে অধ্যয়নরত।