চলমান বিশ্বমারি করোনার প্রকোপে বাংলাদেশের চক্ষু সংযোজন কার্যক্রম প্রায় থমকে গেছে। একজন অন্ধব্যক্তির হারানো দৃষ্টিশক্তি পুরোপুরি ফিরিয়ে আনার জন্য প্রথমে মৃতব্যক্তির কর্নিয়া সংগ্রহ করা হয় এবং তারপর এই কর্নিয়া সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তার চোখে সংযোজন করা হয়। এ ধরণের চোখ যোগাড় করার জন্য কাউন্সিলিং এর উপর ভর করে চলতে হয় ঢাকার নীলক্ষেতের বাবুপুড়া রোডে অবস্থিত সন্ধানী আন্তর্জাতিক চক্ষু ব্যাংককে। সন্ধানীর পক্ষ থেকে মৃতব্যক্তির শোকসন্তপ্ত নিকটজন, উত্তারাধিকারী বা আত্মীয়-পরিজনদের কাছে আবেদন, অনুরোধ বা সকাতর নিবেদন রাখা হয়। মূলত এই কাজটিই কাউন্সিলিং। তাদেরকে মৃতব্যক্তির চোখ জোড়া দান করার অনুরোধ জানানো হয়। এই আবেদনে সাড়া দিলেই কেবল সন্ধানী চোখ সংগ্রহ করতে পারে। কিন্তু করোনার কারণে এ কাউন্সিলিং এর কাজ এখন প্রায় বন্ধ।
একজন মৃতব্যক্তির চোখ দু’টি অন্ধব্যক্তির দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিতে পারে। এছাড়া, একজন প্রাপ্তবয়স্কের কর্নিয়া অন্ধ শিশুর চোখে বা দুই বছর ঊর্ধ্বের শিশুর কর্নিয়া প্রাপ্তবয়স্কের চোখে সংযোজন করা যায়। শুধু তাই নয়, একটি নিরোগ কর্নিয়া সবধরণের মানুষের চোখেই লাগানো যায়। এ জন্য গ্রুপ নির্ণয় বা ম্যাচিং করারও কোন প্রয়োজন পড়ে না। অন্যদিকে কর্নিয়া সংযোজন বা লাগানোর পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি মারা গেলে তার সংযোজিত কর্নিয়া সংগ্রহ করে পুনরায় ব্যবহার করা সম্ভব।
একমাত্র ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে, করোনাপূর্ব পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে ৩৩ জন মারা যান। তারপরও প্রতিবছর গড়ে মাত্র একশ থেকে দেড়শ চোখ সংগ্রহ ও সংযোজন করতে পারে সন্ধানী। এখানে উল্লেখ্য, গোটা বাংলাদেশের দৈনিক প্রায় ৫০টি চক্ষু সংযোজনের সক্ষমতা আছে। মৃতব্যক্তির চোখ না পাওয়ায় সে সক্ষমতা পূরণ তো দূরের কথা, অতি সামান্য অংশও কাজে লাগানো সম্ভবপর হয়নি। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত ৩,৪৫৯ চোখ সংযোজন করেছে সন্ধানী। চোখ সংযোজনের অতিরিক্ত কয়েক হাজার আবেদন পড়ে আছে তাদের কাছে। প্রতিদিনই বাড়ছে এ আবেদন। চোখ সংযোজনের উপযোগী সন্ধানীর সুশিক্ষিত জনবল এবং চিকিৎসাব্যবস্থা থাকলেও তা পুরোপুরি কাজে লাগানো যায় না। এখানে অভাব শুধু চোখের।
স্বাধীনতার ৫০ বছর পরেও বাংলাদেশে মৃতব্যক্তির চোখ দানের বিষয়টি এখনও তেমন জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি। চোখ দান নিয়ে রয়েছে বিভিন্ন কুসংস্কার। মৃতব্যক্তির যে চোখ সময়মতো দান করা হলে অন্য আরেক ব্যক্তির জন্য নতুন পৃথিবী খুলে যেত, তাই কিনা মাটিতে পচে বা আগুনে পুড়ে নষ্ট হচ্ছে। এর চেয়ে মর্মান্তিক আর কি আছে! আজ এ খাতে ব্যাপক প্রচারের পাশাপাশি স্কুলের পাঠ্যপুস্তকেও এ বিষয়টি সংযোজন করা উচিত। তাহলে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যেই কর্নিয়া সংযোজনে বাংলাদেশে মহাবিপ্লব ঘটতে পারে।
এদিকে, বর্তমান সময়ে চোখ দান ও সংযোজনের পথে বাধার এক মহাসাগর হয়ে দাঁড়িয়েছে করোনা মহামারী। সন্ধানী চক্ষু হাসপাতালের চিফ কন্সালটেন্ট ডা. মালিক ইফতোখার সিদ্দীক (পিন্টু) জানান, করোনা রোগীর চোখ ব্যবহার করা যাবে কিনা সে সম্পর্কে এখনও কোনো দিকনির্দেশনা নেই সন্ধানীর। এছাড়া, করোনা রোগীর আইসোলেশন এবং হাসপাতালে কড়াকড়ি থাকায় কাউন্সিলিং এর কাজও প্রায় অচল হয়ে পড়েছে।

ডা. মালিক ইফতোখার সিদ্দীক (পিন্টু)
পাশাপাশি, কর্নিয়া চিকিৎসায় জড়িত চিকিৎসকদের অনেকেই করোনার মধ্যে প্র্যাকটিস চালু রাখেননি। ফলে চোখের চাহিদাও আগের তুলনায় কমেছে।
সব মিলিয়ে গত এক বছরে ২৫ থেকে ৩০টা চোখ সংযোজন করতে পেরেছে সন্ধানী।
বাংলাদেশে ১৯৮৪ থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত কর্নিয়া সংগ্রহ করা হয়েছ ৪,১০৪ টি, আর এর মধ্যে ব্যবহার হয়েছে ৩,৪৫৯ টি। সংগৃহীত বাকী কর্নিয়াগুলো নানা কারণে ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি। এসময়ে চোখের জন্য যে আবেদন পড়েছিল তার মধ্যে আড়াই হাজারের বেশি রোগীর দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দেওয়া যায়নি। কেবল কর্নিয়া লাগিয়ে দেওয়া সম্ভব হলেই তাদের অন্ধকার পৃথিবী আলোয় ঝলমল করে উঠতো। তারা দেখতে পেতেন। কিন্তু প্রয়োজনীয় কর্নিয়া না পাওয়াই এমন দুঃখজনক ঘটনা ঘটেছে। আর এ ধরণের ঘটনা ঘটেই চলেছে।
ডা. মালিক ইফতোখার জানান, ২০১৩ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশে কর্নিয়া-সমস্যায় সৃষ্ট অন্ধ রোগীর সংখ্যা ৫ থেকে ৬ লাখ। এছাড়া, কর্নিয়ার কারণে দেশে প্রতিবছর প্রায় ৪০ হাজার মানুষ নতুন করে চোখের আলো হারিয়ে অন্ধ হচ্ছেন।
শিল্প-কারখানার দুর্ঘটনাই বাংলাদেশে কর্নিয়াজনিত অন্ধত্বের প্রধান কারণ। এ কথা জানালেন দেশের অন্যতম খ্যাতিমান চক্ষু চিকিৎসক, বারডেমের চক্ষু বিভাগের সাবেক প্রধান অধ্যাপক হজরত আলী। এছাড়া, ধান বা পাট ক্ষেতে কাজ করতে গিয়ে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেন অনেকেই। এসব ক্ষেত্রে কাজের সময় সস্তা সাদা কাঁচের চশমা ব্যবহার করা হলে অনায়াসেই অন্ধত্ব নামের ভয়াবহ দানবের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব।
অন্যদিকে, জনবহুল এ দেশটিতে কর্নিয়া প্রদানের ক্ষেত্রে সচেতনতা তৈরি করা গেলে এ সব রোগীর দৃষ্টি শক্তি পুনরায় উদ্ধার করা তেমন কোন সমস্যা ছিল না বলে জানান ডা. মালিক ইফতোখার।
কর্নিয়া সংযোজনের প্রক্রিয়া প্রসঙ্গে সন্ধানী আই ব্যাংকের সমন্বয়কারী, দেশে-বিদেশে উচ্চ-প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সাইফুল ইসলাম চৌধুরি বলেন, কোন ব্যক্তি মারা যাওয়ার ৮ ঘণ্টার মধ্যে চোখ সংগ্রহ করা প্রয়োজন। তা না হলে সেই কর্নিয়া আর সংযোজনের উপযুক্ত থাকে না। এক্ষেত্রে উল্লেখ্য, এইডসসহ নানা সংক্রামক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির চোখ সংগ্রহ করা হয় না। এছাড়া চোখ সংগ্রহ করা হলে মৃতব্যক্তির চেহারার কোনপ্রকার ক্ষতি হয় না। চোখ সংগ্রহের সময় মৃতদেহের সম্মান পুরোপুরি রক্ষা করা হয়।

সাইফুল ইসলাম চৌধুরি
এখন কেবল আশা, এই করোনা বিশ্বমারি শীঘ্রই থেমে যাবে। বাংলাদেশের মানুষ মরণোত্তর চক্ষুদানে এগিয়ে আসবে। কর্নিয়ার অভাব ঘুচবে। আর শত শত দৃষ্টিহীন আবার দেখতে পাবে। তাদের সামনে খুলে যাবে এক নতুন দিন। বস্তুত, চোখ দান মানে এক অর্থে জীবন দান। আর মৃতব্যক্তির চোখ দান করা হলে পরপারের অনন্ত জীবনে সেই ব্যক্তি লাভ করতে পারেন অশেষ কল্যাণ।
