কফি দিয়ে তৈরি পানীয় ও খাবার স্বাস্থ্যগুণের অধিকারী হলেও গ্রহণ করতে হবে পরিমাণ মতো।
এর পেছনে কারণ হিসেবে চীন ও ব্রাজিলের গবেষকদের মত হচ্ছে, শরীরের ভিটামিন ডি শোষণ করার ক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে কফিতে থাকা ক্যাফেইন।
ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল ফর ভিটামিন অ্যান্ড নিউট্রিশন রিসার্চয়ে প্রকাশিত হয় এই ক্রস সেকশনাল গবেষণা। ২০০৫ থেকে ২০০৬ সালে হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল হেল্থ অ্যান্ড নিউট্রিশন এক্সামিনেইশন সার্ভে অন ভিটামিন ডি লেভেলস এবং ৩০ থেকে ৪৭ বছর বয়সি ১৩,১৩৪ জন অংশগ্রহণকারীর দৈনিক ক্যাফেইন গ্রহণের মাত্রা নিয়ে করা জরিপ থেকে তথ্য নিয়ে এই গবেষণা করা হয়।
গবেষণায় জানা যায়, অতিমাত্রায় ক্যাফেইন গ্রহণের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভিটামিন ডি শোষণ করার ক্ষমতার নিম্নগতি। খবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের।
তবে এই তথ্যের ভিত্তিতে কফি পান বাদ দেওয়ার আগে মনে রাখতে হবে, গবেষকরা আরও বলেছেন, কফি আসলেও ভিটামিন ডির ঘাটতি তৈরি করে কি-না তা নিশ্চিত হতে এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত গবেষণা প্রয়োজন।
পাশাপাশি দৈনিক কতটুকু কফিকে গবেষকরা স্বাস্থ্যকর বা অস্বাস্থ্যকর মনে করছেন সেটা এখনও পরিষ্কার নয়। আর শরীরের ওপর কফির প্রভাব মানুষভেদে ভিন্ন।
নিউ ইয়র্ক ভিত্তিক ইন্টিগ্রেটিভ মেডিসিন চিকিৎসক এরিকা সুয়ার্জ ওয়েলঅ্যান্ডগুড ডটকময়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলেন, প্রতিদিন ৪০০ মি.লি. গ্রাম ক্যাফেইন বা চার থেকে পাঁচ কাপ কফি প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য নিরাপদ মাত্রা ধরা যায়। তবে সবার ক্যাফেইন সহ্য করার ক্ষমতা যে এক নয় সেকথা মনে রাখা জরুরি।
কফি গ্রহণের মাত্রা নিয়ন্ত্রেণের পাশাপাশি দৈনিক কতটুকু ভিটামিন ডি গ্রহণ করছেন সেদিকেও নজর দেওয়া জরুরি। এই ভিটামিনের অভাবজনিত উপসর্গগুলোর জানা এবং সেগুলো সম্পর্কে সচেতন থাকায় সচেষ্ট হতে হবে।
সূর্য থেকে ভিটামিন ডির চাহিদা মেটানো কি সম্ভব?
এক থেকে ৭০ বয়সি সবার জন্য ভিটামিন ডির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের রেকমেন্ডেড ডায়েটারি অ্যালাওয়েন্স (আরডিএ) হল ৬০০ আইইউ।
গর্ভবতী, স্তন্যদানকারী মায়েদের জন্য একই পরামর্শ প্রয়োজ্য।
যুক্তরাষ্ট্রের আইহার্বয়ের প্রধান বৈজ্ঞানিক পরামর্শদাতা মাইকেল টি. মারি বলেন, দুপুর বেলা ২০ থেকে ৩০ মিনিট রোদে থাকলে ত্বকে ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার আইইউ ভিটামিন ডি তৈরি হওয়া সম্ভব। যাদের ত্বকের রং হালকা বা শেতাঙ্গ তাদের ত্বকের মাত্র ১০ মিনিটেই ১০ হাজার আইইউ ভিটামিন ডি তৈরি হয়ে যায়। তবে কৃষ্ণাঙ্গদের ক্ষেত্রে একই পরিমাণ ভিটামিন ডি তৈরি হতে অনেক বেশি সময় লাগবে।
পারফর্মেন্স কিচেনয়ের পরামর্শদাতা ও পুষ্টিবিদ সামান্থা ক্যাসেটি বলেন, সূর্যের আলো থেকে ত্বকে ভিটামিন ডি তৈরি হওয়ার ক্ষেত্রে শুধু গায়ের রং একমাত্র বাধা নয়। যদি গায়ে সানস্ক্রিন ব্যবহার করেন কিংবা আকাশ মেঘলা হয় তবে ভিটামিন ডি তৈরির প্রক্রিয়া গতি হারাবে। আর লম্বা সময় সরাসরি রোদে থাকার কারণে ত্বকের যে ক্ষতি হয় তা ভিটামিন ডির উপকারিতাকে হার মানায়। তাই ভোজ্য উৎস থেকে ভিটামিন সংগ্রহের চেষ্টা করাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ খাবার
প্রাকৃতিকভাবে খুব বেশি খাবারে এই ভিটামিন মেলে না।
যুক্তরাষ্ট্রের নেচার মেড ওয়েলনেসয়ের অ্যাম্বাসেডর ও পুষ্টিবিদ ভ্যালেরি এইজিম্যান বলেন, মাশরুম, চর্বিযুক্ত মাছ, মাছের যকৃতের তেল, ডিম ইত্যাদিতে সবচাইতে বেশি মাত্রায় ভিটামিন ডি পাওয়া যায়। আর দুধ, কমলার রস, সিরিয়াল ইত্যাদিতে থাকে ফোর্টিফায়েড ভিটামিন ডি।
ক্যাসেটি বলেন, খরচ আর ভিটামিন ডির পরিমাণ হিসেবে সবচাইতে শীর্ষে থাকবে সম্ভবত স্যামন মাছ। তিন আউন্স রান্না করা বা ফার্মেন্টেড স্যামন মাছ দিতে পারে ৪৫০ আইইউ ভিটামিন ডি। সঙ্গে আরও আছে ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড এবং প্রোটিন।
আরও কয়েকটি উৎস তুলে ধরেন এই বিশেষজ্ঞ।
দুইটি ডিম থেকে মেলে ৮২ আইইউ ভিটামিন ডি যার পুরোটাই আছে কুসুমে। এক কৌটা সার্ডিনস মাছ যোগায় ১৭৮ আইইউ। সঙ্গে আছে ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড। এক কাপ দুধ যোগায় ১১৭ আইইউ। দুধের বিকল্প যারা গ্রহণ করেন তাদের উচিত প্যাকেটের গায়ে দেখে নিতে হবে তাতে ভিটামিন ডি ও ক্যালসিয়াম ফোর্টিফায়েড আছে কী নেই।
আধা কাপ কাঁচা মাশরুমে থাকে ৩৬৬ আইইউ ভিটামিন ডি। কিছু সিরিয়ালয়ে ফোর্টিফায়েড থাকে ভিটামিন ডি যা দৈনিক চাহিদার ১৫ শতাংশ যোগান দিতে পারে।
মুরে বলেন, ভোজ্য উৎস থেকে ভিটামিন ডির সম্পূর্ণ চাহিদা মেটানো অনেকক্ষেত্রেই সম্ভব হয় না। এজন্য পুষ্টিবিদরা পরামর্শ দেন সাপ্লিমেন্টয়ের, দৈনিক দুই হাজার থেকে পাঁচ হাজার আইইউয়ের মধ্যে। তবে পরীক্ষা ছাড়া সাপ্লিমেন্ট নেওয়া উচিত নয়।
ভিটামিন ডির অভাব বোঝার উপায়
এইজিম্যান বলেন, দিনে ছয় কাপ কফি পান করা একজন ব্যক্তির ক্ষেত্রে পেশি দুর্বল হওয়া, চুল পড়া, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া, অবসাদ, হাড়ক্ষয় ইত্যাদি ভিটামিন ডির অভাবজনিত উপসর্গ দেখা দেওয়া খুবই স্বাভাবিক।
ক্যাসেটি বলেন, ভিটামিন ডির কাজ হল ক্যালসিয়াম শোষণে সাহায্য করা। ফলে ভিটামিন ডির অভাবে ক্যালসিয়ামের অভাব দেখা দেয়। আর তা থেকে দেখা দিতে পারে দুর্বল হাড়, অস্টিওপোরোসিস।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও দুর্বল হয় এই ভিটামিনের অভাবে। টাইপ টু ডায়াবেটিসয়ের সঙ্গে ভিটামিন ডির ঘাটতির সম্পর্ক আছে।
এখন কথা হল ভিটামিন ডির চাহিদা মেটাতে কফি পানের মাত্রায় পরিবর্তন প্রয়োজন কি-না।
এইজিম্যান বলছেন, যে উৎস থেকেই হোক, দৈনিক ক্যাফেইনয়ের মাত্রা ৪০০ মি.লি. গ্রামের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত, যা প্রায় চার থেকে পাঁচ কাপ কফি।
গর্ভবতী কিংবা স্তন্যদানকারী মা, বৃদ্ধ ও উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের আরও কমাতে হবে। অন্যথায় দেখা দিতে পারে মানসিক অস্থিরতা, হার্ট প্যালপিটিশন, মাথাব্যথা ইত্যাদি।
শিশু, কিশোরদের কফি কম পান করাই ভালো, যাতে ঘুম ও রক্তচাপে সমস্যা দেখা না দেয়।