করোনা ভাইরাসের ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের প্রকোপ কমতে না কমতেই নতুন ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রন সারাবিশ্বে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। বিজ্ঞানীরা প্রতিদিনই ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট সম্পর্কে নতুন নতুন তথ্য জানছেন আর জানাচ্ছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী, ইতোমধ্যে ৮৯ টি দেশে করোনার এ নতুন ভ্যারিয়েন্ট শনাক্ত করা হয়েছে।
ওমিক্রন সর্বপ্রথম দক্ষিণ আফ্রিকায় ২০২১ সালের নভেম্বর মাসে শনাক্ত করা হয়। ভ্যারিয়েন্টটির লিনিয়েজ নাম্বার বি.১.১.৫২৯ এবং এটি ইতোমধ্যে ৫০ বারের বেশি মিউটেশন ঘটিয়েছে। ওমিক্রন নিয়ে বিজ্ঞানীদের চিন্তার প্রধান কারণ হলো এটি খুব দ্রুত এবং সহজে ছড়াতে পারে। এছাড়াও এটি মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভেদ করতে সক্ষম বলেও প্রাথমিক গবেষণায় জানা গেছে।
দক্ষিণ আফ্রিকা, যুক্তরাজ্য এবং ডেনমার্কের মতো দেশে ইতোমধ্যে ওমিক্রন শনাক্তের সংখ্যা দ্বিগুণ হারে বাড়ছে। যুক্তরাজ্যে মোট করোনা আক্রান্তের শতকরা ৬০ শতাংশের উপর এখন ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট দ্বারা সংক্রমিত।
ওমিক্রন কি ডেল্টা থেকে বেশি সংক্রামক?
প্রাথমিক গবেষণা থেকে জানা গেছে যে, ওমিক্রন আগের যেকোনো ভ্যারিয়েন্ট থেকে অধিক সংক্রামক এবং দ্রুত ছড়াতে পারে। দক্ষিণ আফ্রিকায় আগের যে কোনো ভ্যারিয়েন্ট থেকে এটি দ্রুত ছড়িয়েছে বলে জানিয়েছেন বিশ্লেষকরা।
সম্প্রতি হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় উঠে এসেছে ওমিক্রন মানবদেহের শ্বাসনালিতে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের তুলনায় ৭০ গুণ দ্রুত ছড়াতে পারে। কিন্তু কেন বা কীভাবে এটি ডেল্টার তুলনায় এত দ্রুত ছড়ায় তা এখনো অজানা।
স্বস্তির বিষয় এই যে শ্বাসনালিতে অধিক সংক্রমণের কারণে এটি ফুসফুসকে কম সংক্রমিত করতে পারে। তাই আক্রান্তদের বেশিরভাগের মাঝেই মারাত্মক কোনো উপসর্গ দেখা যায়নি।
ওমিক্রন ডেল্টার তুলনায় কতটা ভয়ংকর?
প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে যে, ওমিক্রনে আক্রান্ত বেশিরভাগ ব্যক্তির মাঝে মারাত্মক কোনো উপসর্গ দেখা যাবে না। তবে এ ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার জন্য বিজ্ঞানীদের আরও তথ্য-উপাত্তের প্রয়োজন রয়েছে।
ফুসফুসকে কম সংক্রমিত করার যে তথ্যটি হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা থেকে উঠে এসেছে, সে তথ্যের উপর ভিত্তি করে ধারণা করা হচ্ছে এটি মানবদেহে মারাত্মক কোনো উপসর্গের সৃষ্টি করবে না।
এছাড়াও দক্ষিণ আফ্রিকাতে ওমিক্রনে আক্রান্তদের তথ্য থেকে দেখা গেছে যে, মৃত্যুর অনুপাত তুলনামূলকভাবে বেশ কম এবং আক্রান্তদের বেশিরভাগই হাসপাতালে ভর্তি না হয়েই সুস্থ হয়েছেন।
ওমিক্রন তেমন গুরুতর অসুস্থতা সৃষ্টি না করলেও, এর দ্রুত সংক্রমণ হার যথেষ্ট উদ্বেগের বিষয়। যেহেতু ওমিক্রনে আক্রান্ত একজন ব্যক্তি অনেক বেশি মানুষের মাঝে ভাইরাসটি ছড়িয়ে দিতে সক্ষম, তাই যেকোনো অঞ্চলে এটি ছড়িয়ে পড়লে সে অঞ্চলের বেশিরভাগ মানুষের সংক্রমিত হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। স
যুক্তরাজ্যের পেনসিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রোগ-প্রতিরোধবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. জন হেরি আমেরিকা ভিত্তিক অনলাইন টিভি চ্যানেল ফক্স-২৯ কে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “এই ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্ত ব্যক্তি খুব দ্রুতই অন্য ব্যক্তিকে সংক্রমিত করে। যদিও প্রাথমিকভাবে মনে হতে পারে যে, এতে তেমন কোনো ক্ষতি হবে না কারণ এতে সংক্রমিত ব্যক্তিদের মাঝে মৃদু উপসর্গ দেখা যাচ্ছে।”
“কিন্তু যখন এ ভ্যারিয়েন্টের সংক্রমণ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে তখন কম রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের মধ্যে মারাত্মক উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এর ফলে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা তো বাড়বেই, মৃত্যুহারও বেড়ে যাবে।”
ওমিক্রন কি ভ্যাক্সিনের সুরক্ষা ভেদ করতে পারে?
ওমিক্রন ইতোমধ্যে ৫০ বারের বেশি মিউটেশন ঘটিয়েছে এবং এতে ৩২ টি স্পাইক প্রোটিন আছে, যে কারণে এটি সহজেই মানবদেহকে সংক্রমিত করতে পারে।
ফাইজার জানিয়েছে তাদের ভ্যাক্সিন মানুষকে গুরুতর অসুস্থতা থেকে সুরক্ষা দিতে সক্ষম, কিন্তু অনেকের কিছু মৃদু উপসর্গ দেখা দিতে পারে। ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট পরিক্ষা করে তারা দেখেছেন যে তাদের ভ্যাক্সিনের সুরক্ষা ওমিক্রনের সামনে ৩০ শতাংশ কমে আসে। কিন্তু ভ্যাক্সিন দেওয়ার কারণে মানবদেহের মেমোরি বি এবং টি কোষ শক্তিশালী হয়ে উঠে, যার কারণে ওমিক্রনে আক্রান্ত ব্যক্তিদের দেহে শক্তিশালী প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে উঠে।
তবে বয়স এবং স্বাস্থ্যগত দিক বিবেচনায় এক্ষেত্রে কিছু ভিন্নতা দেখা দিতে পারে। যেমন ডায়াবেটিস বা অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি রোগে যারা ভুগছেন তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা আগে থেকেই কম। তাই ভ্যাক্সিন দেওয়ার পর ওমিক্রনে আক্রান্ত হলেও তাদের মধ্যে মারাত্মক উপসর্গ দেখা যেতে পারে।
তবে ফাইজার এবং মডার্নার পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে তাদের বুস্টার ডোজ ওমিক্রনের বিরুদ্ধে বেশ কার্যকরী ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে। ফাইজারের বুস্টার ডোজ এন্টিবডি লেভেলকে ২৫ গুণ এবং মডার্নার বুস্টার ডোজ এন্টিবডি লেভেলকে ৩৭ গুণ বাড়িয়ে দিতে সক্ষম।
jafinhasan03@gmail.com
