এক উদ্যোক্তার চোখে পুতুলশিল্প


সুস্মিতা রায় | Published: May 06, 2022 16:55:50 | Updated: May 06, 2022 22:52:08


ফারহানা শারমিন শুচি

পুতুলের কথা তুললেই মনের মাঝে উঁকি দেয় শৈশব স্মৃতি। কাঠির সাথে টুকরো টুকরো কাপড়ে তুলা গুঁজে দিয়ে পুতুলের কাঠামো, একটু সুতোয় চুল, কলমের টানে চোখনাক-মুখ। ব্যস, হয়ে গেলো পুতুল। এবার হবে পুতুলের বিয়ে। মানেটা হলো বন্ধুদের সাথে পুতুলের বিনিময়।

সইদের সাথে পুতুলের রান্নাবাটি, এভাবেই কেটেছে শৈশবের কত দিন। পুতুল নিয়ে কথা বলতে গিয়ে এমনই স্মৃতিচারণ করছিলেন কারুশিল্পী, উদ্যোক্তা ও গবেষক ফারহানা শারমিন শুচি।কাজ করেন কাপড়ের পুতুল ও বাঁশ-বেত সহ নানা কারুশিল্পের উদ্ভাবনী সব কৌশল নিয়ে ।

কারুশিল্পী, উদ্যোক্তা ও গবেষক ফারহানা শারমিন শুচি



তার ভাষ্যে, পুতুল এককথায় আমার কাছে আমার শৈশব।তার পুতুলের সাথে বোঝাপড়া শুরু ছোটবেলাতেই।প্রথমে মা-খালারা বানিয়ে দিতেন, তারপরে নিজেই। পুতুলের গায়ে জামা চড়াতে যেই না চোখে কোনো ওড়না বা কাপড়ের পাড় ভালো লাগতো, চালিয়ে দিতেন কাঁচিশ, বিনিময়ে জুটতো মায়ের বকুনি। এভাবেই তার পুতুল কাব্যের শুরু আর পাঁচটা সাধারণ মেয়ের মতোই। কিন্তু তিনি এই ভালোবাসাটাকে আঁকড়ে ধরে রেখেছেন যত্নে। তুলে আনলেন পেশাদারি পর্যায়ে।

কর্মজীবনের শুরুতে বিভিন্ন গণমাধ্যমে কাজ করেছেন। হঠাৎই নিজেকে ছাড়িয়ে নিলেন গণমাধ্যম থেকে। কী করবেন যখন ভাবছিলেন, তখন পাশে দাঁড়িয়েছিল জীবনসঙ্গী। একটি শৈল্পিক পরিবারে শুচির বেড়ে ওঠা, তাই শিল্পের প্রতি ভালোবাসাটা তার আবার জাগরুক হয়ে উঠল।দেশের যে অঞ্চলে গিয়েছেন, ধারণা নিয়েছেন সেখানের অধিবাসীদের জীবন, শিল্প-সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নিয়ে।

স্বামীর উৎসাহে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনে (বিসিক) তিনটি বিষয় নিয়ে প্রশিক্ষণ নিলেন - কাপড়ের পুতুল শিল্প , বাঁশ-বেতের শিল্প আর উড ইনলে । এরপরই ২০১৭ সালে উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ। জন্ম হল প্রতিষ্ঠান কারুনিকের, যেটি কর্মীদের কারুশিল্পে প্রশিক্ষিত করে স্বাবলম্বী করে এবং সাথে গবেষণা করে কারুশিল্পের অগ্রযাত্রা চলমান রাখতে।

ফারহানা শারমিন শুচি বলেন, "আমাদের দেশে মেয়েদের নিজের পরিচয় গড়তে খুব সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। এর পেছনে মূল কারণ তার নিজের আয় নেই।"

বাংলার কুটিরশিল্পের মূল ধারক ও বাহক নারী, শুচি খুঁজে খুঁজে তুলে আনেন, তাদের নিপুণ হাতের কাজ। তাই নারীর ক্ষমতায়নে শুচি রাখছেন বিস্তর ভূমিকা। তিনি নারীদের স্বাবলম্বী করে লিঙ্গ সমতা আনয়নের স্বীকৃতি স্বরূপ চলতি বছরেই মহাত্মা গান্ধী ইন্টারন্যাশনাল ভার্চুয়াল ইউনিভার্সিটি হতে অর্জন করেছেন 'ইন্টারন্যাশনাল পিস হিউম্যানিটেরিয়ান আওয়ার্ড'।ঘটনাটি শারমিন শুচিকে দিয়েছে অভূতপূর্ব ভালোলাগা আর সামনে এগিয়ে যাবার অঢেল উৎসাহ।

শুচি জানালেন, তিনি ক্রেতা হিসেবে তাদেরকেই পান যারা এখনো দেশীয় সংস্কৃতিকে ভালোবাসে।বিপণিতে তার পুতুলগুলি তাদের স্মৃতিতে অনুরণন জাগায়। জাগায় ফেলে আসা সময়টাতে মুহূর্তমাত্র হলেও ডুব দেবার ইচ্ছা।নস্টালজিক হয়ে বিদেশ - বিভুঁই থেকে এক প্রবাসীউপেক্ষা করতে পারেননি এই আবেদন। কাজটি সহজ করে দিয়েছিল কারুনিকের ফেসবুক পাতা।


(কারুনিকের পুতুল -উপর থেকে চরকায় সুতা কাটা মহিলা, চাটাই বুননরত নারী। নিচে নৃত্যরত আদিবাসী, দই আর মাছ হাতে নতুন জামাই, ঘটক, বাউল)



কিন্তু দুঃখের বিষয়, এই ক্রেতা-সাধারণ বড়ই মুষ্টিমেয়। আজ ভিনদেশি সংস্কৃতিক আগ্রাসন ও প্লাস্টিক পণ্যের সম্প্রসারণে দেশীয় শিল্পের প্রতি ভালোবাসা কিংবা শিল্পবোধদুটোই লুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। এই টানাপোড়েনে বাজারে ফারহানা শুচির টিকে থাকার লড়াই। তিনি জানালেন, একটি পুতুল পুরোপুরি গড়ে আনতে তিনদিন সময় লাগে, সেই অনুযায়ী বাজারে দাম নেই। ফলশ্রুতিতে পোহাতে হয় কারিগরি সংকট, হারাতে হয় কর্মীদের।

পুতুলের পাশাপাশি শুচি গবেষণা চালান উদ্ভাবনী সব কাজে। তালপাতার চাটাই বুনে তা দিয়ে করেন মানিব্যাগ, টিস্যুবক্স, ছোট ব্যাগ, ম্যাগাজিন ফোল্ডার।মেলে ঘাস (যা দিয়ে হয় মাদুর) আর ভেন্নাপাতা দিয়ে নতুন কিছু কাজ পরিকল্পনায় রেখেছেন। এভাবেই হারিয়ে যাওয়া শিল্প টিকিয়ে রাখার চেষ্টা। কিন্তু এই কাজের প্রাকৃতিক কাঁচামাল গুলি সংগ্রহে পোহাতে হয় নানা ঝামেলা, কেননা বাজারে তা চাহিদার পাল্লাতে অপ্রতুল। তাই এসব টিকিয়ে রাখতে কারুশিল্পী শুচির পরামর্শ পরিবেশ বান্ধব ও দেশীয় পণ্য ব্যবহারে সকলের উৎসাহী হওয়া।



(কারুনিকের কারুপণ্য: ফোল্ডার, ছোটব্যাগ, মানিব্যাগ, টিসুবক্স)

যেকোনো কাজ শুচি বেশ যত্ন ও ভালোবাসা দিয়ে করেন। তার প্রত্যেকটি পুতুলের কাজ বেশ সূক্ষ্ম। দোকানে ৮ কিংবা ১২ ইঞ্চিরকাপড়ের পুতুল খুব সহজলভ্য , আর সেখানে শুচি ওসবের পাশাপাশি গড়ে যাচ্ছেন ৬ ইঞ্চি থেকে ৪ ইঞ্চির পুতুল। ছোট জিনিসের সূক্ষ্ম কাজ বেশ শ্রমসাধ্য।কিন্তু শুচির যেন আলসেমি নেই। বেশ যত্ন ভরে সেই পুতুলের কান বসান, আঙ্গুল জোরেন, আদর করে পরিয়ে দেন জুতো। অন্যেরা যেখানে তার পেঁচিয়ে গয়না করেন , সেখানে তিনি সত্যি গয়না পরান। গায়ে জড়িয়ে দেন ঝলমলো পোশাক। সবগুলি থিম মাথায় রেখে, কোথাও কোনো কার্পণ্য নেই। নিছকই শুধু বর-বউ নয়, শুচির পুতুলগুলি সব যেন কর্মমুখর। কেউ মাদুর বুনছে, কেউ নৃত্য করেছে তো কেউ গান, কেউ বা বাজাচ্ছে ঢোল, চরকায় কাটছে সুতা। ঘটক মশায় ছাতি বগলে ছুটছেন ঘটকালিতে, ওদিকে নতুন বর ঘরে ঢুকছে মাছ-মিষ্টি হাতে।

গাজীপুরে স্থিত বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনিস্টিটিউটের জন্যে ফারহানা শারমিন শুচি বানিয়েছেন ৬ খানি বিষয়ভিত্তিক ডায়ারোমা। তাতে দেখিয়েছেন কৃষিভিত্তিক বাংলার জীবনালেখ্য। কাজটি সম্পূর্ণ করতে ব্যয় হয়েছিল প্রায় একটি মাস। কী পরিমাণ আন্তরিক হয়ে তিনি কাজ করেন, তা যেন পুতুল গুলি দেখে সহজেই অনুমেয়।

শুচি তার কাজ গুলির মাধ্যমে পুরাতনকে নতুন প্রজন্মের কাছে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। শুচির সম্ভারে সহজেই চোখে পড়ে হারিয়ে যাওয়া পালকি, ঢেঁকি আর গরুর গাড়ি। বাবা-মায়ের হাত ধরে আসা আজকের শিশু প্রশ্ন করে, মা ঐগুলি কি, বেশ ভালো লাগে তার এটা ভেবে- নতুন আজ পুরানোকে জানছে তার কাজে।

অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েও, শুচি তার পেশাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন শুধু ভালোবেসে, হারানো শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার তাগিদে।

তিনি বলেন , "সংস্কৃতি রক্ষায় আমাদের নিজেদেরকেই সচেষ্ট হতে হবে, কেন আমরা উপহার হিসেবে একটি চাইনিজ পুতুলের জায়গায় দেশীয় পুতুল তুলে ধরছি না?"

প্রশ্নটির উত্তর সকলের ভাবা উচিত নয় কি ?

সুস্মিতা রায় বর্তমানে শহীদ তাজউদ্দীন আহমেদ মেডিকেল কলেজে ৩য় বর্ষে পড়াশোনা করছেন।

susmi9897@gmail.com




Share if you like