Loading...

একজন যাযাবর ফেরিওয়ালা

| Updated: September 30, 2021 18:11:22


ফেরিওয়ালা জহিরুল ফেরিওয়ালা জহিরুল

“এই লাগবে নাকি প্লাস্টিকের জগ, মগ, বাটি, বালতি, টিফিনবক্স, চিরুনি! আছে সিলভারের পাতিল, ঢাকনা। নিবেন নাকি কেউ!” চিকন গলায় লম্বা করে উচ্চস্বরে এভাবে ডাকছেন জহিরুল ইসলাম। ডাক শুনে অনেকেই জহিরুলের কাছে আসছেন। যা প্রয়োজন, নিয়ে চলে যাচ্ছেন। বিক্রি শেষে জহিরুলও সাইকেলের প্যাডেলে পা ফেলে পথ ধরেছেন সামনে।

গাজীপুরের কাপাসিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলে ফেরিওয়ালা জহিরুল ইসলামের সাথে দেখা। বেশ কিছুক্ষণ কথা হলো তাঁর সাথে। জানালেন, এভাবে গ্রামে গ্রামে তিনি ফেরি করে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য বিক্রি করে বেড়ান। কাপাসিয়ায় এসব বিক্রি করলেও জহিরুল ইসলামের বাড়ি এখানে নয়। বাড়ি রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার ইউসুফপুর গ্রামে। গত দুই মাস আগে তিনি বাড়ি থেকে বের হয়েছেন। ফেরি করতে করতে এখানে এসেছেন। কিছুদিন থাকবেন। পরে চলে যাবেন পাশের জেলায়। এই দুই মাসে তিনি প্রায় চারটি জেলা ঘুরে এখানে এসেছেন। বাড়ি ফিরবেন আরো এক মাস পর। এর মাঝে হয়তো আরো তিনটি জেলায় ঘুরে ফেরি করবেন জহিরুল।

প্রায় চার মাসের যাত্রায় জহিরুল একা নন। তাঁর এলাকার আরও সাতজন এসেছেন একসাথে। জহিরুল বলেন, “আমরা আটজন একসাথেই বের হয়েছি। এভাবে সবসময়ই বের হই। তিন-চার মাস পর বাড়ি ফিরি। ১০/১২ দিন পরে আবার বের হই। আমরা সারাদেশেই ঘুরে ঘুরে ফেরি করি।”

জহিরুলরা এই যাত্রায় বাহন হিসেবে ব্যবহার করেন প্যাডেলের সাইকেল। আগে অবশ্য পায়ে হেঁটে ফেরি করতেন। এখনো কেউ কেউ করেন, তবে অধিকাংশই সাইকেল ব্যবহার করেন। এতে কষ্ট কম হয়। জহিরুলের ভাষায়, “প্রায় ১২ বছর ধরে থেকে ফেরি করি। আগে পায়ে হেঁটে ঘুরতাম। তাতে কষ্ট বেশি হতো, তাই এখন সাইকেল ব্যবহার করি, ফলে কষ্ট কম হয়। এর একটা আলাদা সুবিধাও আছে। আগে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় বাসে যেতে হতো। এখন সাইকেলে করেই চলে যাওয়া যায়। এতে কিছুটা খরচও বেঁচে যায়।”

এই লম্বা সময়ের যাত্রায় জহিরুল কোথায় থাকেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আসলে আমাদের থাকার নির্দিষ্ট কোনো জায়গা নেই। অধিকাংশ সময় আমরা স্কুল বা কলেজের বারান্দায় থাকি। এছাড়া উপায়ও নাই। ভাড়া করে কোথাও থাকতে গেলে খরচ হয় অনেক। একেকদিন একেক জায়গায় থাকি। পরের দিন কোথায় থাকবো, তা আগের রাতেই ঠিক করে ফেলি।

এমন খোলা জায়গায় থাকতে কষ্ট হয় কি না জানতে চাইলে জহিরুল বলেন, “সত্যি বলতে আমরা কষ্ট করতেই বাড়ির বাইরে বের হই। কষ্ট করে করে অভ্যাস হয়ে গেছে। যদিও শুরুর দিকে মনে হতো, এইবার বাড়ি গেলে আর এই কাজে আসবো না। কিন্তু আবার বের হই। জীবন চালাতে জীবিকার বিকল্পও তো নাই!

আমরা বের হওয়ার সময় বাড়ি থেকে হাঁড়ি-পাতিল নিয়েই বের হই। সন্ধ্যার আগেই নির্ধারিত স্থানে জড়ো হয়ে পড়ি সকলে। এরপর কেউ বাজার করে। কেউ রান্না করে। একেকদিন একেকজনের রান্নার দায়িত্ব থাকে। এভাবে রান্না করে খেতে যদিও একটু কষ্ট হয়, তবে এতেও সয়ে গেছি। টাকা কামাতে হলে কষ্ট করতেই হবে।”

তবে উপভোগও করেন এই জীবন, “ফেরি করতে বের হলে প্রায় প্রতিবারই অন্তত ছয়-সাতটি জেলায় ঘোরা হয়। প্রতিবার, প্রতিদিনই নতুন নতুন গ্রামে যাওয়া হয়। নানারকমের মানুষের সঙ্গে কথাবার্তা হয়। প্রতিদিনই জীবনগল্পের ঝুড়িতে যোগ হয় নতুন নতুন অভিজ্ঞতা। বেশ উপভোগ করি।”

পরিবারের কথা মনে পড়ে কি না জানতে চাইলে জহিরুল বলেন, “অবশ্যই মনে পড়ে। আমার পাঁচ বছর বয়সের একটা ছেলে আর দেড় বছর বয়সের একটা মেয়ে আছে। তাদের কথা খুব মনে পড়ে। তাদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করেই দূরে থাকি। রোজগার করি। তবে যখন শুনি, পরিবারের কেউ অসুস্থ তখন খুব খারাপ লাগে। চাইলেই হুট করে যেতে পারি না। দূর থেকে দোয়া করি। সাথের কারো কারো অ্যান্ড্রয়েড ফোন আছে। মাঝে মাঝে ভিডিও কলে কথা বলি। মনটা কিছুটা শান্তি লাগে।”

বহু বছর ধরে ফেরি করলেও জহিরুলের ইচ্ছা ভবিষ্যতে নিজের এলাকায় ব্যবসা দেওয়ার। এর জন্য কিছু মূলধনও জমিয়েছেন তিনি। জহিরুলের ভাষায়, “প্রায় ১২ বছর ধরে ফেরিওয়ালার কাজ করি। অল্প অল্প করে কিছু টাকা জমানোর চেষ্টা করেছি। ইচ্ছা আছে, আর কিছু টাকা জমলে নিজের এলাকায় একটা ব্যবসা দেব। এতে স্ত্রী-সন্তানের পাশে থাকতে পারব।”

জহিরুলের মতোই বহু ফেরিওয়ালার যাযাবর জীবন খুঁজে ফেরে, একদিন ঘরে ফেরার গল্প। সেই স্বপ্ন ঝোলায় করে তারা হেঁটে বেড়ান আমাদের আশেপাশের অলিগলিতে।

ফরহাদুর রহমান কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী।

ইমেইলfarhadrahman702@gmail.com

Share if you like

Filter By Topic