চৈত্র-বৈশাখের পালা শেষ করে, জ্যৈষ্ঠ মাস চলে গেলো, আর আগমন হলো আষাঢ়-শ্রাবণ মাসের। ক্যালেন্ডারের পাতায় বর্ষা পেরিয়ে গেছে। সারাদেশে কোথাও গরম, কোথাও বৃষ্টি। অকস্মাৎ এই ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে মানুষের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে পড়ছে।
অতিমারীর জন্য বা মুহূর্মুহূ লকডাউনের কারণে বেশিরভাগ সময়ে সকলের ঘরে বসে থাকার কথা হলেও, জীবন বাঁচানোর তাগিদে কম বেশি সকলেরই ঘর থেকে বের হতে হয়। আর যারা ঘরে আছি, তাদেরও খুব একটা স্বস্তি নেই। ঘরে বসেই হাজারটা কাজ সারছি প্রযুক্তির কল্যাণে। মোটামুটি নাজেহাল সকলেই। এমতাবস্থায় নিজের শরীরের পাশাপাশি ত্বকের যত্নে সতর্ক হওয়া উচিত।
আজকের আলোচনায় অবশ্য আমরা শুধু গ্রীষ্ম-বর্ষা নয়, ঋতুভেদে ত্বকের যত্ন কীভাবে নিতে হয়, তা জেনে নেব। সেইসাথে বলে নেয়া ভালো, যেহেতু একেকজনের ত্বকের ধরন একেক রকম হয়, সেক্ষেত্রে সামগ্রিকভাবে কিছু জিনিস উপস্থাপন করার চেষ্টা করা হবে এ লেখায়।
গরমে ত্বকের যত্ন
গরমে অতিরিক্ত রোদ ও ধুলোবালিতে ত্বক আর্দ্রতা হারায়। ধুলোবালির আস্তরণ জমে জমে মুখে ব্রন হয়। রোদে কোনো সুরক্ষা ছাড়া বেরোলে সানট্যানে ত্বক রুক্ষ হয়। এছাড়া, ঘামাচি থেকে শুরু করে লালচে ফুসকুড়ির মতোও হতে দেখা যায়।
স্বাস্থ্য ও ত্বকের যত্ন সম্পর্কিত একটি ওয়েবসাইট- আ্যালিউর ডট কমে বলা হয়েছে, সবসময়ের মতো ক্লিনজার বা ফেসওয়াশ দিনে দু’বার ব্যবহার করতে হবে, এর অতিরিক্ত না করাই শ্রেয়। গরমের দিনে এমন একটি ময়েশ্চারাইজার বেছে নিতে হবে, যেটি একসাথে ত্বককে শুষ্কতা থেকে মুক্তি দেয় এবং সূর্য থেকে রক্ষা করে। শুধু ঘরের বাইরে নয়, বাড়িতে থাকলেও সানস্ক্রিন লোশন ব্যবহার করতে হবে। ঘরের মধ্য দিয়েও অতিবেগুনি রশ্মি চলাচল করতে পারে, যার ফলে ট্যান, বলিরেখা ও দাগছোপ হতে পারে।
গরমে মুখে তেল চটচটে ভাব হওয়া স্বাভাবিক। আর তাই আমাদের ত্বকের জন্য টোনার ব্যবহার করা জরুরি। টোনার আমাদের ত্বকের অযাচিত ছিদ্রগুলোকে বন্ধ করতে সাহায্য করে এবং তেল চিটচিটে ভাব কমাতে সাহায্য করে।
শিকাগো কসমেটিক সার্জারি অ্যান্ড ডার্মাটোলজির ক্লিনিক্যাল রিসার্চ বিভাগের সহ-পরিচালক ওমর ইব্রাহিম বলেন, "ভিটামিন-সি সিরাম সারা বছরই ব্যবহারের জন্য উপযোগী, কিন্তু গরমে ত্বকের জন্য এটি আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ"। ক্লিনজার ব্যবহারের পর এবং ময়েশ্চারাইজার ব্যবহারের আগে এটি ব্যবহার করা উচিত।
বর্ষায় ত্বকের যত্ন
গরমে যেখানে শরীরে আগুন লেগে যাওয়ার মতো অবস্থার সৃষ্টি হয়, তখন আমাদের একমাত্র প্রার্থনা হয় "আল্লাহ মেঘ দে, পানি দে, ছায়া দে রে তুই"। যে-ই এল বর্ষা, কখনও অনুজ্জ্বল ত্বক আবার কখনও ব্রনের হামলা পুরো মুখ জুড়ে।
বর্ষায় বাতাসে অতিরক্ত আর্দ্রতা থাকায় ত্বকে বেশি তেল জমে যায়, আর সেই জন্য নিয়মিত এক্সফোলিয়েট করলে ত্বকের উপরের স্তর থাকা ধুলোবালি দূর হয় সাথে সাথে ত্বক হয়ে ওঠে উজ্জ্বল। বর্ষায় সুয্যিমামার দেখা খুব একটা না মিললেও সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি মেঘের আড়ালেও সক্রিয় থাকে। তাই এসপিএফ-৩০ যুক্ত সানস্ক্রিন ব্যবহার করা চালিয়ে যেতে হবে।
বর্ষায় বাতাসের আর্দ্রতা বেশ ওঠানামা করে। তাই আবহাওয়া যেমনই হোক, ওয়াটার বেইজড ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করা ভালো। আর টোনার তো সাথে আছেই। মনে করে দু’বেলা অন্তত এ রুটিন মানতেই হবে, তবেই ত্বক হাসতে শুরু করবে।
বর্ষায় পানি খাওয়ার প্রবণতা সবচেয়ে কম থাকে; কিন্তু শরীরের চাহিদা পূরণের জন্য প্রচুর পানি পান করতে হবে। এতে শরীর থেকে বিষাক্ত পদার্থ বের হয়ে, আমাদের ত্বককে আরো সতেজ করতে সাহায্য করে।
শীতে ত্বকের যত্ন
কাদামাখা, স্যাঁতস্যাঁতে মৌসুম কাটিয়ে শীতের হিমেল হাওয়া শুরু হয় দুর্গাপুজোর পরপরই। শীতকাল মানেই সোয়েটার-চাদরে মোড়ানো দিন আর গরম গরম সুস্বাদু সব খাবার। শীতকালে সেইসাথে লেগে যায় বিয়ের ধুম আর চুটিয়ে চলে সাজগোজ। গরমে ঘেমে আর বৃষ্টিতে ভিজে সাজ নষ্ট হওয়ার কোনো সুযোগই থাকেনা। কিন্তু ভুলটা আমরা এখানেই করি। শীতের আর্দ্রতা কেড়ে নেয়ে ত্বকের আর্দ্রতাও।
সব ঋতুর মতোই প্রতিদিনই ত্বকের যত্নে নিয়মিত ক্লিনজার, টোনার এবং ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করতেই হবে। রুটিন মেনে দিনে দু’বার এ তিনটি বস্তু ব্যবহার করলে ত্বক নিয়ে খুব চিন্তা করতে হবে না। শীতকালে ত্বকে ময়েশ্চারাইজার ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাজারের ক্রিম যদি ব্যবহার করতে না চায় কেউ, সেক্ষেত্রে ঘরোয়া উপায়ে কিছু ময়েশ্চারাইজার বানিয়ে ব্যবহার করলে অনেক উপকার পাওয়া যায়। যেমন- অলিভ অয়েল বা অ্যালোভেরা।
সপ্তাহে অন্তত দু’বার মুখে স্ক্রাবিং করতে হবে, যাতে ত্বকের মৃত কোষগুলো বের হয়ে আসে। এটি রোজ করা যাবে না। যাদের ত্বক সংবেদনশীল, তাদের জন্য একবারই যথেষ্ট।
এর পাশাপাশি আমাদেরকে পর্যাপ্ত জলপানের বিষয়টি খেয়াল রাখতে হবে। শীতকালে কম জলপানের ফলাফল ত্বকে ব্রন, একনিসহ আরও সমস্যা দেখা দেয় খুব দ্রুত। শীতকালে যেহেতু প্রচুর রঙিন শাকসবজির সমারোহ দেখা যায়, তাই অনেক বেশি পরিমাণে টাটকা শাকসবজি ও ফল খেতে হবে। তবেই ত্বক ধীরে ধীরে ঔজ্জ্বল্য ফিরে পাবে।
ষড়ঋতুর ছয়টি রূপে আমরা যেমন নানা উৎসবে মেতে উঠি, তেমনি ত্বকের যত্নে ঋতুভেদে বাড়তি যত্ন নিতে হবে। ত্বকের নিয়মিত সুস্থতা এনে দেবে উপভোগ্য ও বৈচিত্র্যময়তা।
লাবণ্য ভৌমিক বর্তমানে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃষি অর্থনীতি ও গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান অনুষদে অধ্যয়নরত রয়েছেন। labanyabhowmik1777@gmail.com
