Loading...

উপমহাদেশের সাহিত্যে নারী গোয়েন্দা

| Updated: July 09, 2022 19:32:09


উপমহাদেশের সাহিত্যে নারী গোয়েন্দা

সাহিত্যপ্রেমী মাত্রই বইয়ের পাতা থেকে পাঠকের হৃদয়ে আলোড়ন তোলা গোয়েন্দাদের দারুণ ভক্ত। সত্যান্বেষী ব্যোমকেশ বকশী, কাকাবাবু, কিরিটী রায় বা পাণ্ডব গোয়েন্দা থেকে শুরু করে সত্যজিৎ রায়ের অমর সৃষ্টি ফেলুদা - ভারতীয় উপমহাদেশের সাহিত্যের পুরুষ গোয়েন্দা চরিত্ররা সবসময়ই পাঠকদের কাছে পরম পূজনীয়। কিন্তু সেই তুলনায় নারী গোয়েন্দা চরিত্রদের নিয়ে আলোচনা হয় কমই। 

উপমহাদেশীয় সাহিত্যে প্রমীলা গোয়েন্দা চরিত্রের অভাব আছে এমনটি ধরে নিলে ভুল হতে বাধ্য। কিন্তু উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী গোয়েন্দা চরিত্র থাকলেও তাদের মধ্যে জনপ্রিয়দের খুঁজে আনা বেশ কষ্টসাধ্য। 

লাল্লি

মুম্বাইয়ের শল্যচিকিৎসক এবং লেখক কল্পনা স্বামীনাথানের হাত ধরে ক্রিপ্টিক ডেথ নামক বইয়ে প্রথমবারের মতো আবির্ভাব ঘটে পুলিশের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা লাল্লি। ষাটোর্ধ এই নারী গোয়েন্দা চরিত্রের কাজের সঙ্গী তার ভাগ্নি সীতা। বইগুলো লেখা হয়েছে সীতার বয়ানে। লাল্লির গুলি ছোঁড়ার নির্ভুল টিপ আর আত্মরক্ষার কৌশল তাকে করেছে অনন্য। অনেকেই লাল্লির মাঝে অগাথা ক্রিস্টির মিস মার্পল চরিত্রের ছায়া খুঁজে পান।

পুরো বইয়ের প্রথম থেকে শেষ পাতা অবধি গা ছমছমে শিহরণ থাকবে, এমনটা এই এর বৈশিষ্ট্য নয়। কিন্তু মনের মধ্যে থাকা সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়ার চেয়ে পড়ার আনন্দে পড়তে থাকা পাঠকের হৃদয়ে বেশ সহজেই জায়গা করে নেবে এই সিরিজের বইগুলি। 

সুধা গুপ্ত 

নারীবাদী তামিল লেখক চি এস লক্ষ্মী আমবাই নামেই সাধারণের কাছে বেশি পরিচিত। আমাদের সমাজে নারীদের প্রতিনিয়ত কঠোর সংগ্রামের যে পথ, তার মধ্যে দিয়েই তিনি তুলে এনেছেন তাঁর নারী গোয়েন্দা, সুধা গুপ্তকে। সুধা গুপ্ত একজন বয়স্ক প্রাইভেট ডিটেকটিভ। কিন্তু, বয়স বাড়ার সাথে সাথে বেড়েছে অভিজ্ঞতা যা এই চরিত্রকে করে তুলেছে তীক্ষ্ণ বুদ্ধি সম্পন্ন। 

দারুচিনি দেয়া চায়ে চুমুক দিতে পছন্দ করা সুধা গুপ্ত কাজ করেন পুলিশ ইনস্পেক্টর গোবিন্দ শেলকের সাথে। এ চরিত্রকে নিয়ে লেখা তিনটি উপন্যাসে উঠে এসেছে মানুষের প্রবৃত্তিগত লোভ লালসা সহ জীবনের বিভিন্ন অন্ধকার দিক। সমাজের গোঁড়ামি আর প্রচলিত কাঠামোকে বারংবার প্রশ্নের জালে বিদ্ধ করে আমবাই তাঁর গল্পে যোগ করেছেন নতুন নতুন মাত্রা। 

পারভিন মিস্ত্রী

পারভীন মিস্ত্রীর সাথে অন্যান্য নারী গোয়েন্দাদের তুলনায় রয়েছে স্বাতন্ত্র্য। আইন আদালতের গন্ধ মেশা এই পারভিন চরিত্রে বারবার আলতোভাবে উঠে এসেছে বোম্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নারী স্নাতক এবং ভারতের প্রথম নারী আইনজীবী কর্নেলিয়া সোরাবজির জীবন ও বিচক্ষণতা। দু’জনেরই কাজের ক্ষেত্রে আইনের যথেষ্ট প্রভাব থাকায় এ সংযোগ খুঁজে বের করাও দুরূহ নয়। 

ব্রিটিশ শাসনাধীন অবিভক্ত ভারতের প্লটে বিগত শতাব্দীর বিশের দশকের আবহে পারভিন মিস্ত্রী নামের চরিত্রকে কেন্দ্র করে সুজাতা ম্যাসি লিখেছিলেন তিনটি গোয়েন্দা উপন্যাস। উপন্যাসগুলোর প্লটের সূচনা হয় পারভিনের বাবার ল’ ফার্মের আইনজীবীদের সামান্য আইনী জটিলতা নিয়ে। পরে অবশ্য সেই জল গড়ায় খুনের ঘটনা নিয়ে লেখা রহস্য রোমাঞ্চে।

মিতিন মাসি

বাংলা ভাষাতে নারী গোয়েন্দা উপন্যাস লিখেছিলেন বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় লেখক সুচিত্রা ভট্টাচার্য। তাঁর গোয়েন্দার আদুরে নাম মিতিন মাসির আড়ালে লুকিয়ে আছে গালভরা নাম, প্রজ্ঞাপারমিতা মুখোপাধ্যায়। স্বামী পার্থ প্রেসের চাকুরে। বোনঝি টুপুরকে নিয়ে মিতিন মাসি শুধু রহস্য সমাধান করেই ক্ষান্ত হয় না, বরং তলিয়ে দেখতে চায় কঠিন সত্য। বিভিন্ন বিষয়ে তার জ্ঞান যেমনি অসীম, তেমনি সঙ্গে রাখে নিজের রিভলভার। এছাড়া মিতিন মাসি রাঁধেও দারুণ। 

থার্ড আই নামক গোয়েন্দা সংস্থা পরিচালনা করা মিতিন মাসিকে নিয়ে সুচিত্রা ভট্টাচার্য লিখেছিলেন ১৯ টি উপন্যাস ও বড় গল্প। এ উপন্যাসগুলোই মিতিন মাসিকে নিতান্ত হাতে গোনা বাঙালী প্রমীলা গোয়েন্দার ভীড়ে করে তুলেছে অনন্য এবং জনপ্রিয়। একদিকে ইতিহাস-ঐতিহ্যের সাথে জমজমাট ভ্রমণ কাহিনি, অন্যদিকে কলকাতার পারিবারিক বন্ধন - এসবের এক দুর্দান্ত রসায়ন মিতিন মাসির বইগুলোর পাতায় পাতায়। 

সুপার স্পাই গুলাবি 

আর দশটা গোয়েন্দা চরিত্র থেকে অনেকখানি আলাদা গুলাবির সুপার স্পাই হয়ে ওঠার কোনো ইচ্ছে ছিল না। উপযুক্ত এক স্বামীর খোঁজে ঝাড়খণ্ডের গুলাবি চলে যায় মুম্বাই শহরে। লক্ষ্য একটাই, নিখুঁত সঙ্গীর খোঁজ। কিন্তু তেমন জীবনসঙ্গী খুঁজতে গিয়ে নিয়তির ফেরে গুলাবি আটকে যায় মুম্বাই শহরের ভয়ংকর সব অপরাধীদের মাঝে। এরপরই ঘুরে যায় গুলাবির জীবনের মোড়, এগোতে থাকে গল্পও।

এমনই এক প্লটের ওপর দা স্পাই হু লস্ট হার হেড নামের গোয়েন্দা উপন্যাস লিখে বেশ পরিচিতি লাভ করেছেন লেখিকা জেইন ডি সুজা। তাঁর লেখনীতে বারংবার উঠে এসেছে মুম্বাইয়ের অলিগলি, শহরজুড়ে ঘটে যাওয়া অপরাধ আর এই সবকিছুর মধ্যে দিয়েই অচেনা নতুন এক শহরে রহস্যের সমাধান করতে চাওয়া সাধারণ এক নারীর সংগ্রামের জীবন।  

সিরাজুল আরিফিন বর্তমানে ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজিতে কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত।

sherajularifin@iut-dhaka.edu

Share if you like

Filter By Topic