অন্তবিহীন পথ চলাই জীবন, শুধু জীবনের কথা বলাই জীবন— নচিকেতার একটি বিখ্যাত গান। এ গানের পরতে পরতে ঝলমল করে গভীর সারমর্ম, যা কিনা বারবার আমাদের মগজে স্থাপন করে দেয়— জীবন মানে এগিয়ে যাওয়া, জীবন মানেই গতিশীল কোনো কিছু।
কিন্তু, চিরন্তন অসামঞ্জস্যের প্রয়োজনে জীবন সবসময় আমাদের সাথে সমান আচরণ করে না। আবার কখনো কখনো আমরা তার সব আচরণের মর্মার্থ বুঝতে না পেরে খুইয়ে ফেলি এগিয়ে যাওয়ার রসদ বা অনুপ্রেরণা। এমতাবস্থায় খুব ছোট অথচ বিস্তর অর্থবোধক কিছু কথা পুনরায় স্মরণ করিয়ে দেয়—জীবনের সঠিক অনুবাদ।
তাই আমরা আমাদের আজকের লেখাটি সাজিয়েছি এমনকিছু শক্তিশালী উক্তি বিশ্লেষণে, যা আমাদের ব্যক্তিজীবনে ইতিবাচক প্রভাব রাখতে পারে।
“অন্যের সাথে তুলনা করার মধ্য দিয়ে মানুষ নিজেই নিজের সাথে সহিংস হয়ে ওঠে।”
--আইয়ানলা ভানজান্ট
কেউ যদি প্রতিনিয়ত তার অবস্থানের প্রতিপক্ষ হিসেবে অন্যকে বেছে নেয়, সেক্ষেত্রে তার মধ্যে স্রেফ হতাশা বৃদ্ধি ছাড়া অন্য কিছু ঘটে না। অথচ, ব্যক্তি যখন অন্যের সাথে নিজেকে তুলনায় টানে; আদতে ব্যক্তি তার শক্তিশালী হতে চাওয়া বা সমৃদ্ধ হতে চাওয়ার ইচ্ছে থেকেই এমনটা করে থাকে। কিন্তু, সমৃদ্ধ হবার পথে হতাশা বৃদ্ধি নয় বরং চৌকসতার সাথে পরিশ্রমই হতে পারে একমাত্র অবলম্বন।
“গতকাল আমি চতুর ছিলাম, তাই পৃথিবীকে পাল্টে দিতে চেয়েছি, আজ আমি বুদ্ধিমান, তাই নিজেকে বদলে দিতে চাই।”
--রুমি
সবাইকে পাল্টে দেবার লক্ষ্যে কেউ যদি প্রতিনিয়ত তার চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করে, সেক্ষেত্রে তার খেয়াল কখনোই নিজের দিকে আসে না। যার ফলে ব্যক্তি তার ভুলভ্রান্তিগুলো শোধরানোর অবকাশ পায় কম। আবার, সত্যিকার অর্থে পৃথিবীকে পাল্টে দিতে চাইলে অবশ্যই আগে নিজেকে পাল্টে ফেলা দরকার, কেননা প্রতিটি মানুষই পৃথিবীর অনস্বীকার্য এক উপাদান।
“নেতিবাচক ও বিষাক্ত মানুষের জন্য জায়গা না রেখে, বরং ওদের অদরকারির কাতারে ফেলাই বেশি উচিত।”
-- রবার্ট টিউ
চলার পথে নানাবিধ মানুষের সঙ্গে আপনার সাক্ষাৎ হতে পারে। কানে বাজতে পারে এমন কিছু কথা, যা নিতান্তই ঠুনকো অভিজ্ঞতার উপর পরিবেষ্টিত। এমতাবস্থায় আবেগতাড়িত হয়ে অবশ্যই সে কথাগুলোকে গায়ে মাখানো উচিত নয়। কারণ, সব মানুষ কখনোই আপনার ব্যক্তিজীবনে গুরুত্বপূর্ণ কেউ হয় না।
“ঝুঁকি না নিলে সবকিছুই ঝুঁকির।”
-- জিনা ডেবিস
ঝুঁকিহীনভাবে পৃথিবীর কেউই কখনো মহত্তম কোনো কাজ সমাপ্ত করতে পারে না। কেউ যদি ঝুঁকির কথা চিন্তা করে নিরাপদ পথে হাঁটতে শুরু করে, তখন তার নিরাপদ মনে করা পথটাই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। তাই, মনে রাখা উচিত, ঝুঁকি না নেয়ার অর্থই হচ্ছে— নিজেকে অর্থহীন হিসেবে প্রমাণ করার অন্যতম ধাপ।
“নিজেকে ব্যাখ্যা করা বন্ধ করুন, কারণ মানুষ তা-ই শোনে, যা তারা শুনতে চায়।”
--পাউলো কোয়েলহো
প্রায়শই আমাদের এমনকিছু ঘটনার সম্মুখীন হতে হয়, যেখানে আমরা আমাদের নিজেকে সঠিকভাবে উপস্থাপন করা সত্ত্বেও অন্য কারো কাছে বিষয়টি সঠিক হিসেবে বিবেচিত হয় না। তখন আমরা নিজের অবস্থান পরিষ্কার করতে নানাবিধ ব্যাখ্যা দিতে শুরু করি। কিন্তু তবু নিজেকে সত্যিকার অর্থে প্রমাণ করতে পারি না। কেন এমনটা হয়? আসলে, নিজেকে প্রমাণ করতে নিজের কাজটুকু ছাড়া আর কোনোকিছুরই দরকার পড়ে না। যেখানে কাজের বাইরে গিয়ে ব্যাখার প্রয়োজন পড়ে, সেখানে অধিকাংশ সময়ই নিজেকে প্রমাণ করা যায় না।
“আপনি যখন আবেগতাড়িত হয়ে কোনোকিছুর প্রতিক্রিয়া জানান, তখন অন্য কেউ আপনাকে নিয়ন্ত্রণ করে। আর আপনি যখন ভেবেচিন্তে জবাব দেন, তখন আপনি ও আপনার আবেগ উভয়ই থাকে নিজের দখলে।”
-- বোহদি স্যান্ডার্স
মানুষের সবচেয়ে শক্তিশালী ভেতর উপাদানের নাম—আবেগ। এ আবেগের কল্যাণে মানুষ পৃথিবীর বড় বড় সব অর্জন বাগিয়ে নেয়। কিন্তু, যখন তা অন্য কারো নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, ঠিক তখনই এর সবচেয়ে বেশি অপচয় ঘটতে শুরু করে। নিজস্ব আবেগকে নিজের আয়ত্তে রেখে সঠিকভাবে ব্যবহার করা গেলে, সফলতার পথকে অনেকটাই মসৃণ করা সম্ভব।
“শিশুকে ধনী হতে নয়, বরং আনন্দিত হতে শেখান। ”
-- ভিক্টর হুগো
মানুষের জীবনের সবচেয়ে উর্বর সময় হচ্ছে তার শৈশব। এ বেলায় মানুষ যা দেখে বা শেখে, তা পরবর্তী সময়ে সবচেয়ে বেশি কাজে আসে৷ শিশুকাল থেকে কেউ যদি এমন শিক্ষা পায় যে, তাকে ধনী হতে হবে, তবে সে কেবল অর্থকেই জীবনের মূল ভেবে প্রতিনিয়ত নিজেকে পরিচালনা করে— যা তাকে খুব কম সময়ই আনন্দ দিতে পারে।
মানুষের হাতে হয়তো বিশেষ কোনো জাদুর কাঠি নেই, যা দিয়ে সে তার সব চাওয়াই পূরণ করতে পারে, কিন্তু মানুষের হাতে থাকে তার চিন্তা, যা দিয়ে সে সবকিছুই রাঙিয়ে তুলতে পারে। তাই আমরা যেন আমাদের চিন্তার দিকে সর্ব্বোচ্চ যত্নবান হই।
সঞ্জয় দত্ত বর্তমানে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে পড়াশোনা করছেন।
sanjoydatta0001@gmail.com
