প্রায় ৮,৮৪৯ মিটার বা ২৯,০৩২ ফুটের চেয়েও বেশি উঁচু, দেখলে মনে হয় ছাড়িয়ে যাচ্ছে আকাশকে। বলা হচ্ছে পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্টের কথা। কিন্তু মাউন্ট এভারেস্ট কী সবসময়ই পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ থাকবে?
অরোরা আলমোর নেপালে অবস্থিত মাউন্ট এভারেস্টের দক্ষিণ বেস ক্যাম্পের দিকে এগোচ্ছিলেন। সময়টা ছিল ২০১৯ সালের এপ্রিল। আলমোর এভারেস্টের ঢালে অবস্থিত একদল বিজ্ঞানীদের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরবরাহ করছিলেন। পুরস্কারস্বরূপ সে এক অসাধারণ দৃশ্য দেখতে পেয়েছিলেন। কারণ এরকম পরিষ্কার দিন হিমালয় অঞ্চলে পাওয়া খুবই কষ্টসাধ্য। সে পরিষ্কারভাবে হিমালয় অঞ্চলে অবস্থিত সবগুলো পর্বত দেখতে পাচ্ছিলেন।
পরবর্তী দুইমাস ধরে তিনি ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক এবং রোলেক্স অভিযানের গবেষকদের হিমালয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে গবেষণায় সাহায্যের জন্য নিযুক্ত হয়েছিলেন। বলে রাখা ভালো, আলমোর একজন ভূতাত্ত্বিক এবং সেসময় যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক সোসাইটির সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার ছিলেন। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক এবং রোলেক্সের গবেষক দলকে মাউন্ট এভারেস্টের চূড়ায় বিশ্বের সর্বোচ্চ আবহাওয়া স্টেশন স্থাপন করতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা করেছিলেন। তাদের এ অভিযান চলাকালীন তারা তুষার এবং স্রোতের জলে বিশ্বের সর্বোচ্চ পরিমাণ মাইক্রোপ্লাস্টিকের দূষণ আবিষ্কার করেন।
এভারেস্টের চূড়া থেকে নিচে দেখলে মনে হয় যেন হলুদ সবুজে মেশানো এক ছোট শহর দেখা যাচ্ছে। হাজার হাজার মানুষ ঝাঁকে ঝাঁকে প্রতি বসন্তে সমুদ্রপৃষ্ঠের ৫ কিলোমিটার উপরে ক্যাম্প করে এভারেস্ট জয়ের স্বপ্ন নিয়ে। অনেকে তো আবার আসেন একাধিকবার এভারেস্ট জয়ের রেকর্ড করতে।
ঠিক এভাবেই কিছু পর্বতারোহী খেয়াল করেন যে এ পর্বত প্রতি বছর আগের তুলনায় কিছুটা লম্বা হচ্ছে।

আসলে সত্যিই মাউন্ট এভারেস্ট হিমালয়ের বাকি অংশের সাথে প্রতি বছর কিছু পরিমাণে উপরের দিকে বাড়ছে। আর এ কারণেই অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে শুরু করেছে - সময়ের সাথে মাউন্ট এভারেস্ট কতটা বেড়ে উঠবে? কোন পর্বত পৃথিবীতে কতটা বড় হতে পারবে এর কী কোনো সীমা আছে কিনা?
সাম্প্রতিক সময়ে চীন এবং নেপালের চালানো যৌথ জরিপ অনুযায়ী এভারেস্টের উচ্চতা ৮,৮৪৮.৮৬ মিটার বা ২৯,০৩২ ফুট। কিন্তু এভারেস্টই কিন্তু এ অঞ্চলে থাকা একমাত্র দৈত্যাকার পর্বত নয়। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৮০০০ মিটার উপরে থাকা পৃথিবীর মোট ১৪টি পর্বতের ১০টিই এ অঞ্চলে অবস্থিত।
বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আলমোর বলেন, “এভারেস্ট তার বন্ধুদের মাঝে রয়েছে এবং একসাথে বেড়ে উঠছে। আপনি গ্রিনল্যান্ড কিংবা কানাডিয়ান রকিজের উপর দিয়ে যদি কখনো ভ্রমণ করে থাকেন তাহলে আপনি নিশ্চয়ই অনেক বড় বড় পর্বত দেখতে পারবেন কিন্তু হিমালয় পর্বতমালার সাথে কিছুরই তুলনা হয় না সত্যি বলতে।“
এতসব বিশাল পর্বতমালার মাঝে এটা আলাদা করা আসলেই খুব কষ্টকর ছিল যে কোনটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পর্বত!

হিমালয় পর্বতমালা (ইমেজ ক্রেডিটঃ ওয়ার্ল্ড আটলাস)
যদি এর পেছনের ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকানো হয়, তাহলে ফিরে যেতে হবে ১৮৫২ সালে যখন সর্বপ্রথম পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বত কোনটি তা বের করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তখনো এভারেস্টের উচ্চতা আসলে কত তা ছিল এক রহস্যঘেরা বিষয়। তখন এর নাম ছিল ‘পিক ফিফটিন’।
সেসময় রাধানাথ শিকদার নামে এক ভারতীয় গণিতবিদকে ব্রিটিশ সরকার তাদের ত্রিকোণমিতিক জরিপে কাজ করার জন্য নিযুক্ত করেন। এর পেছনে তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল তাদের দখলকৃত অঞ্চলের একটি পরিষ্কার ভৌগোলিক চিত্র সংগ্রহ করা যাতে করে তারা পুরো অঞ্চল সহজে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
শিকদার ত্রিকোণমিতি ব্যবহার করে তখন এভারেস্টের উচ্চতা মাপা শুরু করলেন। যেসব পর্বতের উচ্চতা আগে থেকেই জানা ছিল তিনি সেসব পর্বত থেকে এভারেস্টের চূড়ার আনুভূমিক এবং উল্লম্ব কোণগুলি পরিমাপ করলেন। আর এভাবেই তিনি এক অবিস্মরণীয় আবিষ্কার করে ফেললেন। তার হিসাবকৃত উচ্চতা অনুযায়ী এভারেস্টই হলো পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু পর্বত। তার হিসাব অনুযায়ী তখন এ উচ্চতা ছিল ৮৮৩৯.৮ মিটার বা ২৯,০০২ ফুট।
সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো প্রায় দেড় শতকের বেশি আগে রাধানাথ শিকদারের হিসাব করা এভারেস্টের উচ্চতা আর সর্বশেষ হিসাবকৃত উচ্চতার মধ্যে পার্থক্য মাত্র ৯ মিটার!
এত অসাধারণ আবিষ্কারের পরও পৃথিবীর সর্বোচ্চ এ পর্বতের নামকরণ করা হয় ব্রিটিশ জরিপকারী স্যার জর্জ এভারেস্টের নামানুসারে যিনি কিনা রাধানাথের এ আবিষ্কারের আরো বেশ কয়েক বছর পূর্বেই অবসর গ্রহণ করেছিলেন।
এরপর থেকেই বিভিন্ন জরিপকারী দল এভারেস্টের উচ্চতা বিভিন্ন সময় পরিমাপ করেছেন এবং যার কারণে অনেক বাকবিতন্ডাও সৃষ্টি হয়েছে। এর পেছনের কারণ শুধুমাত্র প্রযুক্তির উন্নয়ন এরকম ভেবে থাকলে সে ধারণা সঠিক নয়। রাজনৈতিক কারণে এভারেস্টের উচ্চতা নিয়ে বিভিন্ন সময় চীন এবং নেপাল দ্বন্দ্বে জড়িয়েছে।
কিন্তু এসব ছাপিয়ে এভারেস্টের উচ্চতায় পরিবর্তনের কারণ হলো এটি প্রতি বছরই কিছু পরিমাণ উঁচু হচ্ছে। কিন্তু কীভাবে এভারেস্টের উচ্চতা প্রতি বছর বাড়ছে?
এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে যেতে হবে এভারেস্ট আসলে কীভাবে গঠিত হয়েছিল সে ইতিহাসে।
বিজ্ঞানীদের মতে, এভারেস্ট যে জায়গায় রয়েছে বর্তমানে সে জায়গা আগে শুধুই সমতল সমুদ্র ছিল। আজ থেকে প্রায় ২০ কোটি বছর আগে এটি পরিবর্তিত হতে শুরু করে যখন জুরাসিক যুগে ডাইনোসর আবির্ভূত হওয়া শুরু হয়েছিল।
বর্তমান ভারতীয় উপমহাদেশটি তখন ‘গন্ডোয়ানা’ নামক একটি সুপারকন্টিনেন্টের অংশ ছিল। গন্ডোয়ানার মধ্যে আরো ছিল আজকের অস্ট্রেলিয়া, এন্টার্কটিকা, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকা। প্রায় ১০ কোটি বছর আগে অর্থাৎ ক্রেটাশীয় যুগের শেষের দিকে ইন্ডিয়ান প্লেটটি মাদাগাস্কারের সাথে যুক্ত হয়ে গন্ডোয়ানা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এরপর এটি মাদাগাস্কার থেকেও বিচ্ছিন হয়ে বছরে ২০ সেন্টিমিটার গতিতে উত্তর দিকে যাত্রা আরম্ভ করে এবং প্রায় ৫ কোটি বছর আগে এটি ইউরেশিয়ান প্লেটের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়।
পরবর্তীতে ইন্ডিয়ান প্লেট ও ইউরেশিয়ান প্লেটের সংঘর্ষের ফলে মধ্যবর্তী সেডিমেন্ট উপরের দিকে উঠতে থাকে। আর এভাবেই ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হতে থাকে হিমালয় পর্বতমালা। ইন্ডিয়ান প্লেটটি এখনো ইউরেশিয়ান প্লেটকে উত্তর পশ্চিম দিকে ধাক্কা দিচ্ছে। তাই ইউরেশিয়ান প্লেটটি উত্তর দিকে সরে যাচ্ছে আর ইন্ডিয়ান প্লেটটি বছরে প্রায় ২ সেন্টিমিটার হারে সংকুচিত হচ্ছে। আর এই দুই প্লেটের ঠোকাঠুকিতে মাউন্ট এভারেস্টের উচ্চতাও প্রতি বছর ৪ মিলিমিটার বা ০.১৬ ইঞ্চি করে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
তবে নেপাল ও এর আশেপাশের অঞ্চলে বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে এভারেস্টের উচ্চতা হ্রাস পায় বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। যেমন ২০১৫ সালে ৭.৮ মাত্রার ভূমিকম্পে এর উচ্চতা হ্রাস পেয়েছে বলে মনে করা হয়।
তবে বিজ্ঞানীদের মতে এভারেস্টের উচ্চতা বৃদ্ধির সম্পূর্ণ কারণ এর চেয়ে আরো জটিল। এ প্রক্রিয়া আরো ভালোভাবে বুঝার জন্য বিজ্ঞানীরা এভারেস্ট থেকে ৮,৭০০ কিলোমিটার দূরে আলাস্কায় অবস্থিত একটি পর্বত নিয়ে গবেষণা করেন।
কিন্তু গবেষণা শেষে তারা প্রায় একইরকম ফলাফল দেখতে পান। অর্থাৎ টেকটনিক প্লেটগুলোর সংঘর্ষের কারণেই মূলত পর্বতগুলো উপরের দিকে কিছুটা উঠে আসে। কিন্তু এ উচ্চতা নিয়ন্ত্রণে জলবায়ু পরিবর্তন কিংবা আবহাওয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
আলমোর এ বিষয়ে বিবিসিকে জানান, “সাধারণত আবহাওয়াজনিত বিভিন্ন কারণে পর্বতগুলোর উপরে অনেক সময় ক্ষয় সৃষ্টি হয়। কিন্তু এভারেস্টের উপরে সৃষ্টি হওয়া স্থায়ী তুষারটুপির কারণে এ ক্ষয় হয় না বললেই চলে। যার কারণে প্রতি বছর এটি উঁচু হচ্ছে।”
কিন্তু ঠিক একই প্রক্রিয়ায় হিমালয় অঞ্চলের বাকি পর্বতগুলোও এভারেস্টের তুলনায় আরো বেশি উঁচু হচ্ছে। যার কারণে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে শতবছর ধরে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকা এভারেস্ট কী আজীবনই পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ থাকতে পারবে? নাকি এভারেস্টকে হারিয়ে জায়গা করে নিবে অন্য কোনো পর্বত?
সময়টা না হয় সময়ের হাতেই তোলা থাক। কিন্তু মানুষের মনে এভারেস্ট যেমন বছরের পর বছর তাকে জয় করার মোহ জাগিয়েছে তা হয়তো অন্য কোনো পর্বত সেভাবে পারবে না।
মোঃ ওমর ফারুক তপু বর্তমানে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে যন্ত্রকৌশল বিভাগে পড়াশোনা করছেন।
jafinhasan03@gmail.com
