ই-বই আর বাংলাদেশ প্রায় সমবয়সী। সত্যিকার হিসাব করলে, ই-বই বাংলাদেশের চেয়ে প্রায় ছয় মাসের বড়ো। প্রথম ই-বই তৈরি হয় ১৯৭১ সালের ৪ জুলাই। এ বইটি তৈরি করেন প্রজেক্ট গুটেনবার্গের প্রতিষ্ঠাতা মাইকেল হার্ট। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণাকে মেইনফ্রেম কম্পিউটারে টাইপ করে এ বই তৈরি করেন। পরে বইটি বিনিপয়সায় নামানো যাবে বলে একটি বিজ্ঞপ্তি দেন ওই কম্পিটার ব্যবহারকারীদের। মনে রাখতে হবে তখনো ইন্টারনেট রয়েছে দূর ভবিষ্যতের গর্ভে!
ই-বই: ইতিহাস অনেক পুরানো!
ইলেকট্রনিক বুক বা ই-বুক যাকে বাংলায় ই-বই বলছি, তা নিয়ে একটু তাকাই পিছনের দিকে। ই-বইয়ের ধারণার বিস্তার ঘটেছে কম্পিউটারের হাত ধরে এমনটা অনেকেই ভাবতে পারেন। তবে একটু তালাশ করলেই দেখতে পাবেন, না তা নয়। ১৯৩০ সালের দিকে ‘টকি’ বা শব্দ-সংলাপসমৃদ্ধ ছায়াছবি দেখার পরই এমন বইয়ের কথা বলা হয়। ঠিক সে সময়েই পশ্চিমের বাজারে নামতে শুরু করে পেপারব্যাক বই। ই-বইয়ের ধারণা প্রথম ব্যক্ত করেন ততকালীন খ্যাতনামা লেখক বব ব্রাউন। তাকে কেউ কেউ ‘ই-রিডারের’ গডফাদার বা ঈশ্বরপিতা হিসেবেও অভিহিত করেন। ‘টকিজের’ আদলে তিনি এমন কাল্পনিক বইয়ের নাম দেন ‘রিডিস (Readies)।’ তিনি লেখেন, ‘সময়ের সাথে তাল মেলাতে ব্যর্থ হয়েছে লেখা বইকে হটিয়ে দিয়েছে ছায়াছবি। তবে আমাদের টকিজ(বা শব্দ-সংলাপ সমৃদ্ধ) ছায়াছবি থাকলেও এখনো ‘রিডিজ’(বা ‘পাঠক’) বই নেই। আজকের যুগে অবিরাম দ্রুত পাঠ করে যাওয়ার জন্য একটা যন্ত্র দরকার। একটা সাধারণ পাঠক-যন্ত্র যা সহজেই এখানে সেখানে নেওয়া যাবে, পুরানো বিদ্যুৎ-বাতির প্লাগে সংযোগ দেওয়া চলবে। আর চাইলেই, হাজার হাজার শব্দের উপন্যাস পড়ে দেবে ১০ মিনিটে (দশ মিনিটে দ্রুত গতিতে পড়ার সক্ষমতা থাকবে এ যন্ত্রের)। হ্যাঁ, এ রকমটাই আমি চাই। অক্ষরের আকার কি হবে তাও পাঠক নিজেই ঠিক করে নেবেন। এ যন্ত্রে কাগজের কোনো দরকারই পড়বে না।’
বব ব্রাউনের এই কল্প-যন্ত্র দিয়ে একজন পাঠক ছাপানো বইয়ের চেয়ে দ্রুতগতিতে বই পড়তে পারবেন বলে ভাবা হয়েছিল। তবে এমন কোনো যন্ত্রের মুখ কখনোই দেখা যায়নি।

১৯৪৯ সালে নিজের তৈরি বহনযোগ্য ই-রিডার নিয়ে স্পেনের স্কুল শিক্ষিকা অ্যাঞ্জেলা রুইজ রোবেলস
এদিকে, বহনযোগ্য ই-রিডার প্রথম তৈরি করেন স্পেনের স্কুল শিক্ষিকা অ্যাঞ্জেলা রুইজ রোবেলস ১৯৪৯ সালে। ছাত্রদেরকে ভারি ভারি বই বহনের কষ্ট থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য এটি বের করেন তিনি। নাম দেন ‘যান্ত্রিক বিশ্বকোষ।’এটিই পৃথিবীর প্রথম স্বয়ংক্রিয় পাঠ-যন্ত্র। আজকের দিনের হালকা-পাতলা রিডার দেখলে রুইজ রোবেলসের আনন্দ আকাশে যেয়ে ঠেকত সে কথা জোর দিয়েই বলা যায়। এতে শত শত বই পোরা থাকলেও ওজন নামমাত্র। হয়ত একটা ভারি খাতার সমান। ছাত্রদেরকে ভারবহনের কষ্টই আর করতে হয় না। এমন একটা দিনের কামনাই তো করেছিলেন রোবেলস!
বাংলাদেশে ই-বই
বাংলাদেশে ব্যবসার লক্ষ্যে ই-বইয়ের যাত্রা বেশি দিন আগে শুরু হয়নি। দেশের প্রথম ব্যবসায়িক ই-বই তৈরি হয় ২০১৬ সালে এবং তৈরি করে বেঙ্গল ফাউন্ডেশন। এর মধ্য দিয়ে দেশে ই-বইয়ের ব্যবসায় প্রথমে নামার কৃতিত্ব অর্জন করে বেঙ্গল ফাউন্ডেশন। তারা স্বতন্ত্রভাবে ই-বই প্রকাশ করলেও সে কৃতিত্ব দাবি করতে পারে না ভারতের বাংলা ই-বই। জার্মানির এক অবাণিজ্যিক সংস্থা ভারতে আঞ্চলিক ভাষায় ই-বই প্রকাশের বিষয় কাজ করছিল। এই সংস্থার দৌলতেই দেশটিতে প্রথম বাংলা ই-বই প্রকাশিত হয়। ২০১৫ সালে এ কাজটি করা হয়।
পৃথিবীতে গত ৫০ বছরে ই-বইয়ের বিশাল বাজার সৃষ্টি হয়েছে। সে তুলনায় বাংলাদেশে এখনো পিছিয়ে আছে। তুলনামূলক ভাবে ই-বই প্রকাশ করার খরচ এবং ঝামেলা কম। তবে ই-বই নামমাত্র খরচে প্রকাশ করা সম্ভব বলে ভাবা হলেও তা ঠিক হবে না। ই-বই প্রকাশের পর্যায়গুলোর সঙ্গে প্রচলিত মানে ছাপা বইয়ের পর্যায়ের মিল আছে। সাধারণ ভাবে একটি বই প্রকাশের জন্য পাণ্ডুলিপি তৈরি করা, প্রুফ দেখা, লে আউট তৈরির করার আবশ্যকতা রয়েছে। এ কথা ই-বইয়ের জন্যেও একই ভাবে খাটে। কাগুজে বই বা ই-বইকে অনিবার্য ভাবে এ পর্যায়গুলো টপকাতে হবে। উভয় বইয়ের ক্ষেত্রে লেখককে সম্মানী দেওয়ার বিষয়টি এরপরই আসে। বইটি ছাপাতে হলে সে জন্য বইভেদে অন্তত ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা লাগে। অন্যদিকে ই-বই হলে তাকে বিক্রির প্ল্যাটফর্মে দেওয়ার জন্য ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা লাগতে পারে। আবার ফন্টজনিত একটা জটিলতা আছে। অভিন্ন বাংলা ইউনিকোড এখনো দাঁড় করানো যায়নি।
পিডিএফ করলেই হয় না ই-বই
‘কাগজের বইকে স্ক্যান করে পিডিএফে রূপান্তরিত করলেই সত্যিকার অর্থে ই-বই হয় না। কিংবা কোনো পাণ্ডুলিপিক পিডিএফ করা হলেও তা একই ভাবে ই-বই হয় না।’ কথাগুলো বলেন বইয়ের হাটের রিটন খান। গত এক যুগের বেশি সময় ধরে, সঠিক ভাবে বলতে গেলে, ১৩ বছর ধরে বাংলা ই-বই নিয়ে কাজ করছেন তিনি, বাস করছেন আমেরিকায় বসবাসকারী । ফোনে দীর্ঘ আলাপে তিনি বলেন, ‘একটা বইয়ে আমরা যা যা করতে পারি ঠিক তার সবকিছুই ই-বইতে করা সম্ভব। যেমন, বইয়ের পাতায় চিহ্ন দিয়ে রাখা, দাগ দেওয়া বা হাইলাইট করা , মন্তব্য লেখা এবং পাতা উল্টে পড়ার মজা পর্যন্ত সব কিছু্ করা সম্ভব। কিন্তু পিডিএফে তা করা যায় না করা গেলেও সহজ নয়। কিন্তু ই-বইয়ের পানিতে ভিজে খারাপ হওয়ার বা উই আর ইঁদুরে নষ্ট করার আশঙ্কা থাকে না। এ দিক থেকে দেখলে ই-বইকে অক্ষয় বলা যায়। এ ছাড়া ই-বই তেমন জায়গাও নেয় না। একটা পেন ড্রাইভে বা মোবাইল ফোনের স্মৃতিতে প্রচুর ই-বই রাখা যায়। এ জন্য কোনো ধরণের ভার বইতে হবে না।’
বিশ্বের প্রধান ই-বইয়ের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হলো অ্যামাজন, অ্যাপল এবং গুগল। লিটন খান জানান, ‘কমিশন দিতে হয় বলে বাংলাদেশের প্রকাশকরা সেখানে বই দিতে আগ্রহী নন। এতে ই-বইয়ের দুনিয়াজোড়া বাজার হাতের বাইরেই থেকে যাচ্ছে।’ অ্যামাজনের সাথে একযোগে বাংলা ই-বই প্রকাশ করছে বইয়ের হাট। এ পর্যন্ত ৮০টি বই প্রকাশ করা হয়েছে। কিন্তু সে সব বইয়ের ব্যবসা ‘একদম ভালো না।’ একদিকে বাংলাদেশের পাঠকদের বই কিংবা ই-বই দুইই পড়ার আগ্রহ কম।আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে ডলার দিয়ে বই কেনা বাংলাদেশ এখনো কঠিন। তুলনামূলক ভাবে, বাংলা ই-বইয়ের দাম খুবই কম, ৫ ডলারের বেশি নয়। কিন্তু ইংরেজি বা ভিনভাষী ই-বইয়ের দাম ছাপা বইয়ের থেকে সামান্য কম হয়ে থাকে।
জনপ্রিয়তা পাবে কিভাবে?
ই-বই জনপ্রিয় করত হলে বইয়ের জন্য প্রচার চালাতে হবে। এ বিষয়ে বিশিষ্ট লেখক, অনুবাদক এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জি এইচ হাবীব বলেন, ‘পুষ্টিকর খাবার পাওয়া যায় সে কথা তো জানতে হবে। পেট তো আর খালি থাকতে পারে না। ভালো খাবার না পাওয়া গেলে কম পুষ্টির বা পুষ্টিহীন খাবারই খেতে বাধ্য হবে মানুষ।’
বাংলাদেশে ই-বইয়ের চাহিদা নেই সে কথা উল্লেখ করেন সাবেক সচিব, বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের সাবেক ট্রাস্টি এবং বিশিষ্ট অনুবাদক খন্দকার আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, 'চাহিদা থাকলেই সে পণ্য বাজারে বিক্রি হবে।’ কম্পিউটার-সফটওয়্যার জাতীয় পণ্য কেনার মানসিকতা গড়ে না ওঠার প্রভাব ই-বইয়ের ক্ষেত্রেও পড়েছে বলে জানান তিনি। এ ছাড়া, মাগনা প্রচুর ই-বই পাওয়া যায় সে কারণে কিনতে আর পাঠক আগ্রহী হয়ে উঠছে না।
তাই ই-বই কিনে পড়ার মানসিকতা তৈরি করার। সংবিধিবন্ধ সতর্কতার মতো ‘বই পড়ুন, ই-বই কিনুন’এ কথা যদি দেশের সব চিপসের প্যাকেটে লেখার আইনি বাধ্যবাধকতা থাকে তবে এর একটি সুপ্রভাব পড়তে পারে! ই-বই কি তা জানতে আগ্রহী হবে অনেকেই। কিনবেও অনেকেই। চিপসের প্যাকেট শুধু নয়, দিয়াশলাই, মিষ্টির প্যাকেট, নামী-দামি দোকানের কাপড়ের ব্যাগ বা থলিসহ নানা স্থানে লেখা থাকতে পারে এটি। অর্থাৎ প্রচারটি হতে হবে নজরকাড়া।
পাশাপাশি, সরকারি-আধা সরকারি, বিদ্যালয়, মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয়ে ই-বই কেনা বাধ্যতামূলক করা গেলে তারও সুফল দেখা যাবে। শুধু ই-বই ভিত্তিক প্রতিযোগিতার দেশব্যাপী আয়োজন হতে পারে। হতে পারে ই-বই পড়ার প্রতিযোগিতা। এসব কাজে সরকার, ই-বই প্রকাশক এবং ই-বইয়ের পাঠককে একযোগে হাতহাত ধরে এগোতে হবে।
ই-বুক পড়ার মাধ্যম কিন্ডলসহ অন্যান্য রিডারের দাম কমানোর পদক্ষেপ নেওয়া যায়। অল্প টাকায় যেন পাঠক এই রিডার হাতে তুলে পারে সে ব্যবস্থা করতে হবে সরকারকেই।
বাংলা একাডেমি থেকে শুরু করে দেশের প্রধান প্রধান প্রকাশনীরা ই-বই প্রকাশ শুরু করলে ও তা প্রচার করলে একটা ইতিবাচক ফল মিলতে পারে। ই-বই প্রকাশের জন্য প্রকাশনীর ক্ষেত্রে কেবল ই-বইকে প্ল্যাটফর্মে তোলার বাড়তি খরচ বইতে হবে। সেটাও বড় কোনো ব্যয় নয়। বিশ্বমারির ঘরবন্দি দিনগুলোতে বই যাদের সঙ্গী ছিল তারা অনেকেই জানেন, ই-বই কতোটা সম্ভাবনাময়।
আর তাই ই-বই হয়ে উঠুক জনপ্রিয়। পাঠ্য বইয়েরও তৈরি হোক ই-সংস্করণ। তাতে জোরাল হবে কাগজ-বান্ধব পরিবেশ। একই সাথে, বাংলাদেশের সব ছাত্র-ছাত্রীর হাতে হাতে শোভাপাক একটি করে ই-বুক রিডার। ভারী ভারী বই টানার হোক অবসান। তা হলে কি ভালোই না হবে! তাই না?
