সম্প্রতি বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে প্রতারিত হওয়ার ঘটনাগুলো বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাড়া জাগিয়েছে। কেউ আগাম মূল্য পরিশোধ করেও কাঙ্ক্ষিত পণ্য হাতে পাচ্ছেন না, কেউ পাচ্ছেন নিম্ন মানের পণ্য, একটি পণ্যের বদলে অন্য পণ্য ডেলিভারি দেওয়া হচ্ছে, ডেলিভারির ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রিতা - এরকম অনেক অভিযোগ হরহামেশাই পাওয়া যাচ্ছে ক্রেতাদের কাছ থেকে।
বাংলাদেশের বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে কোটি কোটি টাকার পণ্য বিক্রয় হচ্ছে। মানুষ চাল-ডাল থেকে শুরু করে টিভি, ফ্রিজ সবকিছুই এখন কিনছে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে। ই-ক্যাবের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় ২,৫০০ এর মতো ই-কমার্স সাইট রয়েছে যেগুলোতে প্রতিদিন প্রায় অর্ধ লক্ষাধিক পণ্য বিক্রি হয়ে থাকে।
এছাড়াও রয়েছে লক্ষাধিক এফ-কমার্স অর্থাৎ ফেসবুক পেজ। বিভিন্ন উদ্যোক্তারা ফেসবুক পেজের মাধ্যমেও তুমুল ব্যবসা করে চলেছেন আর গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন তাদের কাঙ্ক্ষিত পণ্য।
বর্তমানে এই অনলাইন ব্যবসার ছত্রছায়ায় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী মানুষকে হেনস্তা ও প্রতারিত করে তাদের ফায়দা লুটছে। সাম্প্রতিককালে এই প্রতারণার হার এতটাই বেড়ে গিয়েছে যে মানুষ অনলাইনে কেনাকাটার উপর আস্থা হারিয়ে ফেলছে।
এই অসাধু ব্যবসায়ীরা ক্রেতাদের কিভাবে প্রলুব্ধ করছে? কেন দিনে দিনে এমন প্রতারণা বেড়েই চলেছে? এক্ষেত্রে ক্রেতারা কি সম্পূর্ণ দায়মুক্ত?
প্রতারণার ঘটনাগুলো লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যেসকল ই-কমার্স সাইট বা ফেসবুক পেজ বিভিন্ন ধরনের অভাবনীয় অফার, যেমন-বিশাল পরিমাণের ছাড়ের অফার, ‘ধামাকা’ ক্যাশব্যাক অফার, কোথাও আবার লটারিজাতীয় কিছুতে নির্বাচিত হলে ১০০% অফার।
মানে টাকাও ক্রেতার হাতেই থাকবে, আবার ক্রেতা কাঙ্ক্ষিত পণ্যও পেয়ে যাবেন - এমন অফার, প্রি-অর্ডারে পণ্যের মোট মূল্য পরিশোধ করলে বিশেষ সুবিধা পাওয়ার অফার, এ ধরণের অফার যারা দিয়ে থাকে তাদের দ্বারাই ক্রেতারা প্রতারিত হচ্ছেন বেশি।
এক্ষেত্রে এই অসাধু ব্যবসায়ীরা যেমন দায়ী ক্রেতারাও কিন্তু সম্পূর্ণ দায়মুক্ত নন। এমন অবাস্তব, লোভনীয় অফার দেখে অনেক ক্রেতা বাস্তবিক চিন্তা না করেই ঝাঁপিয়ে পড়েন।
একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কিভাবে ১০০% ফ্রিতে একটি পণ্য বিক্রয় করতে পারে বা এত বিশাল অংকের ডিসকাউন্ট দিতে পারে তা নিয়ে একটু ঠান্ডা মাথায় ভাবলেই হয়তো এমন প্রতারণার শিকার হতে হয় না।
বিভিন্ন অনলাইন সাইটে একটি পণ্যের বাজার দর যাচাই করলে সেখানে মূল্যের তারতম্য ১৯ থেকে ২০ বা আঠারো হতে পারে, কিন্তু ১৯ থেকে ৫ বা ১০ কখনোই সম্ভব নয়।
ক্রেতারাও হিতাহিত জ্ঞান না করে এইসব ফাঁদে পা দিয়ে ফেলছেন। নগদ মূল্য পরিশোধ করে বসে থাকলেও দীর্ঘদিন পরেও কাঙ্ক্ষিত পণ্য হাতে পৌছাচ্ছে না। প্রলোভিত হয়ে কষ্টার্জিত টাকাগুলো চলে যাচ্ছে দুষ্ট লোকের হাতে। এমনও হয়েছে যে ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে পণ্যের জন্য অনলাইনে অগ্রীম মূল্য পরিশোধ করছেন অনেক ক্রেতা, পরবর্তীতে প্রতারিত হওয়ার পরে এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতিতে পড়তে হচ্ছে তাদের।
ছোট্ট একটা ঘটনা দিয়ে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যায়। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নুডলস কোম্পানী অফার দিয়ে থাকে। নির্দিষ্ট নুডলসের প্যাকেটের সাথে একটি উপহার সামগ্রী ফ্রি।
মুদির দোকান বা সুপার শপে গেলে প্রায়শই এমন অফার দেখা যায়। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে অফার ছাড়া এবং অফারসহ নুডলসের প্যাকেটে নুডলসের পরিমাণের বেশ পার্থক্য থাকতে পারে। দুটো প্যাকেট পাশাপাশি রাখলে দেখা যাবে যে নুডলসের প্যাকেটের সাথে অফার আছে সেই প্যাকেটে অপেক্ষাকৃত কম নুডলস থাকে। অফলাইনের এই বিষয়গুলো খেয়াল করলে অনলাইনের প্রতারণার ফাঁকফোকরগুলোও কিন্তু অনায়াসে ধরা যায়।
যেসব অনলাইন সাইট বা ফেসবুক পেজ থেকে পণ্য ক্রয়ের জন্য অগ্রীম মূল্য পরিশোধ করতে হয়, সেগুলোর বিরুদ্ধেই প্রতারণার অভিযোগ ওঠে বেশি।
ক্যাশ-অন-ডেলিভারি বা হাতে পণ্য পাওয়ার পর মূল্য পরিশোধ করলে ক্রেতার প্রতারিত হওয়ার সুযোগ কম থাকে। কারণ ডেলিভারি ম্যানের সামনে পণ্যের মূল্য পরিশোধের পূর্বে পণ্য খুলে যাচাই করে নেওয়ার সুযোগ থাকে। বর্ণনা অনুযায়ী সঠিক পণ্য দিয়েছে কিনা তা সহজেই চেক করে নেওয়া যায়।
ক্রেতা হিসেবে আমাদের সচেতনতা আর হুলস্থুল অফারে প্রলোভিত না হয়ে যুক্তির বিচারে অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো থেকে পণ্য কিনলে খুব সহজেই এই ধরনের প্রতারণাকে রুখে দেওয়া সম্ভব।
শবনম জাবীন চৌধুরী ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের ফার্মেসি বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন।
zabin860@gmail.com
