চর জেগে নদীর নাব্য কমে যাওয়ায় এবং অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের কারণে চাঁদপুরে পদ্মা-মেঘনা নদীতে ইলিশের উৎপাদন অনেক কমে গেছে বলে মনে করছেন জেলে ও মৎস্য ব্যবসায়ীরা।
তারা বলছেন, চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনা নদীতে আগে প্রচুর পরিমাণে ইলিশ ধরা পড়লেও ধীরে ধীরে সে জৌলুস হারিয়ে যাচ্ছে। এক সময় এ এলাকার ইলিশ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হত। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে এ এলাকার পদ্মা-মেঘনা নদীতে ইলিশ ধরা পড়ছে কম। খবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের।
চাঁদপুর সদর উপজেলার লক্ষ্মীপুর এলাকার জেলে আবদুল কাদের বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে নদীতে জাল বাইতেছি। ছোটবেলা থেকে শুরু করছি। এখন ৬০ এর মতো বয়স হইছে। আগে এই নদীতে অনেক ইলিশ পাইতাম। এখন আর হেই ইলিশ আমরা পাই না।”
একই এলাকার জেলে দুলাল রাঢ়ী বলেন, “এখন নদীতে জাল ও নৌকা নিয়ে নেমে খরচ উঠানো খুবই কষ্টকর। দিনভর জাল ফেলেও হাতেগোনা কিছু ইলিশ পেয়ে আমাদের খুশি থাকতে হয়।”
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইন্সটিটিউট চাঁদপুর নদী কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও ইলিশ গবেষক ড. আনিসুর রহমান বলেন, “ইলিশ বেড়েছে, কিন্তু চাঁদপুরে কেন ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে না, এটাই সবার প্রশ্ন। চাঁদপুরে দুই-তিন বছর ধরে ইলিশ কম।”
“আমি গবেষণা করে দেখেছি, চাঁদপুরে ইলিশ চলাচলের যে রুট রয়েছে, সেখানে নদীর তীব্র নাব্য-সংকট রয়েছে। এ ছাড়া বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যা নদীর দূষিত পানির কারণও রয়েছে। সাগর থেকে যে ইলিশ আসবে, তার রাস্তাটি কেমন হতে হবে, সেটা বড় বিষয়।”
তিনি বলেন, “চাঁদপুরে ইদানিং নদী থেকে যেভাবে বালু তোলা হচ্ছে, তা খুবই অপরিকল্পিত। এটি সরাসরি ইলিশের বাস্তুতন্ত্রে আঘাত করে। এটি যে শুধু ইলিশের ডিম নষ্ট করে তা-ই নয়, এটি অন্যান্য মাছেরও ক্ষতি করে।
“বাস্তুতন্ত্রে ক্ষতির কারণে ইলিশ তাদের রুট পরিবর্তন করছে। নদীতে যেভাবে ড্রেজিং করে বালু উত্তোলন করা হয়, সেটি পরিকল্পিতভাবে হলে আমরা উপকার পাব।”
চাঁদপুর সদর উপজেলার হরিণা ফেরিঘাট সংলগ্ন মাছঘাটের প্রবীণ ইলিশ ব্যবসায়ী সিরাজুর ইসলাম বলেন, চাঁদপুরে এ বছর ইলিশের খুবই আকাল। বেকার বসে থাকতে হচ্ছে আড়তদারদের। খুব কম সংখ্যক ইলিশ পাওয়া যায়, যাতে কিছুই হয় না।
“নদীতে অনেক চর পড়েছে। সাগর থেকে নদীর যে স্থান দিয়ে ইলিশ উজানে আসে, সেখানে দুই পাশে চর। মাঝখানে যে জায়গাটুকু খালি, সেখানে অনেক জাল দিয়ে বাধাগ্রস্ত করা হয়। যার ফলে পদ্মা-মেঘনায় ইলিশ খুবই কম।”
চাঁদপুর জেলা মৎস্য সমবায় সমিতির সভাপতি আব্দুল বারি জমাদার মানিক বলেন, “বিগত কয়েক বছর চাঁদপুরে পদ্মা-মেঘনা নদীতে ইলিশের উৎপাদন অনেক কমে গেছে। বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, নদীতে চর জেগেছে, নদীর নাব্য কমে যাচ্ছে এবং সাগর থেকে যখন মেঘনায় মাছ উঠবে, সেখানে বরিশাল, হাতিয়া ও ভোলায় অসংখ্য জেলে ইলিশ আহরণ করেন। এত জেলে ও জাল পেরিয়ে মেঘনায় ইলিশ আসা খুবই দুরূহ ব্যাপার।”
তিনি বলেন, ইলিশ কমে যাওয়ার আরেকটি কারণ হচ্ছে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন। সরকার জাটকা রক্ষায় মার্চ-এপ্রিল দুই মাস এবং মা ইলিশ রক্ষায় ২২ দিন সময় নির্ধারণ করেছে। ওই সময়ও অপরিকল্পতিভাবে বালু উত্তোলন করা হয়। ডিম ছাড়ার সময় যে বালু উত্তোলন হয়, তখন ইলিশের ডিমগুলো মারা পড়ে।
“ইলিশ নোনা পানিতে ডিম ছাড়ে না। মিঠা পানিতে ডিম ছাড়ে। মিঠা পানিতে যত বেশি ডিম ছাড়বে, ততবেশি ইলিশের উৎপাদন বাড়বে। এখন আমরা দেখছি নোনা পানি অর্থাৎ সাগরে ইলিশের উৎপাদন বেড়ে যাচ্ছে এবং মিঠা পানিতে কমে যাচ্ছে। এটি ইলিশ উৎপাদনের জন্য সতর্ক বার্তা।”
এ ক্ষেত্রে ডুবোচর কাটা, নদীর পানি দূষণ কমানো ও অপরিকল্পিত ড্রেজিং বন্ধ করে মিঠা পানিতে ইলিশের বিচরণ নিশ্চিত করতে হবে বলে মনে করেন মৎস্য সমবায় সমিতির এ নেতা।
আব্দুল বারি বলেন, ইলিশের মৌসুমে স্থানীয় পদ্মা-মেঘনা নদীর ইলিশের আমদানি খুবই কম। ইলিশের মৌসুমে এখানে প্রতিদিন ঘাটে যেই পরিমাণ আমদানি হয় তার অধিকাংশ পাশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসে। মৌসুমে এই ঘাটে প্রতিদিন গড়ে পাশ্ববর্তী তথা উপকূলীয় এলাকা থেকে দুই থেকে তিন হাজার মন ইলিশ আমদানি হয়।
উপকূলীয় এলাকার তুলনায় চাঁদপুরের মাছের স্বাদ ভিন্ন হওয়ায়, এখানকার ইলিশের দাম কেজিপ্রতি দুই থেকে তিনশ টাকা বেশি হয়ে থাকে বলে জানান তিনি।
চাঁদপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা গোলাম মেহেদী হাসান বলেন, “চাঁদপুরে ইলিশের প্রাপ্যতা বাড়ে সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত। কিন্তু গত বছরের তুলনায় এ বছর ঠিক এ সময়টাতে বৃষ্টিপাত কম হওয়ার কারণে আমরা ইলিশ কিছুটা কম পাচ্ছি।
“এছাড়া নদীতে যেসব সমস্যা রয়েছে, বিশেষ করে ডুবোচর কাটা, পানি দূষণ রোধ করা এবং অপরিকল্পিত ড্রেজিং বন্ধ করতে হবে।”
তিনি বলেন, ইলিশ অভয়াশ্রম কর্মসূচির আওতায় মার্চ-এপ্রিল দুই মাস ইলিশের পোনা জাটকা রক্ষাকল্পে চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনা নদীর ৭০ কিলোমিটার এলাকায় সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকে। এছাড়া প্রতিবছর মা ইলিশ যখন সাগর থেকে মিঠা পানিতে ডিম ছাড়লে পদ্মা-মেঘনা নদীতে বিচরণ করে, তখন অম্যাবস্যার উপর ভিত্তি করে ২২ দিন সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকে।
“এ বছর ৪ অক্টোবর থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত নদীতে মাছ ধরা নিষিদ্ধ। এ সময়ে আমরা জেলেদের খাদ্য সহায়তা হিসেবে চাল দিয়ে থাকি।”
জেলা প্রশাসক অঞ্জনা খান মজলিশ বলেন, চাঁদপুরে ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধির পরিকল্পনা নিয়ে তারা কাজ করছেন।
