সত্তরের দশকের ইমরান-কপিল এবং বর্তমানের সাকিব-জাদেজা-স্টোকস, কে হবে সেরা অলরাউন্ডার?
ভিন্ন ভিন্ন সময়ের এই খেলোয়াড়দের মাঝে সেরা বাছাই করতে গেলে সে সময়কার ক্রিকেট, সে সময় ঐ খেলোয়াড়ের দলের অবস্থা এবং তিনি যাদের বিপক্ষে খেলেছেন সেসব দলের অবস্থা – এমন আরো অনেক জটিল বিষয় বিবেচনায় আনতে হবে।
তবে তুলনা যদি নিছকই পরিসংখ্যানের উপর ভিত্তি করে হয়, তবে উত্তর বের করা কিছুটা হলেও সহজ হয়ে যায়।
বিশ্লেষণ করার জন্য ১৯৭০-১৯৮০, ১৯৮০-১৯৯০, ১৯৯০-২০০০ এবং ২০০০-২০১০ দশকের অলরাউন্ডারদের বেছে নেয়া হয়েছে।
প্রাথমিক উত্তীর্ণ হবার প্রক্রিয়া
ব্যাটিং গড় ৩৫ বা এর কাছাকাছি এবং বোলিং গড় ২৫ কিংবা নিচে হতে হবে। তাছাড়া টেস্ট ও ওয়ানডেতে কমপক্ষে ১০০০রান/ ১০০উইকেটের মালিক হতে হবে।
প্রতি দশকে একজন করে মোট চারজন অলরাউন্ডার উত্তীর্ণ হবে। এই চারজন নিয়ে হবে সেমিফাইনাল।
ওরা চারজন- ফ্যাভ ফোরের যুগ
'ফ্যাভ ফোররের' সদস্য ইমরান খান, কপিল দেব, রিচার্ড হেডলি ও ইয়ান বোথাম। এ চারজনের মাঝে একজনকে বাছাইয়ের পরিসংখ্যান নিম্নরূপ।
|
অলরাউন্ডার |
টেস্ট ব্যাটিং গড় |
ওয়ানডে ব্যাটিং গড় |
টেস্ট ও ওয়ানডে মিলিয়ে ব্যাটিং গড় |
টেস্ট বোলিং গড় |
ওয়ানডে বোলিং গড় |
টেস্ট ও ওয়ানডে মিলিয়ে বোলিং গড় |
|
ইমরান খান |
৩৭.৬৯ |
৩৩.৪১ |
৩৫.৫৫ |
২২.৮১ |
২৬.৬২ |
২৪.৭১ |
|
কপিল দেব |
৩১.০৫ |
২৩.৭৯ |
২৭.৪২ |
২৯.৬৫ |
২৭.৪৫ |
২৮.৫৫ |
|
রিচার্ড হেডলি |
২৭.১৭ |
২১.৬২ |
২৪.৪০ |
২২.৩০ |
২১.৫৬ |
২১.৯৩ |
|
ইয়ান বোথাম |
৩৩.৫৫ |
২৩.২২ |
২৮.৩৯ |
২৮.৪০ |
২৮.৫৪ |
২৮.৪৭ |
*সকল পরিসংখ্যান ইএসপিএন ক্রিকইনফো থেকে সংগৃহীত
পরিসংখ্যান অনুযায়ী স্যার রিচার্ড হেডলি বোলিং অলরাউন্ডার হিসেবে এগিয়ে আছেন। অবাক করার বিষয় হেডলির টেস্ট ও ওয়ানডের বোলিং গড় ডেইল স্টেইন থেকেও ভালো। স্টেইনের টেস্ট ও ওয়ানডে বোলিং গড় যথাক্রমে ২২.৯৫ ও ২৫.৯৬, যেখানে হেডলির ২১.৬২ ও ২৪.৪০।
তবে অলরাউন্ড নৈপুণ্যে ফ্যাভ ফোরদের মাঝে এগিয়ে আছেন ইমরান খান। তার ব্যাটিং গড় ৩৫ এর উপরে এবং বোলিং গড় ২৫ এর নিচে।
এখানে আরেকটি মজার বিষয় হলো ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা বোলার ওয়াসিম আকরাম থেকে ইমরান খানের বোলিং গড় ভালো। ওয়াসিমের গড় ২৩.৬২, আর ইমরানের ২২.৮১।
বাউন্সার ও কভার ড্রাইভের যুগ
৮০ ও ৯০ ফ্যাভ ফোরের মতো প্রতাপশালী কোনো অলরাউন্ডার পাওয়া যায়নি। যারা ছিল তারাও হয় ব্যাটিং-অলরাউন্ডার, নয় বোলিং-অলরাউন্ডার।
ওয়াসিম, ওয়াকার, কার্ল হুপার, এম্ব্রোজ ও রবি শাস্ত্রী অন্যতম এই তালিকায়। এদের মধ্যে ওয়াকার ইউনিস ও কার্টলি এম্ব্রোজ পুরোপুরি বোলার ছিলেন। আকরাম মূলত বোলার হলেও তার ব্যাটিং ক্যারিয়ারে কিছু সেঞ্চুরি আছে, জিম্বাবুয়ের বিরুদ্ধে তার ডাবল সেঞ্চুরিও আছে।
|
অলরাউন্ডার |
টেস্টে ব্যাটিং গড় |
ওয়ানডে ব্যাটিং গড় |
টেস্ট ও ওয়ানডে মিলিয়ে ব্যাটিং গড় |
টেস্ট বোলিং গড় |
ওয়ানডে বোলিং গড় |
টেস্ট ও ওয়ানডে মিলিয়ে বোলিং গড় |
|
রবি শাস্ত্রী |
৩৫.৭৯ |
২৯.০৫ |
৩২.৪২ |
৪০.৯৭ |
৩৬.০৫ |
৩৮.৫১ |
|
ওয়াসিম আকরাম |
২২.৬৪ |
১৬.৫২ |
১৯.৫৮ |
২৩.৬২ |
২৩.৫৩ |
২৩.৫৭ |
|
কার্ল হুপার |
৩৬.৪৭ |
৩৫.৩৫ |
৩৫.৯১ |
৪৯.৪৩ |
৩৬.০৫ |
৪২.৭৪ |
*সকল পরিসংখ্যান ইএসপিএন ক্রিকইনফো থেকে সংগৃহীত
বোলিং ও ব্যাটিং গড় অনুযায়ী ওয়াসিম ও রবি শাস্ত্রী কাছাকাছি। ওয়াসিম বোলিং গড়ে এগিয়ে অপরদিকে রবি শাস্ত্রী ব্যাটিংয়ে এগিয়ে আছেন। দুইজনই টেস্ট ক্রিকেটে সর্বোচ্চ স্কোর ২০০+
তাহলে এই দশকে কে সেরা? উত্তরটা ম্যাচ সেরা হওয়ার সংখ্যা দেখলে স্পষ্ট হবে।
ফরম্যাট |
ওয়াসিম আকরাম |
রবি শাস্ত্রী |
|
টেস্ট |
১৭ |
৬ |
|
ওয়ানডে |
২১ |
৮ |
|
মোট |
৩৮ |
১৪ |
*সকল পরিসংখ্যান ইএসপিএন ক্রিকইনফো থেকে সংগৃহীত
ম্যাচ সেরা অনুযায়ী ৮০ ও ৯০ দশকের অলরাউন্ডারদের দৌড়ে জিতে গেলেন পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক ওয়াসিম আকরাম।
অলরাউন্ডারদের যুগ
৯০ থেকে ২০০০ সময়টা ছিল অলরাউন্ডারদের স্বর্ণ যুগ। প্রত্যেক দলেই ম্যাচ জেতানোর মতো অলরাউন্ডার ছিল। কোনো কোনো দলে দুজন কিংবা তিন জন অলরাউন্ডারও একসাথে খেলতো।
তবে ১০০০ রান ও ১০০ উইকেটের কোটায় খ্যাতনামারা বাদ পড়েছেন অনেকেই। যারা বোলিং ও ব্যাটিং দুই ক্ষেত্রেই অবদান রেখেছেন তাদের পরিসংখ্যান নিম্নরূপ:
|
অলরাউন্ডার |
টেস্ট ব্যাটিং গড় |
ওয়ানডে ব্যাটিং গড় |
টেস্ট ও ওয়ানডে মিলিয়ে ব্যাটিং গড় |
টেস্ট বোলিং গড় |
ওয়ানডে বোলিং গড় |
টেস্ট ও ওয়ানডে মিলিয়ে বোলিং গড় |
|
ক্রিস কেয়ার্নস |
৩৩.৫৪ |
২৯.৪৬ |
৩১.৫ |
২৯.৪০ |
৩২.৮১ |
৩১.১১ |
|
শন পোলক |
৩২.৩২ |
২৬.৪৬ |
২৯.৩৯ |
২৩.১২ |
২৪.৫১ |
২৩.৮২ |
|
জ্যাকস ক্যালিস |
৫৫.৩৭ |
৪৪.৩৬ |
৪৯.৮৭ |
৩২.৬৫ |
৩১.৭৯ |
৩২.২২ |
|
এন্ড্রু ফ্লিনটফ |
৩১.৭৮ |
৩২.০২ |
৩১.৯ |
৩২.৭৯ |
২৪.৩৮ |
২৮.৫৯ |
*সকল পরিসংখ্যান ইএসপিএন ক্রিকইনফো থেকে সংগৃহীত
চারজনের মাঝে জ্যাক ক্যালিস ও এন্ড্রু ফ্লিনটফ পরিসংখ্যানে এগিয়ে আছেন। তবে দুজন থেকে কেবল একজই যেতে পারবেন সেমিফাইনালে।
এজন্য দুজনের সেঞ্চুরির একটি হিসাব করা যেতে পারে। আবার ম্যাচসেরা হবার সংখ্যাও গুরুত্বপূর্ন।
সেঞ্চুরি ও ম্যাচ সেরার সংখ্যায় জ্যাক ক্যালিস এগিয়ে। টেস্ট ও ওয়ানডে মিলিয়ে ক্যালিস তিনের ঘরে পৌঁছেছেন ৬২ বার এবং সিরিজ সেরা হয়েছেন ৫৫ বার। অপরদিকে ফ্লিনটফ করেছেন ৮টি সেঞ্চুরির সাথে ম্যাচ সেরা ২০ বার।
অর্জন |
জ্যাক ক্যালিস |
এন্ড্রু ফ্লিনটফ |
|
টেস্ট ও ওয়ানডে মিলিয়ে মোট শতক |
৬২ |
৮ |
|
টেস্ট ও ওয়ানডে মিলিয়ে মোট ম্যাচ সেরা |
৫৫ |
২০ |
*সকল পরিসংখ্যান ইএসপিএন ক্রিকইনফো থেকে সংগৃহীত
পুনর্জন্ম
বিগত দশকের মাঝামাঝি থেকে একেরপর এক অলরাউন্ডার অবসর গ্রহণ শুরু করেন। ২০০৫ পরবর্তী ক্রিকেটের দুই ফরম্যাটেই পূর্বেকার মতো প্রতিযোগিতার দেখা মিলেনি।
তবে দশকের তীরে এসে আগেকার অলরাউন্ডারদের ঝলক দেখা শুরু করে ক্রিকেট ভক্তরা। ক্রিকেট বিশ্ব আবিষ্কার করে নতুন নক্ষত্র সাকিব আল হাসান। একে একে স্টোকস, ওয়োকস, অশ্বিন, জাদেদা, নবী, রশিদরা এই তালিকায় যোগ হন। ওয়ানডেতে ১০০ উইকেটের শর্ত পূরণ করতে না পারায় এই তুলনা থেকে শুরুতেই বাদ পড়বেন এ সময়কার সেরা অলরাউন্ডারদের একজন, বেন স্টোকস।
অলরাউন্ডার |
টেস্ট ব্যাটিং গড় |
ওয়ানডে ব্যাটিং গড় |
টেস্ট ও ওয়ানডে মিলিয়ে ব্যাটিং গড় |
টেস্ট বোলিং গড় |
ওয়ানডে বোলিং গড় |
টেস্ট ও বোলিং মিলিয়ে গড় |
|
সাকিব আল হাসান |
৩৯.৫০ |
৩৭.৯৩ |
৩৮.৭২ |
৩১.৩১ |
২৯.৪৪ |
৩০.৩৮ |
|
রবিন্দ্র জাদেজা |
৩৩.৭৭ |
৩২.৫৮ |
৩৩.১৮ |
২৫.৮৫ |
৩৭.৩৬ |
৩১.১০ |
|
ক্রিস ওয়োকস |
২৭.৬৭ |
২৫.৭৮ |
২৬.৭৩ |
২৯.৯০ |
২৯.৪৬ |
২৯.৬৮ |
|
জেসন হোল্ডার |
৩০.৯৬ |
২৪.৭৭ |
২৭.৮৭ |
২৭.১২ |
৩৭.৩১ |
৩২.২৩ |
*সকল পরিসংখ্যান ইএসপিএন ক্রিকইনফো থেকে সংগৃহীত
যোগ্যতম প্রতিযোগির সন্ধান করতে গেলে এখানে পরিসংখ্যান বলে দুই-ফরম্যাটেই সাকিব। ২৯ বার ম্যাচ সেরা হয়ে তিনি প্রথম, ১৭ বারে দ্বিতীয় অবস্থান জাদেজার।
সেমিফাইনাল
পরিসংখ্যানের দৌড়ে শেষ চারে ইমরান-ক্যালিস ও ওয়াসিম-সাকিব।

ইমরান বনাম ক্যালিস
অর্জন |
ইমরান খান |
জ্যাক ক্যালিস |
|
টেস্ট জয়ে অবদান (%) |
১২.৫% ↓ |
১৩.২৫% ↑ |
|
ওয়ানডে জয়ে অবদান (%) |
৭.৪৩% ↓ |
১০.০৬% ↑ |
|
দলীয় মোট রানে অবদান (%) |
৯.৮৩% ↓ |
১৫.৩% ↑ |
|
দলীয় মোট উইকেটে অবদান গড় (%) |
২১.০৩% ↑ |
১০.৪৭% ↓ |
|
দুই ইনিংসে শতক ও দশ উইকেট |
১ বার ↑ |
০০ ↓ |
|
ব্যাটিং গড় > ৩৫ বোলিং গড় < ২৫ |
✓↑ |
×↓ |
*সকল পরিসংখ্যান ইএসপিএন ক্রিকইনফো থেকে সংগৃহীত
সেমিফাইনালে দুজন দুই প্রজন্মের। ইমরান ও ক্যালিসের মধ্যে সমানে-সমান লড়াই দেখা যায়। ব্যাটিংয়ে খান ক্যালিসের ধারে-কাছেও নেই এবং বোলিংয়ে ক্যালিস জোজন জোজন পিছিয়ে।
ক্যালিস পুরো ক্যারিয়ার জুড়েই সমান তালে রান ও উইকেট বজায় রেখেছেন। তবে শেষের দিকে ব্যাটে-বলে গড় কিছুটা কমে যায়।
অপরদিকে ক্যারিয়ারের শেষ ৫০ টেস্টে ইমরান ব্যাটিং গড় ৫১, বোলিংয়ে ১৯, যথাক্রমে গাভাস্কার ও ম্যাকগ্রার সমান!
তাছাড়া ব্যাটিং গড় ৩৫ এর উপরে আর বোলিং গড় ২৫ এর নিচে, এই শর্তে বোলিং গড়ে আটকে গেছেন ক্যালিস।
ইমরান সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডারের পরিসংখ্যান তুলনায় ফাইনালে পৌঁছে গেলেন।
সাকিব বনাম ওয়াসিম
অর্জন |
সাকিব আল হাসান |
ওয়াসিম আকরাম |
|
টেস্ট জয়ে অবদান (%) |
৫.৫০% ↓ |
৭.১৪%↑ |
|
ওয়ানডে জয়ে অবদান (%) |
১১.৩৩% ↑ |
৯.৭৩%↓ |
|
দলীয় মোট রানে অবদান (%) |
১৪.০৭% ↑ |
৬.৩৭%↓ |
|
দলীয় মোট উইকেটে অবদান গড় (%) |
২২.৩৮% ↑ |
১৮.৮০%↓ |
|
দুই ইনিংসে শতক ও দশ উইকেট |
১ বার ↑ |
০০↓ |
|
ব্যাটিং গড় > ৩৫ বোলিং গড় < ২৫
|
কাছাকাছি ↑ |
পিছিয়ে ↓ |
*সকল পরিসংখ্যান ইএসপিএন ক্রিকইনফো থেকে সংগৃহীত
সাকিব পরিসংখ্যানের সব দিক থেকেই ওয়াসিম আকরাম থেকে এগিয়ে। বাংলাদেশ ক্রিকেট দল সাকিবের পারফরম্যান্সের উপর নির্ভরশীল। বড় মঞ্চে পারফরমেন্স কিংবা ম্যাচজয়ী পারফরম্যান্সেও সাকিব ওয়াসিমের চেয়ে যোজন যোজন এগিয়ে।
তাই সেরা অলরাউন্ডারের দৌড়ে ফাইনালে মোকাবেলা হবে সাকিব আল হাসান বনাম ইমরান খানের।
ফাইনাল
কল্পনা করা যাক - মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে সাকিব-ইমরান মুখোমুখি। ৮০'র দশকের ইমরান ১৫০ কি.মি. প্রতি ঘণ্টায় বল ছোড়ার জন্য দৌড়ে আসছেন।
ব্যাটিংয়ে সাকিব। অফ স্টাম্পের বল রিভার্স হয়ে ধেয়ে আসছে মিডল অ্যান্ড লেগে। সাকিব শট খেলার জন্য ব্যাট চালালেন। কী হতে পারে ফলাফল?
পরিসংখ্যান সব সামনেই আছে। পাঠক, পরিসংখ্যান পাঠে সেরার আসনে কে বসবে সেই সিদ্ধান্ত আপনার।
mohd.imranasifkhan@gmail.com

.jpg)
