ইভেন্ট ম্যানেজারদের সুদিন আর নেই

মহামারির কারণে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি ও সংশ্লিষ্ট সেবা খাতের দুরবস্থা


সাইফ উদ্দিন | Published: September 14, 2021 09:41:48 | Updated: September 14, 2021 17:39:14


- ফাইল ছবি

গান-বাজনা, ফটো শুটিং, জমকালো পোশাকে অতিথিদের গুঞ্জন এবং মজাদার খাবার পরিবেশন করা- এমনই ছিল তাদের ব্যবসার পরিবেশ। তবে ইভেন্ট ম্যানেজারদের এমন উৎসবমুখর দিনগুলো চলে গেছে।

শাটার বন্ধ কিংবা অর্ধেক খোলা, কর্মচারীদের বেকারত্ব- এভাবেই অসংখ্য ইভেন্ট-ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি এবং অন্যান্য অনেক খাতে বিস্তৃত সহায়ক পরিষেবাগুলো করোনার মহামারির ভারি মূল্য পরিশোধ করছে।

বাংলাদেশ এবং বিশ্ব জুড়ে অতিমারীর কারণে কর্পোরেট ফাংশন, ট্রেড শো, জাঙ্কেট এবং এর মতো অনুষ্ঠানগুলো এখনও সামাজিক দূরত্বের নিয়মকানুনের অধীনে চাপা পড়ে আছে।

ব্যবসায়িক চক্রের সূত্র থেকে জানা যায়, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের সাথে একত্র হয়েছে ইভেন্ট-ম্যানেজমেন্ট সেবা খাত, যে শিল্পটির একক সর্বনিম্ন মূল্য অন্তত ৩,০০০ কোটি টাকা।

এ শিল্পের বেশ ভালো গতিতে বৃদ্ধির সম্ভাবনা ছিল, কিন্তু সর্বত্র স্বাভাবিক শৃঙ্খলা বিপর্যস্ত করে ২০২০ সালে সার্স-কোভ-২ ভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট কোভিড-১৯ এ জাতীয় ব্যবসাগুলোকে একটি চোরা আঘাত করেছে।

বিশ্বের সবকিছুই এখন আবার খুলতে শুরু করেছে, আর তার সাথে বাংলাদেশও। কিন্তু ভাইরাসের সংক্রমণের ফলে নেমে এসেছে মন্দা। তাই দৈনন্দিন জীবন ও ব্যবসা-বাণিজ্য নিউ নরমাল অনুযায়ী চলার জন্য তুলে নেয়া হয়েছে দীর্ঘ লকডাউন।

সামাজিক সমাবেশগুলো অন্য সবকিছু এখনই খোলা হচ্ছে, কেননা পৃথিবীর উপর মারাত্মক করোনাভাইরাসের ঝুঁকি এখনও বহাল রয়েছে। যার কারণে ইভেন্ট ম্যানেজারদের কাজ এখন খুবই কম। তারা প্রণোদনা প্যাকেজগুলোর প্রবেশাধিকারসহ বিদেশী ব্যবসার সাথে বিজনেস-টু-বিজনেস (বিটুবি) কাজের অধিকার দাবির মাধ্যমে একটি নবোত্থিত শিল্প হিসাবে এই ব্যবসাকে বাঁচিয়ে তোলার উপায় খুঁজতে সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করছে।

সূক্ষ্মভাবে বিচার করলে দেখা যায়, এই ব্যবসাগুলো কর্পোরেট এবং সামাজিক উভয় ইভেন্টের উপর নির্ভর করে। ব্যবসাগুলো এখন মারাত্মক আর্থিক সংকটে পঙ্গু হয়ে পড়েছে, কারণ ২০২০ সালের মার্চে দেশে মহামারি ছড়িয়ে পড়ার সময় থেকে বড় আকারের সকল কর্মসূচি এবং জনসমাগম প্রায় অচল হয়ে গিয়েছে।

ইভেন্ট-ম্যানেজমেন্টের প্রচুর সংখ্যক সহযোগী ব্যবসাগুলোর উপরও দুর্ভাগ্য নেমে আসে, যার মধ্যে রয়েছে লজিস্টিকস, খাবারদাবার, সাজসজ্জা, আলোকচিত্রী, ছাপাখানা, বিনোদন খাত এবং পরিবহন ইত্যাদি।

যদিও বড় ইভেন্ট-ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিগুলো কোনোভাবে তাদের মূলধন নিয়ে টিকে থাকতে পেরেছে, কিন্তু ছোট ব্যবসাগুলো ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পথে বলে জানায় শিল্প-অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো।

তারা বলছেন যে, ৩০০টিরও বেশি বড় এবং ছোট সংস্থা রয়েছে, যার বাজার আকার সর্বনিম্ন ২,৫০০ থেকে ৩,০০০ কোটি টাকা; যা প্রায় ৫ লক্ষ মানুষের জন্য প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে।

তারা আরও বলেছেন, গত বছর মহামারির এক ধাক্কায় অনেকগুলো পূর্বনির্ধারিত ইভেন্ট বাতিল করতে হয়েছিল, যা ব্যবসায়িক পরিচালনায় তাদের আর্থিক ক্ষতিকে বাড়িয়ে তোলে।

দীর্ঘস্থায়ী মহামারির কারণে, সামাজিক জমায়েতে সরকারের আরোপিত বিধিনিষেধ মেনে গত দেড় বছরে ট্রেড শো, প্রদর্শনী, চামড়ার মেলা, পোশাক এবং প্লাস্টিক খাতের মতো কোনো বড় কর্পোরেট ইভেন্ট অনুষ্ঠিত হয়নি।

ইভেন্ট-ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিগুলোতে বিপুল সংখ্যক লোক তাদের চাকরি হারিয়েছিল বা তাদের ছাঁটাই হয়েছিল, অনেকের বেতনও কাটা হয়েছিল।

এএসকে ট্রেড অ্যান্ড এক্সিবিশন প্রাইভেট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক টিপু সুলতান ভূঁইয়া বলেন, "আমাদের অফিস এখন পুরোপুরি বন্ধ, যেহেতু আমরা কোনো আসন্ন ইভেন্ট ঘোষণা করতে পারছি না, এবং পাশাপাশি এগুলোর প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রমও চালাতে পারছি না।"

তিনি হতাশার সুরে বলেন, প্রায় সমস্ত কার্যক্রম কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে, কারণ কখন সামগ্রিক পরিস্থিতি এসব কর্পোরেট ইভেন্ট আয়োজনের জন্য অনুকুলে আসবে, এটি সম্পূর্ণ অনিশ্চিত।

পোশাক, চামড়া, এবং মুদ্রণখাত সহ বিভিন্ন স্থানীয় শিল্পকে উন্নীত করতে কোম্পানিটি বাংলাদেশে ছয়টি বৃহৎ বাণিজ্য শো আয়োজন করে। এর মধ্যে, গত বছরের জানুয়ারিতে শুধুমাত্র একটি এক্সপো অনুষ্ঠিত হয়, এবং এ বছর এখন পর্যন্ত কোনোটিই প্রদর্শিত হয়নি।

টিপু সুলতান ভূঁইয়া বলেন, "আমাদের প্রদর্শকদের কাছ থেকে প্রচুর জিজ্ঞাসাবাদ আসছে। কিন্তু, কোনো অনুমতি না আসায় এটি আমাদের কর্মচারীদের বেতনের টাকা সহ সকল দিক দিয়েই আমাদেরকে সম্পূর্ণ অনিশ্চিত করে রেখেছে"।

তার ফার্মে কর্মচারী ছাঁটাইয়ের কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, কোম্পানি ২০২০ সালে উপার্জন না থাকা সত্ত্বেও অনেক মাস ধরে বেতন দিতে থাকে।

তিনি সংশ্লিষ্ট পরিষেবাগুলোকে ইঙ্গিত করে বলেন, "সাধারণত একটি ইভেন্ট-ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি তার নিজস্ব কর্মীদের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে থাকে"।

সূত্রমতে, ২০০০ সালের পর, পেশাদার ইভেন্ট আয়োজকরা দারিদ্র্য বা এলডিসি থেকে উন্নতি করার প্রচেষ্টারত এই দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে তাল মিলিয়ে ব্যাপক মনোযোগ আকর্ষণ করতে শুরু করে।

ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের মূলত দুটি ধারা রয়েছে। একটিতে রয়েছে এজিএম, বাণিজ্যিক শো, নতুন পণ্য চালুকরণ, সেমিনার এবং মার্কেট অ্যাক্টিভেশনের মতো কর্পোরেট প্রোগ্রাম, আর অন্যটিতে রয়েছে সামাজিক কর্মসূচী, যেমন- বিবাহ, জন্মদিন, কনসার্ট, মিলনসভা ইত্যাদি।

ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের আগপর্যন্ত সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই খাতটি প্রায় ১৫ শতাংশ বার্ষিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছিল।

যদিও কিছু কর্পোরেট সরকার কর্তৃক আরোপিত নিষেধাজ্ঞার দিনগুলোতে সীমিত আকারে সচেতনতা বৃদ্ধির প্রচারণা এবং অন্যান্য কার্যক্রম চালায়, কিন্তু এসব একটি ব্যবস্থাপনা সংস্থার বেঁচে থাকার জন্য যথেষ্ট ছিল না বলে জানান একজন অভিজ্ঞ পেশাদার।

কর্পোরেট ইভেন্ট এবং মার্কেট অ্যাক্টিভেশনে বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান ইমেজ এক্সপেরিয়েন্সিয়াল মার্কেটিং লিমিটেডের (আইইএমএল) জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক রাসেল আলী মণ্ডল বলেন, "ইভেন্ট-ম্যানেজমেন্ট সেক্টর অবশ্যই চলমান মহামারির সবচেয়ে দুর্ভাগা শিকার।

তিনি বলেছেন যে, ইভেন্ট-ম্যানেজমেন্টের বেশ কয়েকটি সংস্থাকে ইতিমধ্যেই এই খাতটি ছেড়ে দিতে হয়েছে, কারণ এটি এখনও অনিশ্চিত যে, কখন সবকিছু মহামারি-পূর্ব সময়ের মতো স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে, যদিও সাম্প্রতিক সময়ে সবকিছু আবার শুরু হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, "আমি অন্যান্য কোম্পানির অনেক বন্ধুকে চিনি, যারা তাদের চাকরি টিকিয়ে রাখতে পারেনি, কারণ নিয়োগকর্তাদের পক্ষে উপার্জন ছাড়া চালিয়ে বেতন যাওয়া সম্ভব নয়।"

টিকে থাকার পদক্ষেপের উদাহরণ দিয়ে রাসেল মণ্ডল বলেন আইইএমএলকে বাঁচিয়ে রাখার মরিয়া চেষ্টায় এটিকে অভিজাত এলাকা থেকে তার মূল সংগঠন ইমেজ গ্রুপের তেজগাঁওয়ে অবস্থিত প্রধান কার্যালয়ে স্থানান্তর করতে হয়েছিল।

বাংলাদেশ এক্সিবিশন্স প্রাইভেট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী মোঃ সাখাওয়াত হোসেন বলেন, প্রস্তুতি সত্ত্বেও, ইভেন্ট-ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিগুলোকে ২০২০ সালের প্রথম দিকে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের জন্য শতাধিক ট্রেড শো এবং ম্যাচমেকিং প্ল্যাটফর্ম বাতিল করতে হয়েছিল।

তিনি বলেন, "আমার মতো উঠতি উদ্যোক্তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত, কারণ মহামারিটি আমাদের জন্য বিনামেঘে বজ্রপাতের মতো হাজির হয়েছিল।"

তিনি আরও বলেন, অন্যান্য অনেক ব্যবসার মতো, ইভেন্ট-আয়োজক সংস্থাগুলো আগের সক্রিয়তা ফিরে পেতে পারেনি, কারণ একটি প্রোগ্রামকে সফল করতে দীর্ঘ সময়, পরিকল্পনা, যোগাযোগ এবং সমন্বয় প্রয়োজন হয়।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মাধ্যমে অর্থনীতিতে অবদান থাকা সত্ত্বেও তারা করোনা পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সরকার কর্তৃক প্রবর্তিত প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে কোনো আর্থিক সহায়তা পায়নি।

শেখ সোহেল নামক একজন পেশাদার আলোকচিত্রী বলেন, এক দশকেরও বেশি সময়ের ক্যারিয়ারে তিনি এমন দুরবস্থা দেখেননি।

তিনি বলেন, "এখন খুব সীমিতসংখ্যক কর্পোরেট বা সামাজিক ইভেন্ট রয়েছে, যেগুলো ফটোগ্রাফি এবং সংশ্লিষ্ট পরিষেবাগুলোর আয়োজন করে"। পারিশ্রমিকও সাধারণ সময়ের থেকে প্রায় এক-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে।

লকডাউন ব্যতীত সময়গুলোতে খুবই অল্প কিছু সামাজিক অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়, যেগুলোতে অতিথিদের সংখ্যা ন্যূনতম থাকে এবং বেশ কঠোর সময়সূচীর মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়। যে কারণে ক্যামেরায় মুহূর্তগুলো সহজেই ধারণ করা তাদের জন্য চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়ায়।

দেশের অর্থনীতিতে প্রধান বাণিজ্যিক শো আয়োজকদের ভূমিকা তুলে ধরে এএসকে ট্রেডের টিপু সুলতান ভূঁইয়া বলেন, সরকারের উচিত আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্য সংক্রান্ত (বিটুবি) বাণিজ্যিক শো আয়োজনের অনুমতি দেওয়া এবং এভাবে স্থানীয় শিল্পকে নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে মানিয়ে নিতে সাহায্য করা যাবে।

এছাড়া, প্রদর্শনী আয়োজকদের হলের ভাড়া বা ভর্তুকিতে কিছু ছাড় প্রদান করা উচিত এবং অনুষ্ঠানের স্থানগুলোর জন্য ভাড়া হ্রাস করা উচিত।

Share if you like