ইনক্রেডো সুগার: চিনির চেয়েও মিষ্টি এক স্বাস্থ্যকর 'চিনি'!


মোঃ ওমর ফারুক তপু | Published: March 29, 2022 18:17:12


ইনক্রেডো সুগার: চিনির চেয়েও মিষ্টি এক স্বাস্থ্যকর 'চিনি'!

মিষ্টি যেকোনো খাবারেই দরকার পড়ে চিনির। কিন্তু চিনিতে যে পরিমাণ শর্করা থাকে, তা শরীরে জমে স্থূলতা বাড়ায়। আবার চিনির বিকল্প হিসেবে অন্য মিষ্টিকারক উপাদান ব্যবহার করলে তাতে চিনির মতো স্বাদ পাওয়া যায় না। কিন্তু যদি এমন হতো যে চিনির স্বাদে কোনো পরিবর্তন আসবে না তবে এতে থাকা শর্করার পরিমাণ কমে যাবে, তাহলে কেমন হতো?

শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও এমনই এক চিনি আবিষ্কার হয়েছে ইসরায়েলি কোম্পানি ড্যুমাটোকে। হিব্রু ড্যুমাটোক শব্দের অর্থ দ্বিগুণ মিষ্টি।

২০১৩ সালে ইসরায়েলের ৯৫ বছর বয়সী বিজ্ঞানী আভ্রাহাম বেনিয়েল ইনক্রেডো স্যুগার নামের এ চিনি আবিষ্কার করেন, যা সমপরিমাণ সাধারণ চিনির তুলনায় দ্বিগুণ মিষ্টি। মূলত এরপরই তিনি তার ছেলে এরান বেনিয়েলের সাথে ড্যুমাটোক কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন।

আভ্রাহাম বেনিয়েল সর্বপ্রথম কম চিনি দিয়ে একই পরিমাণ মিষ্টিযুক্ত খাবার কীভাবে বানানো যায় তা নিয়ে চিন্তা শুরু করেন ১৯৪৪ সালে। তিনি তখন সবেমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা সমাপ্ত করে বেরিয়েছেন। তার প্রতিবেশী ছিলেন একজন স্কুল শিক্ষক যিনি অভিযোগ করেছিলেন যে বাচ্চারা অধিক মিষ্টিযুক্ত খাবার খাওয়ার কারণে শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ দিতে পারছে না। কারণ চিনিতে শর্করার পরিমাণ বেশি থাকায় তা শরীরকে অবসন্ন করে দেয়।

এরপর অনেক বছর পেরিয়ে গেলেও আভ্রাহাম বেনিয়েল এ নিয়ে আর কোনো চিন্তা বা গবেষণা করেননি। কিন্তু ২০০১ সালে যখন তিনি ইসরায়েলের একটি শীর্ষ চিনি ও মিষ্টান্ন উৎপন্নকারী প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন, তখন সে কোম্পানির একটি জরুরি মিটিং ডাকা হয়। মিটিংয়ের কারণ ছিলো, তারা চিনির বিকল্প উপাদান ব্যবহার করে অধিক পুষ্টিগুণসম্পন্ন মিষ্টান্ন উৎপাদন করেছিলেন কিন্তু তাদের পণ্য বাজারে সাফল্য পাচ্ছিলো না। শিশু থেকে বয়স্ক কোনো বয়সের মানুষই তাদের পণ্য কিনতে আগ্রহ প্রকাশ করছিলো না।

এ মিটিং থেকে বেনিয়েল প্রায় ৬০ বছর আগের ঘটনার যোগসূত্র খুঁজে পান। তিনি পুনরায় চিন্তা করা শুরু করেন যে, চিনির মিষ্টতা কী এমনভাবে বাড়ানো সম্ভব কি না যাতে করে তা থেকে একই রকম স্বাদ পাওয়া যাবে এবং গ্রাহকরা তা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকবে।

প্রায় ১২ বছর ধরে চিনি নিয়ে গবেষণা করার পর ২০১৩ সালে তিনি সর্বপ্রথম চিনির মিষ্টতা কিছু পরিমাণে বৃদ্ধি করতে সক্ষম হন। তিনি তার এই গবেষণার প্রুফ অফ কন্সেপ্ট শীর্ষস্থানীয় কিছু খাদ্যপ্রস্তুতকারী কোম্পানিকে প্রদর্শন করেন। তারা তার এই গবেষণার ফলাফল দেখে জানায় যে, খাদ্য এবং পানীয় শিল্পে চিনি এবং লবণ স্বাস্থ্যজনিত সমস্যার সাথে সবচেয়ে বেশি জড়িত। এর মধ্যে কোনো একটি সমাধান করা সম্ভব হলে সে আবিষ্কারের বিপুল পরিমাণ সম্ভাবনা রয়েছে।

আভ্রাহাম বেনিয়েল তার এ গবেষণা চালিয়ে যেতে থাকেন এবং চিনির মিষ্টতা প্রায় ৪০ শতাংশ বাড়াতে সক্ষম হন। অর্থাৎ কোনো মিষ্টান্ন প্রস্তুতিতে যদি ২ কেজি সাধারণ চিনির প্রয়োজন হয়, সেখানে বেনিয়েলের ইনক্রেডো সুগার লাগবে মাত্র ১ কেজি। অর্থাৎ খাবারে আগের মতোই মিষ্টি স্বাদ পাওয়া যাবে কিন্তু শর্করার পরিমাণ অর্ধেকে নেমে আসবে। সহজ কথায় ইনক্রেডো সুগার সাধারণ চিনির তুলনায় দ্বিগুণ স্বাস্থ্যকর!

ইনক্রেডো সুগার আবিষ্কারের ঠিক পরের বছর অর্থাৎ ২০১৪ সালে ৯৬ বছর বয়সে আভ্রাহাম বেনিয়েল তার ছেলে এরান বেনিয়েলকে নিয়ে ইসরায়েলের পেটাহ টিকভাতে ড্যুমাটোক কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। শুরুতে এ কোম্পানি শুধুমাত্র মিষ্টিজাতীয় খাবারের মানোন্নয়নে মনোযোগী থাকলেও বর্তমানে তারা সকল প্রকার খাদ্যদ্রব্যের পুষ্টিমান উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে।

কিন্তু প্রশ্ন আসতে পারে যে, চিনিতে থাকা গ্লুকোজ শরীরে শক্তি উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হওয়ার পরও কেন খাবারে চিনির পরিমাণ কমানো প্রয়োজন?

চিনি থেকে পাওয়া গ্লুকোজ শরীরে শক্তি উৎপাদনে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হলেও অতিরিক্ত গ্লুকোজ শরীরে জমে থেকে স্থূলতা বৃদ্ধিসহ আরো নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু অতিরিক্ত চিনি সেবন করা থেকে বিরত থাকাও সহজ নয়। তৈরিকৃত মোট খাবারের ৭১ শতাংশেই চিনির ব্যবহার হয়ে থাকে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী, একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি দিনে ৫ থেকে ১০ চা চামচ (প্রায় ৫০ গ্রাম) চিনি সেবন করলে তা কোনোরূপ স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করবে না। কিন্তু সাধারণ যে কোনো ব্যক্তি এ পরিমাণের চেয়ে অনেক বেশি চিনি প্রতিদিন বিভিন্নভাবে সেবন করে থাকে।

এ অতিরিক্ত চিনি শরীরে বিভিন্ন সমস্যার সৃষ্টি করে থাকে। ২০১৪ সালে জামা ইন্টারনাল মেডিসিন প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়, প্রতিদিনের ক্যালরির শতকরা ৮ থেকে ১০ ভাগ চিনি থেকে গ্রহণ করে এমন ব্যক্তিদের তুলনায়, প্রতিদিন ১৭ থেকে ২১ ভাগ ক্যালরি চিনি থেকে গ্রহণ করে এমন ব্যক্তিরা ৩৮ শতাংশ বেশি হৃদযন্ত্রের রোগে আক্রান্ত হয়।

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টিবিজ্ঞান বিষয়ের অধ্যাপক ডক্টর ফ্র্যাঙ্ক হু এ বিষয়ে বিগথিংককে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, যত বেশি পরিমাণ অতিরিক্ত চিনি খাওয়া হবে, তত বেশি হৃদরোগের সম্ভাবনা বাড়বে।

চিনি যে শুধুমাত্র হৃদযন্ত্রের সমস্যা সৃষ্টিতে দায়ী তা নয়। চিনি লিভারে অ্যালকোহলের মতো বিপাক হয়। বেশিরভাগ অ্যালকোহল জাতীয় পানীয়তেই অতি উচ্চ পরিমাণে চিনি থাকে। এই চিনি পরবর্তীতে চর্বিতে রূপান্তরিত হয়। যা অনেক সময় লিভারে যেয়ে জমা হয়। এছাড়াও অতিরিক্ত এ চিনি শরীরের ওজন বাড়ায়, যা উচ্চ রক্তচাপ এবং ডায়াবেটিসসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করে।

এতসব স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও মানুষের মিষ্টি খাবারের প্রতি ঝোঁক এতটুকু কমেনি। এর কারণ হিসেবে বলা হয়ে থাকে, মিষ্টিস্বাদযুক্ত খাবারের প্রতি যে আকাঙ্ক্ষা তা মানুষের মধ্যে জৈবিকভাবে প্রোগ্রাম করা হয়েছে। এ কারণে মিষ্টি খাবারের বিকল্প বের করা প্রায় অসম্ভব। তাই বিভিন্ন কোম্পানি বিভিন্ন সময় চিনির বিকল্প হিসেবে অন্য উপাদান ব্যবহার করে মিষ্টান্ন তৈরির চেষ্টা করে থাকে। কিন্তু এর মধ্যে কোনোটার ব্যবহারেই চিনির মতো স্বাদ আনা সম্ভব নয়। এখানেই ড্যুমাটোকের সাথে অন্যান্য কোম্পানির ভিন্নতা। তারা চিনির বিকল্প উপাদান ব্যবহারের চেষ্টা না করে চিনির মিষ্টান্নতা বাড়িয়েছে।

মানবদেহে মিষ্টি সংবেদনশীল যে রিসিপ্টরগুলো (গ্রাহক) রয়েছে, সেগুলো সেবন করা চিনির মাত্র ২০ ভাগ স্বাদ গ্রহণ করতে পারে। প্রফেসর আভ্রাহাম বেনিয়েল তার ৭৫ বছরের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে মূলত চিনির গঠন কাঠামোতে পরিবর্তন এনেছিলেন, যার ফলে মানুষের মিষ্টি সংবেদনশীল রিসেপ্টরগুলো চিনি থেকে আগের তুলনায় বেশি স্বাদ গ্রহণ করতে পারে।

কিন্তু শুধুমাত্র ড্যুমাটোক এ বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে এমনটি নয়! উদাহরণস্বরূপ, নেসলে বাজারে মিল্কিবার ওয়াওসামস নামে একটি স্বাস্থ্যকর ক্যান্ডি নিয়ে আসে যাতে তারা নিজেদের তৈরি কম মিষ্টির চিনি ব্যবহার করেছিলো। যদিও তাদের এই পণ্য পরবর্তীতে বাজার থেকে সরিয়ে নিতে হয়েছিলো অত্যন্ত কম চাহিদা থাকার কারণে। খাবার থেকে চিনি কমানোর কাজটি সহজ মনে হলেও আদতে তা খুবই কষ্টসাধ্য।

এক্ষেত্রে ড্যুমাটোক অনেকটাই সফল বলা চলে। তাদের তৈরি ইনক্রেডো সুগার প্রাথমিকভাবে বেশ প্রশংসা কুড়িয়েছে। কিন্তু এখনো অন্য কোম্পানিগুলোর সুযোগ রয়েছে ড্যুমাটোককে টেক্কা দেওয়ার। কারণ ড্যুমাটোকের ইনক্রেডো সুগার তরল মাধ্যমে ভালো কাজ করে না। এছাড়াও এ চিনি ব্যবহার করে কেউ চাইলে নিজে রান্না করতে পারবে না। মূলত তারা তাদের তৈরি চিনি দিয়ে বিভিন্ন মিষ্টিজাতীয় খাবার তৈরি করে সেগুলো বাজারজাত করছে।

কিন্তু ড্যুমাটোকের শীর্ষ কর্মকর্তারা আশাবাদী যে, তারা আগামী ৫ বছরের মধ্যে খাবারে চিনির পরিমাণ ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ কমিয়ে আনতে সক্ষম হবেন স্বাদে কোনো রকম পরিবর্তন আনা ছাড়াই।

যদি সত্যিই তা হয়, তাহলে খাদ্যশিল্পে আসবে এক আমূল পরিবর্তন। সাধারণ খাবার চিনিকে সরিয়ে দিয়ে জায়গা করে নেবে ইনক্রেডো সুগার, চিনিশিল্প সর্বোপরি মিষ্টি খাবারের উপর একচ্ছত্র আধিপত্য হবে ড্যুমাটোকের!

মোঃ ওমর ফারুক তপু বর্তমানে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে যন্ত্রকৌশল বিভাগে পড়াশোনা করছেন।

jafinhasan03@gmail.com

Share if you like