ইতিহাসের চোখে ইউক্রেন : সংঘাতের পথ সৃষ্টির উপাখ্যান


রড্রিক ব্রেথওয়েট | Published: February 05, 2022 19:13:48 | Updated: February 06, 2022 11:40:59


নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে রাশিয়াসহ ১৫টি রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের খবর (ডিসেম্বর ২৬, ১৯৯১)

বার্লিন প্রাচীরের পতনের সময় সেখানে পড়াশোনা করছিলেন মেরি সারোত্তে। এরপর পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলো একের পর এক মস্কোর নিয়ন্ত্রণ মুক্ত হতে থাকে; সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যায়। শীতল যুদ্ধের অবসানের উদ্দাম উচ্ছ্বাসে অংশ নিয়েছিল মেরিও।

ওয়াশিংটনের জনস হপকিন্স স্কুল অভ অ্যাডভান্সড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের তিনি এখন অন্যতম অধ্যাপক। তাঁর সর্বশেষ বই, নট ওয়ান ইঞ্চ। এট তাঁর ত্রয়ী পুস্তক বা ট্রিলজির তৃতীয় বই । এতে বার্লিন প্রাচীরের পতনের দিনটি থেকে আজ অবধি কাহিনি তুলে আনা হয়েছে। ৩০ বছরের অন্তর্দৃষ্টি এবং অনেক নতুন নতুন নথিপত্র ব্যবহারের সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে এ কেতাব রচনা করেন মেরি। ভ্লাদিস্লাভ জুবোকও সে পথেই হেঁটেছেন। সম্প্রতি প্রকাশিত কলাপস বইতে সোভিয়েত ইউনিয়ন কী ভাবে পতন ঘটল তাঁর গভীর বিবরণ শোনান তিনি। রাশিয়া এবং পশ্চিমি জগত আজ আবার কী ভাবে বড়সড়ো সামরিক সংঘাতের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে এ দুটো বই আমাদেরকে তা বুঝতে সহায়তা করবে।

নট ওয়ান ইঞ্চ-এ ন্যাটোর (নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন) বিস্তার এবং বর্তমান সংঘাতে এই বিস্তারের অবদান নিয়ে চিত্তাকর্ষক বিবরণ পরিবেশন করা হয়েছে। এ কাহিনি পরিবেশন করতে যেয়ে সারোত্তে দুর্দান্ত বর্ণনার সাথে বিশ্লেষণকে মিশিয়েছেন। তাঁর বস্তুনিষ্ঠতা প্রশংসনীয় এবং খুঁটিনাটি বিশদ জিনিসের প্রতি নজর রাখতে ভুলেননি তিনি। আমাদের মধ্যে অনেকেই মনে মনে ধরে নেন যে ইতিহাস আমাদের জানা আছে যদিও প্রকৃতপক্ষে ইতিহাসকে ভুলে গেছি কিংবা কখনোই জানতামও না। এ সত্য সারোত্তের নজর এড়ায়নি। এখানে উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ১৯৮৯ সালের নভেম্বরে বার্লিন প্রাচীরের পতনের ক্ষেত্রে হাঙ্গেরিয়দের অপরিহার্য অবদান কি মনে আছে কারো! আরো বলা যায়, ভ্লাদিমির পুতিনকে নিজ উত্তরসূরি করছেন বলে প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনকে আগাম সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন রুশ প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলতসিন। আজকের রাজনীতিতে এ সবের ক্ষতিকর প্রভাব পড়েছে - এমন এক মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে সমাপ্তি টেনেছেন তিনি। (সারোত্তে এখন ব্রিটিশ আর্কাইভে রড্রিক ব্রেথওয়েটের অপ্রকাশিত প্রতিবেদন নিয়ে কাজ করছেন আর জুকোব কাজ করছেন ব্রেথওয়েটের অপ্রকাশিত দিনলিপি নিয়ে।)

বইতে মেরি সারোত্তের প্রধান প্রতিপাদ্য হলো যে ন্যাটোর ভবিষ্যৎ নিয়ে মস্কো এবং ওয়াশিংটনের মধ্যে শত্রুতা শীতল যুদ্ধোত্তর রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। প্রকৃতিগত দিক থেকে এটি অনেকটাই এর পূর্বসূরির ঠাণ্ডা যুদ্ধের মতোই হয়ে উঠেছে। বার্লিন প্রাচীরের পতনের তিন মাস পর মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেমস বেকার সোভিয়েত নেতা মিখাইল গর্বাচেভকে একটি কাল্পনিক দর কষাকষির পরামর্শ দেন। পুনর্মিলিত গোটা জার্মানিকে নিরাপদে করায়ত্ত করার পর ন্যাটো তার বর্তমান অবস্থান থেকে আর এক ইঞ্চি পূর্ব দিকে অগ্রসর হবে না - এ শব্দগুলো লেখার ব্যাপারে দুপক্ষ সম্মত কখনোই হয়নি। আলোচনায় গর্বাচেভের অবস্থান ছিল খুব দুর্বল তাই আইনি ভাষা কী হবে তার ওপর জোর দেওয়ার মতো সক্ষমতা তাঁর ছিল না। অপরদিকে মার্কিনিরা কখনোই নিজেদের হাত বেঁধে রাখতে রাজি হয়নি।

এতেও অবাক হওয়ার কিছুই নেই যে, যা শুনতে চেয়েছে তাই কেবল শুনেছিল রাশিয়া। বেকারের আশ্বাসকে নৈতিক এবং রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি হিসেবেই জোরাল মনে করেছিল রাশিয়া। কিন্তু অবিরত মার্কিন চাপের মুখে ন্যাটোর সীমানা ২০০৪ সালের মধ্যে রাশিয়া এবং ইউক্রেনের প্রায় কাছাকাছি পৌঁছে যায়। অর্থাৎ প্রায় থুথু ফেলার দূরত্বের মধ্যে উঁকি মারতে থাকে ন্যাটো। অনেক রুশ নাগরিক সে সময়ে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে থাকেন যে পশ্চিমারা তাঁদেরকে ঠকিয়েছে।

এই অভিযোগের উৎস খুঁজতে হলে যেতে হবে আরো পেছনে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে প্রতিযোগিতায় ব্যর্থ হওয়ার বেদনাদায়ক সত্যটি ১৯৮৫ সালে বুঝতে পারেন সোভিয়েত নেতারা। প্রতিযোগিতার দৌড়পথে সোভিয়েত ইউনিয়নকে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়ে গর্বাচেভকে বেছে নেন তাঁরা। শীতল যুদ্ধের অবসান ঘটাতে প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগানের সাথে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন তিনি। সোভিয়েত ইউনিয়নকে উন্মুক্ত করেন এবং গণতন্ত্রের একটি সীমিত রূপ উপহার দেন। কিন্তু সোভিয়েত সাম্রাজ্যের বিপুল সমস্যা এবং ধ্বসে পড়া অর্থনীতি সামাল দিতে পুরোই ব্যর্থ হলেন গর্বাচেভ।

রুশ ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলেৎসিন ১৯৯১ সালের আগস্ট মাসে মস্কোয় দ্যুমার সামনে একটি ট্যাংকের ওপর ওঠে ভাষণ দিচ্ছেন

রাশিয়ার দুর্বলতা আমেরিকার জন্য সুযোগ হয়ে দেখা দেয়। স্থানীয়দের সহায়তায় ন্যাটোর অভ্যন্তরে জার্মানিকে পুনরায় একত্রিতকরণ, পূর্ব ইউরোপীয়দের মুক্ত এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙ্গনকে ত্বরান্বিত করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৯১ সালের শেষ দিকে পুনরুজ্জীবিত রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসেবে ইয়েলৎসিনের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন গর্বাচেভ। এ ছিল পশ্চিমের বিজয়ের মুহূর্ত। তবে রুশদের কাছে এ সময়টা ছিল জাতীয় অপমান, অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা এবং বিভিন্ন স্থানে শাব্দিক অর্থেই দুর্ভিক্ষকাল।

ইউরোপে আমেরিকার প্রভাবশালী অবস্থানকে সমর্থন দিয়েছে ন্যাটো । এই অবস্থান ছেড়ে দেওয়ার কোনো অভিলাষই ন্যাটো বা আমেরিকার নেই। প্রকাশ্যে তাদের মুখ থেকে শোনা যায় যে ইউরোপের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ন্যাটোর অব্যাহত অস্তিত্বের উপরই নির্ভর করছে। রাশিয়া ন্যাটোর পূর্ণ সদস্য হতে পারে এমন পরামর্শ একান্তে প্রত্যাখ্যান করেছে তারা। শান্তির জন্য অংশীদারিত্ব স্থাপনের কথা বলে ন্যাটোর কাজের সাথে রাশিয়াকে যুক্তও করা হয়। পাশাপাশি তারা বলে দেয়, মস্কোকে তাদের সাথে সমান স্বরে কথা বলতেই দেওয়া হবে না।

গোটা পূর্ব ইউরোপকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য ন্যাটোর বিস্তার ঘটানো উচিত বলে যে সব মার্কিন কর্তারা বিশ্বাস করেন তাঁরা নিজেদের চিন্তাধারার নিষ্ঠুর বাস্তবায়ন করেন। তবে বাস্তবতাগুলোকে উপেক্ষা করা হচ্ছে বলে মার্কিন সেনারা সঠিক উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের প্রশ্ন হলো, কীভাবে ন্যাটো ইউরোপের বিশাল পরিধিতে নতুন সদস্যদেরকে একটি বিশ্বাসযোগ্য সামরিক নিশ্চয়তা দিতে পারবে? সমালোচকরা এই বলে সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে ন্যাটোর বিস্তার ঘটানো হলে তাতে রাশিয়ার সংস্কারের প্রচেষ্টাকে ধ্বংস করা হতে পারে।

ক্লিনটন রুশদের যুক্তি দিয়ে, প্রভাব বিস্তার করে, এবং ঘুষ দেওয়ার মাধ্যমে বৃত্তকে বর্গক্ষেত্রে পরিণত করার মতো অসম্ভব কর্ম সম্পাদনের তৎপরতা চালান। কিন্তু তাঁর নিজের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার কারণে সে তৎপরতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারেনি। সারোত্তে বলেন এ বাস্তবতাকে অস্বীকার করা কঠিন যে ন্যাটো জোটের সম্প্রসারণ তৎপরতার মধ্য দিয়ে রাশিয়ার তরুণ নাজুক গণতন্ত্রের ঘাড়ে বোঝা চাপানো হয়েছে। এমন এক সময়ে এ বোঝা চাপানো হয় যখন দেশটির তরুণ গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল বন্ধুর।

[ফাইনান্সিয়াল টাইমস থেকে বাংলায় রূপান্তর সৈয়দ মূসা রেজা]

Share if you like