স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশ যাতে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা পেতে পারে সে জন্য সরকার আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) শ্রমিক নিয়োগ করার ন্যূনতম বয়স সংক্রান্ত সনদ (কনভেনশন) অনুমোদন (র্যাটিফাই) করার উদ্যোগ নিয়েছে।
আনুষ্ঠানিক অনুমোদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে ইইউ এবং আইএলওর সহযোগিতায় শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় একটি কর্ম পরিকল্পনা প্রণয়নের প্রস্তুতি নিয়েছে। এই কর্মপরিকল্পনায় আইএলওর শ্রমিক নিয়োগ সংক্রান্ত সনদ, শ্রমিককে জোরপূর্বক কাজ করানো বন্ধ করা সংক্রান্ত প্রোটোকল এবং ইইউর অন্যান্য শর্ত পূরণের বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে।
শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব কে এম আবদুস সালাম বলেছেন, আগামী মাসে (মার্চে) এই কর্ম পরিকল্পনাপত্র চূড়ান্ত হবে।
২০১৯ সালের অক্টোবরে ইইউ এবং বাংলাদেশের যৌথ কমিশনের একটি বৈঠকে উভয় পক্ষ আন্তর্জাতিক শ্রম সংক্রান্ত সনদ অনুমোদনের জন্য একটি কর্ম পরিকল্পনা প্রণয়নের বিষয়ে একমত হয়েছিল।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ওই আন্তর্জাতিক সনদ অনুমোদনের সম্ভাব্যতা যাচাই করবে। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যেই এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে বৈঠক করেছে এবং স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র, নৌপরিবহন, স্বাস্থ্য, কৃষি, পাট ও বস্ত্র, সমাজকল্যাণ, যোগাযোগ, বাণিজ্য, পরিবেশ, তথ্য ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়ের মতামত চেয়েছে।
স্বল্পোন্নত দেশ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তরণের পর ইউরোপের বাজারে শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা পেতে হলে বাংলাদেশকে চাকরিতে নিয়োগে কর্মীর ন্যূনতম বয়স মেনে চলার শর্তসহ বিভিন্ন শর্ত সংবলিত সনদ অনুসমর্থন করে সেগুলো মেনে চলতে হবে।
শ্রম ও কর্মসংস্থান সচিব জানিয়েছেন, সনদ অনুসমর্থনের প্রক্রিয়া সম্প্রতি শুরু হয়েছে এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে এর জন্য মন্ত্রিসভার অনুমোদন লাগবে। তিনি বলেন, কর্মপরিকল্পনার মধ্যে সনদ অনুসমর্থনের সময় বেঁধে দেওয়া হবে। মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব (আন্তর্জাতিক সংস্থা) মো. হুমায়ুন কবির বলেছেন, এই সনদ অনুসমর্থনে প্রথমবারের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেছেন, ২০১৮ সালের বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধিত) আইনে কঠোরভাবে ১৪ বছরের কম বয়সী শিশুদের যে কোনো কারখানায় নিয়োগ করাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
আইএলওর ১৩৮ নম্বর সনদ অনুযায়ী, অনুসমর্থনকারী দেশকে কারখানার কর্মীর ন্যূনতম বয়স হিসেবে এমন একটি বয়সকে নির্ধারণ করতে হবে যে বয়সে একজন তরুণ শারীরিক ও মানসিকভাবে কাজ করার জন্য উপযুক্ত হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশ ১৯৭৩ সালে যে সনদ গ্রহণ করেছে তাতে বলা হয়েছে, বাধ্যতামূলক শিক্ষা অর্জন করতে যে বয়স পার করতে হয় তার আগে কোনো শিশুকে কাজে নিয়োগ করা যাবে না। সেখানে বলা হয়েছে, কোনো অবস্থাতেই ১৫ বছরের কম বয়সী বাচ্চাদের নিয়োগ করা যাবে না।
হুমায়ুন কবির বলেন, যেসব উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতি ও শিক্ষা ব্যবস্থা এখনো যথার্থ পর্যায়ে উন্নীত হয়নি আইএলওর সনদে সেসব দেশের ন্যূনতম ১৪ বছরের শিশুদের কাজে নিয়োগ করাকে অনুমোদন দেওয়া হয়। ভারত, শ্রীলঙ্কা ও কম্বোডিয়া এই সুবিধা ভোগ করছে।
হুমায়ুন কবির বলেন, ইউরোপে জিএসপি সুবিধা ভোগ করার জন্য বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশের পর্যায় থেকে উত্তরণের তিন বছর পর ২৭টি আন্তর্জাতিক সনদকে অনুসমর্থন করতে হবে। শ্রমিকের ন্যূনতম বয়স মানা ও বিষয়টিকে বাস্তবায়ন করা অনেক দিন ধরে ঝুলে আছে। সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা উন্নত না থাকায় এটি এত দিন ঝুলে ছিল। তবে সেই অবস্থা কেটে গেছে বলে সরকার মনে করে। তিনি বলেন, কলকারখানায় শিশুশ্রমের ব্যবহার বন্ধে নজরদারির পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা গড়ে তোলা দরকার।
আইএলওর সনদ অনুযায়ী, শরীরের জন্য ক্ষতিকর ও সুরক্ষাবিহীন পরিবেশের কোনো কাজে তরুণ বয়সীদের নিয়োগ করা যাবে না। সাধারণভাবে ১৮ বছরের কম বয়সীদের কাজে নিয়োগে কাউকে নিয়োগ করা যাবে না। তবে বিশেষ প্রয়োজনে স্বাস্থ্য ও মনের জন্য ক্ষতিকর নয় ও সুরক্ষার অভাব নেই এমন পরিবেশ থাকা সাপেক্ষে ১৬ বছরের তরুণদের কাজে নেওয়া যেতে পারে।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই)-এর গবেষণা বিষয়ক পরিচালক ড. এম এ রাজ্জাক বাংলাদেশের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, এই আন্তর্জাতিক সনদ অনুমোদন করতে সক্ষম না হওয়ায় বাংলাদেশকে অনেক প্রতিকূলতার মুখে পড়তে হয়েছে। জিএসপি সুবিধা পেতে আমাদের এখন এটি অনুমোদন করতে হবে। তিনি বলেছেন, আন্তর্জাতিক বহুপক্ষীয় বাণিজ্য ব্যবস্থার যে সংস্কার ধারা চলছে তাতে আসন্ন দিনগুলোতে অধিকাংশ দেশে শ্রম ও কাজের পরিবেশের বিষয়ে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত হবে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ থেকে মোট রপ্তানির ৫৮ শতাংশই যায় ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে। আর ইউরোপে মোট যে পরিমাণ অর্থের পণ্য রপ্তানি হয় তার ৬৪ শতাংশই তৈরি পোশাক থেকে হয়।
doulot_akter@yahoo.com
