জেলেনস্কি পরিবার ও যুদ্ধ
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে প্রাণ হারায় লাখো মানুষ, ধ্বংস হয়ে যায় অগণিত পরিবার। এরকমই একটি পরিবারের এক ক্ষুদে সদস্য সায়মন ইভানোভিচ জেলেনস্কির। জেলেনস্কি ২য় বিশ্বযুদ্ধে তার বাবা ও তিনজন ভাইকে হারান। শিশু জেলেনস্কি জার্মানিকে পরাস্ত করা জন্য যোগ দেন রেড আর্মিতে।
রক্তক্ষয়ী সেই যুদ্ধের অবসান ঘটেছে, কেটে গেছে আট দশকের বেশি। তাও যুদ্ধের সাথে সম্পর্ক যেন ছেদ হচ্ছে না জেলেন্সকি পরিবারের।
ইউক্রেনের বর্তমান রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির জেলেনস্কি। তিনি আর কেউ নন, নাৎসি বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করা সায়মন ইভানোভিচ জেলেনস্কির দৌহিত্র্য, জেলেনস্কি বংশের তৃতীয় প্রজন্ম যিনি লড়ে যাচ্ছেন রাশিয়ার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে।
ইউক্রেনের সাথে রাশিয়ার সম্পর্ক
ইউক্রেনের ও রাশিয়ার সম্পর্কের ঐতিহাসিক ভিক্তি রয়েছে। তবে সেটি শুধু সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের সাথে নয়।
ইউক্রেনের সোভিয়েত ইউনিয়নের স্বতন্ত্র সদস্য ছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের আগে এই রাষ্ট্রের নাম ছিল ইউক্রেনিয়ান সোভিয়েত সোশ্যালিস্ট রিপাবলিক। এরও আগে ইউক্রেন ছিল বৃহত্তর রাশিয়ান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত।
ইউক্রেনের স্লাভিক গোষ্ঠীর এই অংশ ৯ম শতক থেকে ১২শ শতক পর্যন্ত কিভিয়ান রুশের অভ্যন্তরে শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে ছিল। তারপর বিভিন্ন সময়ে কখনো গোল্ডেন হোর্ড, কখনো পোল্যান্ড আবার কখনো ক্রিমিয়ান খেনেইটের অন্তর্ভুক্ত ছিল এটি।
ইউক্রেনিয়ানদের বিভিন্ন মত
বলা হয় ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় দুটি স্থান ডোনাস্ক ও লোহানস্ক রাশিয়াপন্থী। এই অঞ্চলের বাসিন্দারা রাশিয়ার সাথে আবার মিলিত হতে চায়। অন্তত রাশিয়া তা-ই দাবি করে।
তবে কতজন মানুষ তা চায় বা আদৌও চায় কিনা এর কোনো পরিসংখ্যানগত সত্যতা পাওয়া যায়নি।
ভূ-রাজনীতি
পৃথিবীর যেকোনো স্থান যা দুইটি মহাদেশ, সাগর এমনকি বিপরীত ভাবাদর্শের মাঝে অবস্থান করে ঐতিহাসিকভাবে সেই স্থানটি বিশেষ গুরুত্ব পেয়ে থাকে। ইউক্রেনও এর ব্যতিক্রম নয়।
ছবি: DW
মানচিত্রে এর অবস্থান রাশিয়া ও ইউরোপের অন্যান্য রাষ্ট্রের মাঝখানে। ইউক্রেনের পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমে সব ন্যাটো অন্তর্ভুক্ত (নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অরগেনাইজেশনের) রাষ্ট্র এবং পূর্বে রাশিয়া।
কাজেই ভূ-রাজনীতির দিক থেকে ইউক্রেন তাৎপর্যপূর্ণ একটি স্থান। ইউক্রেনের মতো ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব বহন করে এরকম স্থান আরো রয়েছে। তুরস্কের ইস্তানবুল মধ্যপ্রাচ্যের সিরিয়া এবং আমাদের বাংলাদেশও এর ভালো উদাহরণ।
কেন গুরুত্বপূর্ণ ইউক্রেন?
মানচিত্র এবং ভূ-রাজনৈতিক বিশেষত্বের জন্য বোঝাই যাচ্ছে কেন ইউক্রেন রাশিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একটি কারণ রাশিয়া তার প্রভাব যুক্তরাষ্ট্র ব্লকের অধীনে হারাতে চায় না।

দ্বিতীয় কারণ হলো গ্যাস বাণিজ্য। পূর্ব ইউরোপের বেশিরভাগ রাষ্ট্রের গ্যাসের চাহিদা পূরণ করে রাশিয়া। এই গ্যাস বৃহত্তর পাইপ লাইনের মাধ্যমে ইউক্রেনের ভিতর দিয়ে রাশিয়া থেকে ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোতে পৌঁছায়। তাই যখনই ইউক্রেন পূর্ব-ইউরোপীয় রাষ্ট্রের সাথে আঁতাত করতে চায় তখনই রাশিয়া গ্যাস ইস্যুতের বেঁকে বসে।
যুদ্ধে ক্ষয়-ক্ষতি
ইউক্রেন-রাশিয়ার সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত হতাহতের সংখ্যা অনেক। জাতিসংঘের তথ্যমতে, শুধুমাত্র ২০১৪ সালের ডনবাস সংঘর্ষেই ১৩ হাজারে বেশি মানুষ মারা যায়। এর মাঝে সাধারণ নাগরিকের সংখ্যা প্রায় ৩৩৯৩ জন।
এছাড়াও ৭০০ বিদ্যালয় ও ১৩০টির মতো হাসপাতাল ক্ষতিগ্রস্ত হয় এই সংঘর্ষে। দুই লাখেরও বেশি শিশু শিক্ষা সুবিধা থেকে বঞ্চিত এখনো।
অভিনয় থেকে যুদ্ধে অংশগ্রহণ
লেখার শুরুতে জেলেনস্কি পরিবারের কথা বলা হয়। এই জেলেনস্কি পরিবারের তৃতীয় প্রজন্ম ভ্লাদিমির জেলেনস্কি তার ক্যারিয়ার শুরু করেন একজন কৌতুক অভিনেতা হিসেবে।

পিতামহ জেলেনস্কির মতো বড় কোনো যুদ্ধ না দেখলেও তিনি রুশ-আমেরিকান স্নায়ু যুদ্ধ দেখেছেন, দেখেছেন সোভিয়েতের ইউনিয়নের ভাঙন এবং দুর্নীতির কারণে ক্রমগ্রাসমান অর্থনীতি।
তাই তিনি কৌতুকাভিনয় ছেড়ে চলে আসেন রাজনীতিতে। নির্বাচিত হন ইউক্রেনের ৬ষ্ঠ রাষ্ট্রপতি হিসেবে। সম্প্রতি চলমান যুদ্ধে তিনি সরব উপস্থিতির জানান দিচ্ছেন যুদ্ধের ময়দানে, সৈন্যদের সাহস যোগাচ্ছেন যুদ্ধপোশাকে অস্ত্র হাতে নিয়ে।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং ইউক্রেনের জনগণ রাশিয়াকে চায় এই দোহাই দিয়ে যখন পুতিন ইউক্রেনে আক্রমণ চালিয়েছে তখন অন্যদিকে আমরা এখানেই আছি, আমাদের দেশকে রক্ষা করতে," বলে তার ও তার দেশের মানুষের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির জেলেনস্কি।
মোঃ ইমরান বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনা করছেন।
imran.tweets@gmail.com