আফগানিস্তানে পাশ্চাত্যের ২০ বছরের হস্তক্ষেপ পরিণামে ব্যর্থ হবে- এটাই ছিল কপালের অনিবার্য লিখন। কাবুল পতনের পর এমন কথা বলার লোভ অনেকেই সামাল দিতে পারছেন না। ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণে একটি পক্ষের ভাষ্য হলো: আফগান সংকটের কোনো সামরিক সমাধান নেই। সত্যিই তো, শান্তি অর্জন করতে না পারলে নিশ্চিত ভাবেই যুদ্ধে জয়ী হওয়ার কোনো সম্ভাবনা যে আর থাকে না।
আফগানিস্তানে কখনোই শান্তি অর্জন করা যাবে না বলেই নিয়তিবাদীদের আরেকটি আপ্ত বাক্য সবসময়ই শুনতে পাওয়া যাবে। উপজাতীয় এবং ঐতিহ্যের কূপমন্ডকতায় আচ্ছন্ন একটি সমাজ মোটেও গণতান্ত্রিক ভাবধারায় চলতে পারে না বলেও মন্তব্য করবেন অনেকে। আরেকদল গলা উঁচিয়ে বলবেন, বহিরাগতদের দিয়ে রাষ্ট্র-নির্মাণ তৎপরতা সবসময়ই ধসে পড়তে বাধ্য।
এ কথা ঠিক যে রাষ্ট্র-নির্মাণের কাজ সেখানে অধিবাসীদেরই করতে হবে। তবে কার্যকর রাষ্ট্র এবং অর্থনীতি একটু ভিন্ন জিনিস। ২০০১ সালে তালেবানকে উৎখাতের পর এ কাজ দেশটিতে করা পশ্চিমের জন্য কেবল দায়িত্বই ছিল না বরং উচিতও ছিল। আর এ ক্ষেত্রে মর্মান্তিক সত্য কথাটা হলো, পশ্চিম কখনোই যথার্থ ভাবে এ দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করেনি।
আফগানিস্তানে ১৯৯০ দশকের তুলনায় মাথাপিছু আয় এখন বেড়েছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে গত দশকে এই আয় ছিল মোটামুটি ৬০০ ডলার। অর্থনীতিবিদ জেফরি স্যাক্স প্রায় চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেন যে আফগানিস্তানে অর্থনৈতিক উন্নয়ন তৎপরতা দেশটিতে মার্কিন সামরিক ব্যয়ের কাছে হয়ে গেছে একেবারে নস্যি। এ ছাড়া, দেশগঠনের কাজে যা ব্যয় করা হয়েছে তারও সিংহভাগ খরচ হয়েছে নিরাপত্তা খাতে।
অবশ্যই টেকসই রাষ্ট্র কাঠামো এবং অর্থনৈতিক কার্যকলাপের জন্য স্থিতিশীল এবং নিরাপদ পরিবেশের একান্ত প্রয়োজন রয়েছে। পাশাপাশি দুদিক থেকেই পারস্পরিক নির্ভরশীলতার প্রয়োজন । আফগানিস্তানের মানুষের জন্য যে রাষ্ট্র ও অর্থনীতি অর্থবহভাবে কাজ করবে, সেটাই যে কোনো পরিমাণে সামরিক ব্যয়কে আরো কার্যকরী করবে। এটা প্রতিফলিত হবে আফগান সেনাবাহিনীকে যুদ্ধ করতে উদ্বুদ্ধ করায় এবং নতুন নতুন সদস্য সংগ্রহে তালেবানের উর্বর ভূমিকে নষ্ট করে দেওয়ায়।
আফগানিস্তানে মোতায়েন মার্কিন সামরিক নেতৃত্বের উপদেষ্টা হিসেবে এক দশক দেশটিতে কাটান সারাহ চাইয়েস। দেশটিতে জমজমাট দুনীতি চর্চা নিয়ে একটি বইও লিখেছেন সারাহ। তিনি বলেন, কতো টাকা ব্যয় করা হলো সেটা নয় বরং খুব গুরুত্বপূর্ণ হলো, অর্থ কি ভাবে ব্যয় করা হয়েছে। দুর্নীতি দেশটিতে আনুগত্যকে ধসিয়ে দিয়েছে। ফলে সেখানে অর্থনৈতিক ব্যর্থতা চাগিয়ে উঠেছে এবং শেষ পর্যন্ত সামরিক ব্যর্থতা ডেকে এনেছে।
সারাহ স্বীকার করেন, আফগান লোকজন সবসময় বলেছে, তালেবান গোষ্ঠী আচরণে কর্তৃত্ববাদী, তাদের এ আচরণ আফগানরা মোটেও পছন্দ করে না, তবে তালেবানরা দুর্নীতিগ্রস্ত নয়। অন্যান্য গবেষণা তাঁর এ কথাকে সমর্থন করেছে। গত শীতে একটি জরিপ চালায় ইন্টিগ্রিটি ওয়াচ আফগানিস্তান। তাতে উঠে আসে, অর্ধেকের বেশি আফগান মনে করেন সরকার নিয়ন্ত্রিত এলাকার চেয়ে তালেবান নিয়ন্ত্রিত এলাকায় দুর্নীতির হার কম।
একই প্রতিবেদনে আফগানদের ঘুষ দেওয়ার একটি হিসাবও দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রযন্ত্রকে দেওয়া আফগান জনগণের ঘুষের পরিমাণ ২২৫ কোটি ডলার। তবে এটি মোটেও নতুন কোনো কথা নয়। মাদক এবং অপরাধ সংক্রান্ত জাতিসংঘ দফতর ২০১০ সালে এক প্রতিবেদনে বলেছে, এক বছরে আফগানবাসীরা ২৫০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ অর্থ ঘুষ দিয়েছে। মানে দেশটির আনুষ্ঠানিক মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির প্রায় এক চতুর্থাংশই গেছে ঘুসষ। প্রতিবেদনে বলা হয়, আইন বজায় রাখার দায়িত্বে যার ছিলেন তারাই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আইন ভেঙ্গেছেন। রক্ষকের এ ভাবে ভক্ষক হয়ে ওঠার ঘটনা তুলে ধরে জাতিসংঘও। আর এ ঘুষকে নিয়েই সেখানে গড়ে ওঠে মাফিয়ার মতো একটি চক্র ।
ঘুষের দায় আফগানিস্তানের মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হলে তাতে মূল প্রসঙ্গে এড়িয়ে যাওয়া হবে। বরং আফগান রাষ্ট্রযন্ত্রে ঘুষ-দুর্নীতির এই বাড়বাড়ন্তের দায় বর্তায় দেশটির অর্থনৈতিক এবং নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের দায়িত্বে মোতায়েন মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের ঘাড়ে।
মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের হাতে সব ধরণের ক্ষমতা ছিল, বলে জানান সারাহ । কিন্তু সে ক্ষমতা একগুঁয়ে ভাবে খাটানো হয়েছে এবং এতে দুর্নীতিকে উস্কে দেওয়া হয়। আস্থাভাজন মধ্যভোগীদের মাধ্যমে লেনদেনও হয়েছে, কর্তৃত্বশালীদের সাথেই দহরম-মহরম চলেছে। সাধারণ আফগান মানুষ খারাপ আচরণের কথা বলতে যেয়ে রক্তচক্ষুর মুখে পড়েছে। এতে কার্যকর ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা যেমন তদন্তে দক্ষ স্বতন্ত্র পুলিশবাহিনীর প্রশিক্ষণ দেওয়া বা গড়ে তোলার কাজ মুখ থুবড়ে পড়েছে।
ঠোট কাঁটার মতো বলতে গেলে এই দাঁড়াবে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিতেই আফগানিস্তানে দুর্নীতিমত্ত রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে ওঠে। আফগানিস্তানকে গড়ে তোলার কাজে তদারকির দায়িত্বপ্রাপ্ত মার্কিন কংগ্রেসের নিজস্ব মহা পরিদর্শকও স্বীকার করেন, ধৈর্যহীনতার কারণে মার্কিন সরকার এমন সব সিদ্ধান্ত নিতে থাকে যা দুর্নীতিকে হু হু করে বাড়িয়ে দেয়। পাশাপাশি কর্মসূচির কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়মার্কিন কর্তাব্যক্তিরা এই অবস্থা টের পাওয়ার পর আফগানিস্তানে বিরাজমান পরিস্থিতি এড়িয়ে চলার নতুন নতুন পথ বের করেন।
দায়িত্ব গাফলতির বিকৃত মানসিকতাই কার্যকর আফগান রাষ্ট্রযন্ত্র গড়ার তৎপরতাকে আঁতুড়েই বানচাল করে দিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্ররা এ ক্ষেত্রে ভিন্ন ভূমিকা নিতে পারত। তারা সম্পদের জন্য স্থানীয় প্রহরী নিয়োগ না করে সরাসরি আফগান নাগরিকদের ব্যক্তিগত ভাবে নগদ অর্থ দেওয়ার দায়িত্ব পালন করতে পারত, কঠোর স্বচ্ছতা, নজরদারি এবং তদারকির পদ্ধতি তারা চালু করতে পারত। এমনকি সব পর্যায়ের দুর্নীতিবাজ কর্তাব্যক্তির জন্য দ্রুত বাধানিষেধ আরোপ করতেও পারত।
গত সপ্তাহের নাটকের যবনিকা পতনের মধ্য দিয়ে জয় করা সম্ভব নয় এমন এক যুদ্ধের ইতি ঘটেছে বলে কেউ কেউ বলতে পারেন। তারা এ ক্ষেত্রে আফগানিস্তান বিদেশি আগ্রাসনের কলঙ্কজনক ইতিহাসের নজির টানতে পারেন। সত্যিকার অর্থে কলঙ্কজনক হলো শান্তি অর্জনে সক্ষম একটি সুযোগ ২০ ধরে হেলায় হারিয়েছে পাশ্চাত্য।
[ফাইনান্সিয়াল টাইমস থেকে বাংলা রূপান্তর করেছেন সৈয়দ মূসা রেজা]