আফগানিস্তানে খাবার জোগাতে কন্যাশিশু বিক্রি


এফই অনলাইন ডেস্ক | Published: November 02, 2021 19:53:42 | Updated: November 03, 2021 16:41:38


ফাইল ছবি (সংগৃহীত)

৯ বছরের ছোট্ট শিশু পারওয়ানা মালিক। ধুলোমাখা পথে বন্ধুদের সঙ্গে দড়ি লাফিয়ে, হেসে-খেলে বেড়ানো এই শিশু ঘরে ফেরামাত্রই মিলিয়ে যায় তার সব হাসি। মাটির দেয়ালের তৈরি ছোট্ট কুটিরে বাস করা এই মেয়েটি জানতে পারে, শিশুবধূ হিসেবে এক আগন্তুকের কাছে তাকে বিক্রি করে দিয়েছে তার পরিবার।

গত ২২ অক্টোবর পারওয়ানা সিএনএন-কে জানায়, ওই ব্যক্তি বলেছে, তার বয়স ৫৫ বছর। কিন্তু পারওয়ানের কাছে তিনি বুড়ো মানুষ। তার চোখের পাতা ও দাড়ি পাকা। ওই লোক বাড়ি নিয়ে গিয়ে তাকে মারধর করবে এবং জোর করে বাড়ির কাজ করিয়ে নেবে বলে ভয়ে আছে সে।

তবে পারওয়ানার বাবা-মা বলছেন, এছাড়া তাদের আর কোনও উপায় নেই। খবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের।

চার বছর ধরে আফগানিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বাদগিস প্রদেশে বাস্তুচ্যুত মানুষদের অস্থায়ী শিবিরে বাস করছে পারওয়ানার পরিবার। মানবিক সহায়তা আর কাজ করে অল্পকিছু রোজগার দিয়ে চলছে তারা। কিন্তু গত ১৫ অগাস্ট তালেবান আফগানিস্তান দখলের পর তাদের জীবন কঠিন হয়ে উঠেছে।

আফগানিস্তানে আন্তর্জাতিক সহায়তা বন্ধ হয়ে ধসে পড়েছে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। এতে খাবারের মতো মৌলিক চাহিদা মেটাতে পারছেন না অনেকে। পারওয়ানার পরিবার তাকে বিক্রি করার মাত্র কয়েক মাস আগেই তার ১২ বছরের বোনকেও বিক্রি করেছে।

আফগানিস্তানে মানবিক সংকট ঘনিয়ে আসতে থাকায় পারওানের মতো এমন অনেক পরিবারই বিয়ের নামে শিশুদের বিক্রি করে দিচ্ছে। ক্ষুধার কারণে পরিবারগুলো এমন হৃদয়বিদারক সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছে।

দিন দিনই এমন পরিবারের সংখ্যা বাড়ছে, যারা সন্তান বিক্রি করে দিচ্ছে। খাবারের অভাবে, কাজের অভাবে পরিবারগুলো এ কাজ করা ছাড়া উপায় নেই বলে বোধ করছে,বলেছেন বাদগিসের এক মানবাধিকার কর্মী মোহাম্মদ নাঈম নিজাম।

পারওয়ানার বাবা আবদুল মালিক সিএনএন-কে তার সন্তান বিক্রির অবিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে বলেন, তিনি রাতে ঘুমাতে পারেন না। মেয়েকে বিক্রির আগে লজ্জা, অপরাধবোধ আর দুশ্চিন্তায় মন ভেঙে গেছে তার।

মেয়েকে বিক্রি না করার সব চেষ্টাই তিনি করেছেন। কিন্তু অনেক জায়গায় কাজ খুঁজেও পাননি। আত্মীয়স্বজনের কাছে ধার করেছেন। তার স্ত্রী অন্যদের কাছে খাবার ভিক্ষা করেছেন। কিন্তু তাতেও পরিবারের জন্য খাবার জোগাতে হিমশিম খেয়ে তার মনে হয়েছে সন্তান বিক্রি ছাড়া উপায় নেই।

আবদুল মালিক বলেন, আমাদের পরিবারের সদস্য আটজন। পরিবারের অন্যদের বাঁচাতে হলে (মেয়েকে) বিক্রি করতেই হত। পারওয়ানকে বিক্রি করে আব্দুল মালিক যে অর্থ পেয়েছেন, তাতে তার পরিবারের চলবে মাত্র কয়েকমাস। এর মধ্যে আব্দুলকে অন্নসংস্থানের অন্য কোনও উপায় বের করতে হবে।

পারওয়ানের স্বপ্ন ছিল বড় হয়ে শিক্ষক হওয়া। সে কখনও তার পড়াশুনা ছাড়তে চায়নি। কিন্তু এই সব স্বপ্ন ভেস্তে দিয়ে গত ২৪ অক্টোবর পারওয়ানার ঘরে তাকে কিনে নিতে আসে কোরবান নামের ওই বুড়ো লোক।

ভেড়া, জমি ও অর্থ মিলিয়ে পারওয়ানার বাবাকে দুই লাখ আফগানি মুদ্রা (২,২০০ মার্কিন ডলার) দেন তিনি। তবে পারওয়ানা ক্রয়কে বিয়ে বলতে নারাজ কোরবান। তিনি বলেন, আমার স্ত্রী আছে। সেই পারওয়ানাকে দেখাশোনা করবে। পারওয়ানাকে সে নিজের সন্তানের মতোই দেখবে।

পারওয়ানার বাবা গরিব, তার অর্থের প্রয়োজন। সে (পারওয়ানা) আমার বাসায় কাজ করবে। আমরা তাকে পেটাব না। সে আমাদের পরিবারের একজন হয়েই থাকবে।

পারওয়ানার বাবাও কেঁদে কেঁদে কোরবানকে বলেন, মেয়ের যত্ন নিতে, তাকে না মারতে। সে কথায় সায় দিয়ে পারওয়ানার হাত ধরে ঘরের দরজা পেরিয়ে বাইরে বেরোন কোরবান। পা সরতে চায় না পারওয়ানের।

তাকে ধীরে ধীরে টেনে নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িতে তুলে নিয়ে চলে যায় কোরবান। আর সেদিকে চেয়ে চোখের পানি ফেলেন বাবা।

Share if you like