বয়স বাড়ার সাথে সাথে হাড়ের জোড়ায় জোড়ায় এক ধরনের তীব্র ব্যথার প্রকোপে অনেকের ক্ষেত্রেই জীবন যেন বিভীষিকাময় হয়ে ওঠে। সাধারণ কথায় লোকে বলে ‘বাতের ব্যথা’ আর চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় আর্থ্রাইটিস।
আর্থ্রাইটিস ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী নারী ও বয়োবৃদ্ধদের ক্ষেত্রে এই ব্যথায় আক্রান্তের পাল্লাটা ভারী হলেও যেকোনো বয়সে যে কেউ আক্রান্ত হতে পারে।
শারীরিক ক্রিয়াকলাপের বৈকল্য নাকি জীবনধারণের ধারায় খানিকটা ভুলের জন্য এমন ব্যথার সূত্রপাত? কারণগুলো হয়তো দৈনন্দিন জীবনেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। একটু চেষ্টা করলে কিছু কারণ এড়িয়ে চলা সম্ভব, আবার কিছু কারণ রয়েছে যা প্রকৃতপক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভবপর নয়।
বিশ্বজুড়ে আর্থ্রাইটিস আক্রান্তের নমুনা নেহায়েত মন্দ নয়।
বয়সভেদে
সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল এন্ড প্রিভেনশন, ২০২০ সালের জরিপ অনুযায়ী মোট আক্রান্তের ৬০ শতাংশের বয়সসীমা ১৮ থেকে ৬৪ বছর।
লিঙ্গভেদে
মেডস্কেপ,২০২১- এর তথ্য অনুযায়ী পুরুষদের তুলনায় নারীদের আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় তিনগুণ অধিক।
আর্থ্রাইটিস হেলথ, ২০২১ এর রিপোর্ট বলছে পুরুষদের তুলনায় আক্রান্ত নারীদের ক্ষেত্রে ব্যথার তীব্রতা বেশি।
এবং, ইন্টার মাউনটেইন হেলথকেয়ার, ২০১৬ সালের জরিপে দেখা যায়, ৫৫ বছরের কমবয়সী নারীদের তুলনায় আক্রান্ত পুরুষের সংখ্যা বেশি এবং ৫৫ বছরের অধিক বয়স্কদের ক্ষেত্রে হিসেব ঠিক উল্টো।
যুক্তরাষ্ট্রের অধিবাসীদের কর্মক্ষমতা হ্রাস পেয়ে ধীরে ধীরে শারীরিক বিকলাঙ্গতার দিকে ধাবিত হওয়ার অন্যতম প্রধাণ কারণ হচ্ছে আর্থ্রাইটিস। সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল এন্ড প্রিভেনশন, ২০২০ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী সে বছর আর্থ্রাইটিসে আক্রান্ত মোট ২৪০০০০০০ জন ব্যক্তি শারীরিকভাবে বিকলাঙ্গ হয়ে পড়েন।
২০১৫ সালে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো সারা দেশ জুড়ে জাতীয়ভাবে ‘মাস্কুলোস্কেলিটাল কন্ডিশন’ যাচাইয়ের জন্য একটি জরিপ চালানো হয়। জরিপে অংশ নেয় ১৫ টি জেলার মোট ২,০০০ জন(গ্রামে বসবাসরত-১,২০০ জন, শহরে বসবাসরত-৮০০ জন; নারী-১,০০০ জন, পুরুষ-১,০০০জন) মানুষ। ফলাফলে দেখা যায় ২,০০০ জনের মধ্যে ২২৫ জন পুরুষ এবং ৩৩৬ জন নারী মাস্কুলোস্কেলিটাল ডিসঅর্ডারে ভুগছেন।
বাংলাদেশ ফিজিওথেরাপি সোসাইটির প্রেসিডেন্ট, ডা: মো: সফিউল্যাহ প্রধান এক সাক্ষাৎকারে, আর্থ্রাইটিসের কারণ হিসেবে স্থূলতা, বয়স (৪০ বছরের অধিক), অতিরিক্ত কায়িক পরিশ্রম, পেশির দুর্বলতা, আঘাত, অটোইমিউন ডিসঅর্ডার বা জিনগত বৈশিষ্ট্যকে দায়ী করেছেন।
বয়স
বয়স বাড়ার সাথে সাথে দেহের পেশীসমূহ দূর্বল হয়ে পড়ে এবং কার্টিলেজসমূহ ছিঁড়ে যেতে থাকে। ফলে সংযোগস্থলে হাড়ে হাড়ে ঘর্ষণের সৃষ্টি হয় এবং ব্যথা অনুভূত হয়।
লিঙ্গ
পুরুষদের তুলনায় নারীরা আর্থ্রাইটসে অধিক আক্রান্ত হয়ে থাকে। তবে ঠিক কী কারণে নারীদের আক্রান্তের হার বেশি এ ব্যাপারে চিকিৎসকগণ এখনো কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা খুঁজে পাননি।
অতিরিক্ত কায়িক শ্রম
যারা অত্যাধিক কায়িক পরিশ্রম করেন বিশেষত যাদের হাঁটু ভাঁজ করে দীর্ঘসময় কাজ করতে হয়।
স্থূলতা
বয়স ও উচ্চতা অনুযায়ী শরীরের ওজন যখন ভারসাম্য সীমা অতিক্রম করে স্থূলতায় রূপ নেয়, তখন এই বাড়তি ওজনের চাপ পড়ে বিশেষত হাঁটু, নিতম্ব এবং মেরুদন্ডের উপর।
আঘাত
হাঁটু, পায়ের গোড়ালি, কোমর, মেরুদন্ড বা কোনো হাড়ের সংযোগস্থলে কোনো রকম আঘাত পেয়ে থাকলে সময়ের সাথে সাথে তা আর্থ্রাইটিসে রূপান্তরিত হওয়ার অধিক সম্ভাবনা থাকে।
সংক্রমণ
হাড়ে ব্যাকটেরিয়া (যেমন, স্ট্যাফাইলোকক্কাস অরিয়াস) বা ভাইরাসের (যেমন, পারভো ভাইরাস, হেপাটাইটিস বি এবং সি ভাইরাস) সংক্রমণের ফলে আর্থ্রাইটিস হতে পারে।
জিনগত ত্রুটি
অনেকের ক্ষেত্রে জন্মগতভাবে হাড়ের কার্টিলেজ বা তরুণাস্থি তৈরির জন্য দায়ী জিনে ত্রুটি থাকে। ফলে সঠিকভাবে তরুণাস্থি তৈরি না হওয়ার কারণে দ্রুত হাড়ের সংযোগস্থল ক্ষয় হতে থাকে। এছাড়াও জন্মগতভাবে কারো কারো মেরুদন্ডের ক্রমবিকাশে অসামঞ্জস্যতা থাকতে পারে ফলে বয়স বাড়ার সাথে সাথে ব্যথার সৃষ্টি হয়ে থাকে।
অটোইমিউন ডিসঅর্ডার
ইমিউন সিস্টেমের কাজ হচ্ছে অ্যান্টিবডি তৈরির মাধ্যমে ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস এবং নানারকম সংক্রমণের হাত থেকে দেহকে রক্ষা করা। কোনো কারণবশত এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার ছন্দপতন ঘটলে দেহের ইমিউন সিস্টেম ভুলবশত দেহের বিভিন্ন হানিকারক কাজে অ্যান্টিবডিকে ব্যবহার করে থাকে। যার মধ্যে হাড়ের সংযোগস্থলে অবস্থিত টিস্যু ধ্বংসের কাজে অ্যান্টিবডির ব্যবহারও অন্তর্ভুক্ত ফলে হাড়ের সঠিক আকার এবং বিন্যাস নষ্ট হয়ে যায়।
বংশানুক্রমতা
বাবা-মা বা সহোদরদের মধ্যে কারো আর্থ্রাইটিস হয়ে থাকলে বংশানুক্রমিকভাবে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
শবনম জাবীন চৌধুরী ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের ফার্মেসি বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন।
zabin860@gmail.com
