Loading...
The Financial Express

আতাকামা মরুভূমি হবে বিশ্বের খাদ্যভান্ডারের চাবিকাঠি!

| Updated: November 14, 2021 16:41:41


- চিলির আতাকামা মরুভূমি - চিলির আতাকামা মরুভূমি

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রাণঘাতী লীলাচক্রে বন্দি পৃথিবীর সামনের দুর্দিনে খাদ্যভান্ডারের চাবিকাঠি হয়ে উঠতে পারে আতাকামা মরুভূমি। এ কথা শুনে অনেকেই চমকে উঠবেন।

উত্তর চিলির শীতল, শুষ্ক, বৃষ্টিবিহীন মরুভূমি হলো আতাকামা। স্পেনীয় ভাষায় এটি দেসিয়ার্তো দে আতাকামা নামে পরিচিত। ১০০ বছরে গড়ে তিন থেকে চারবার মাত্র বৃষ্টির কৃপাবারি বর্ষিত হয় আতাকামায়। ফলে বিশ্বের সবচেয়ে শুষ্ক অ-মেরু মরুভূমি হওয়ার ‘রাজতিলক’ অর্জন করেছে আতাকামা। এমনকি, এখানে মেরু-মরুভূমির চেয়েও কম বৃষ্টিপাত হয়। তাপীয় বিপরীতায়ন বা থার্মাল ইনভারসনের প্রভাবে এখানে আকাশ থেকে বারিধারা ঝরতে পারে না।

অ্যান্টার্কটিক অঞ্চলের হামবোল্ট সমুদ্রস্রোত শীতল পানি বয়ে এনে সাগরপৃষ্ঠের উপরের হাওয়াকে শীতল করে। আর গরম বাতাস উপরে উঠে যায়। এই উষ্ণ বায়ুপ্রবাহ আতাকামা মরুতে কুয়াশা এবং মেঘের সৃষ্টি করে। কিন্তু না, তা সাধারণভাবে বৃষ্টির করুণা হয়ে ঝরে পড়ে না। আতাকামা মরু অঞ্চলে অবস্থিত চিলির আন্তোফাগাস্তা শহর এবং ১৭০০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত চিলির সান্তিয়াগো শহরের তাপমাত্রা মোটামুটি পারদের একই বিন্দুতে ওঠানামা করে। গরমের দিনগুলোতে এখানকার গড় তাপমাত্রা ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

৩,৬৩,০০০ বর্গকিলোমিটার মরুভূমির কোনো কোনো অঞ্চলে  কৃষিকাজের চল রয়েছে। কৃষিকাজে জড়িত মানুষের সংখ্যা হাজারের বেশি হবে না।  আতাকামার পিকা এলাকায় এক বিশেষ ধরণের লেবুর চাষ হয়। পর্যটন শহর সান পেদ্রো দে আতাকামার লবণাক্ত জলাভূমিগুলিতেও চলে চাষাবাদ। তামার খনির জন্য বিখ্যাত, চুকিকামাতার কাছে কালামাতে লোয়া নদীর পানি সেচ করে আলু ও আলফালফা চাষ করা হয়।

জীবনের প্রতি সদয় নয়, উদ্ভিদের প্রতি সহানুভূতি নেই আতাকামার। কিন্তু তারপরও জীবনের ধারাকে সকল নির্মমতা দিয়ে মুছে ফেলতে পারেনি এ মরুভূমি। হাজারো বছর ধরে এখানেও কৃষির চর্চা এবং ফসল আবাদের ধারাবাহিকতা বজায় আছে।

গরম এবং শুকনা আবহাওয়াকে পাত্তা না দিয়ে কোন মন্ত্রের বলে ফসল এখানে টিকে থাকছে? সেটাই চিহ্নিত করা আজ বিজ্ঞানীদের অন্যতম কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জলবায়ুর রূপবদলে ক্রমে তেতে ওঠা পরিবর্তিত পৃথিবীর ক্ষুধা জর্জরিত মুখে খাবার যোগানোর সফলতা হয়ত সেই রহস্যভেদের ওপরই নির্ভর করছে। হয়ত তাই হয়ে উঠবে আগামী খাদ্যভান্ডারের সাফল্যের চাবিকাঠি। 

নতুন এক সমীক্ষায় আতাকামায় সফল চাষের কিছু গুপ্ত রহস্য উন্মোচন করেন বিজ্ঞানীরা। জিনভিত্তিক বিভিন্ন অভিযোজনের সক্ষমতায় বলীয়ান হয়েছে উদ্ভিদজীবন। তাইতো আতাকামার চরম আবহাওয়াকে তুচ্ছ করে সুফলা হয়ে টিকে থাকার শক্তি পাচ্ছে তারা।

নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্লান্ট সিস্টেম বায়োলজিস্ট গ্লোরিয়া কোরুজি বলেন, “শুষ্ক এবং প্রায় পুষ্টিহীন পরিস্থিতিতে ফসলের টিকে থাকার শক্তি যোগায় জেনেটিক ভিত্তি। এটি এখন খুঁজে বের করতে হবে। জলবায়ুর দ্রুত পরিবর্তনশীল যুগে ফসল উৎপাদন এবং টেকসই ফসলের জন্য এর প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে।”

গত এক দশক ধরে কোরুজি এবং আন্তর্জাতিক গবেষকদের একটি দল আতাকামায় উদ্ভিদ জীবন নিয়ে গবেষণা করছেন। গবেষণার জন্য তারা আতাকামার ২২ এলাকাকে বেছে নেন। সেখান থেকে তারা নিয়মিতই মাটি এবং উদ্ভিদের নমুনা যোগাড় করে উদ্ভিদের জিন বিশ্লেষণের জন্য গবেষণাগারে নিয়ে যান। নমুনার যেন কোনো ক্ষতি না হয় সে জন্য তরল নাইট্রোজেনের হিমায়িত করে রাখা হয় এ গুলোকে।

আতাকামায় সর্বাধিক দেখা যায় এমন ৩২ উদ্ভিদের সঙ্গে অন্য স্থানের ঘনিষ্ঠ প্রজাতির ৩২ উদ্ভিদের তুলনা করে বা মিলিয়ে দেখেন তারা। বিজ্ঞানীরা দেখতে পান যে এ গুলোর কোনোটারই আতাকামার পরিবেশে বেড়ে ওঠা উদ্ভিদের জিনগত বৈশিষ্ট্য নেই। এই প্রযুক্তি ফাইলোজেনোমিকক্স নামে পরিচিত। এর মাধ্যমে তারা ২৬৫টি ইতিবাচক জিনকে চিহ্নিত করতে পেরেছেন। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এ সব জিনের সঙ্গে মিউটেশন বা পরিব্যক্তির সম্পর্ক আছে। এই পরিব্যক্তির মধ্য দিয়ে আতাকামা মরুভূমির উদ্ভিদরা বৈরী পরিবেশে টিকে থাকার সুযোগ পেয়েছে।

এ সব জিনকে বিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। এর মাধ্যমেই পৃথিবীর সবচেয়ে বৈরী পরিবেশে টিকে থাকার কৌশল রপ্ত করেছে উদ্ভিদ। বড় সুখবরটি হলো, এ সব জিনের কোনো কোনোটির দেখা মেলে খাদ্যশস্যেও । অর্থাৎ, উষ্ণ হয়ে ওঠা পৃথিবীর সঙ্গে পাল্লা দিতে হলে কি ধরণের শস্য বুনতে হবে, কি ধরণের শস্যের শঙ্কর ঘটাতে হবে এবং কি ভাবে শস্যকে ভবিষ্যতের বিপদ থেকে রক্ষা করতে হবে সে সম্পর্কে ধারণা দেবে আতাকামার মরুজয়ী উদ্ভিদকুল।

চিলির পনতিফিকাল ক্যাথলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্লান্ট সিস্টেম বায়োলজিস্ট রোডরিগো গুতিররেজ বলেন, “আতাকামারা গবেষণার সঙ্গে ক্রমেই মরু হয়ে ওঠা বিশ্বের অঞ্চলগুলোর সরাসরি সম্পর্ক আছে। খরা, চরম তাপমাত্রা, মাটি এবং পানিতে নুনের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে এ পরিস্থিতির সম্পর্ক রয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “আতাকামার কোনো কোনো উদ্ভিদের সঙ্গে প্রধান খাদ্যশস্য, যেমন শিম এবং আলু সহ প্রধান প্রধান ফসলের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তাই আমরা যে সব জিনকে শনাক্ত করছি তা উদ্ভিদের বংশগতি সংক্রান্ত শোনার খনি হয়ে উঠবে। আমাদের গ্রহে মরুকরণ প্রক্রিয়া বাড়ছে সে সময় এ গুলোর সাহায্যে জিন-প্রকৌশল প্রয়োগ করে টেকসই ফসল তৈরি করতে পারবো আমরা।”

[সায়েন্স এলার্ট অবলম্বনে]

Share if you like

Filter By Topic