নব্বইয়ের দশকে যারা জন্মেছে, এমনকি নতুন সহস্রাব্দের প্রথম দশকেও, একটা জায়গায় তারা অন্যদের থেকে আলাদা। সেটি হলো নিজেদের প্রজন্ম নিয়ে গর্ব করা!
সত্যি বলতে, মিলেনিয়াল প্রজন্মের (যাদের জন্ম ১৯৮১-৯৬ এর মাঝে) বেড়ে ওঠার সময়টা ছিল অদ্ভুত সুন্দর। একদিকে চিরাচরিত পরিবার, স্কুল, বাবা-মা-শিক্ষকের আদর-শাসন, অন্যদিকে চলমান প্রযুক্তির বিপ্লব, দুটোর মিশ্রণ তো এ প্রজন্মটাই কাছে থেকে দেখেছে।
এ প্রজন্মের শৈশবের কথা বলতে গেলে প্রথমে বলা উচিৎ পরিপার্শ্বের কথা। তখনো শহরে থরে থরে আকাশছোঁয়া দালান হয়ে ওঠেনি, বাসার পাশে কিংবা স্কুলের সামনে একটা করে খেলার মাঠ দেখা যেত তখনো।
ক্লাসের ফাঁকে, টিফিনের ব্রেকে কিংবা বিকালবেলার অবসরে সেই মাঠে খেলাটাই ছিল আমাদের বিনোদনের প্রধান মাধ্যম।
একদিকে সন্ধ্যার আগে বাড়ি ফেরার তাড়া, অন্যদিকে চলতে থাকা খেলা দ্রুত শেষ করবার প্রয়াস - এ যেন নিত্যদিনের ঘটনা ছিল। খেলতে খেলতে মাগরিবের আজান হয়ে যাওয়ায় মা এসে মাঠ থেকে নিয়ে গেছেন, এরকম বোধয় এ প্রজন্মের সবার সাথেই কম-বেশি হয়েছে।
আর খেলা? কত রকমের যে খেলা ছিল তার কোনো হিসাব নেই। ক্রিকেট, ফুটবল আর শীতের সময় পাড়ার মাঠে নেট টাঙিয়ে ব্যাডমিন্টন খেলা তো ছিলই, সাথে ছিল সাতচাড়া, বৌচি, হাডুডু, জলে-ডাঙায়, কানামাছি, গোল্লাছুট, চোর-পুলিশ, ইত্যাদি বিচিত্র সব খেলা।
হাতের কাছে যা আছে তাই দিয়ে বিচিত্র সব খেলা আবিষ্কার করে ফেলা হতো তখন। যেমন, ক্লাসে স্যারের পড়ায় মন না বসলেই শুরু হতো পাশের বন্ধুর সাথে খাতায় কাঁটাকুটি খেলা।
কিছু খেলা এমনই বিচিত্র ছিল যে বর্তমান প্রজন্ম সেসব শুনলে হেসে গড়াগড়ি খাবে। কলম টোকাটুকি করে কে কার কলম বেঞ্চ থেকে ফেলে দিতে পারে, এমন খেলা কেউ খেলে এখন আর?
ইয়ো ইয়ো, ফ্রিসবি, লাদেন বোমা, মার্বেল, নারকোলের মালা দিয়ে বানানো টেলিফোন, লাটিম - নাম বলতে থাকে শেষ হবার সম্ভাবনা কম।
স্কুল থেকে ফেরার পথে বম্বে সুইটসের বিখ্যাত দশ টাকা দামের সবুজ প্যাকেটের চিপস, একটি লটারি আইসক্রিম কিংবা মিমি চকলেট পাওয়াটা ছিল পরম আনন্দের।
নব্বইয়ের দশকে নিজের শৈশব কাটানো শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মোঃ হুমায়ুন কবির বলেন, স্ন্যাক্স বললে তো সবার প্রথমে চিপসের কথাই মনে পড়ে। বোম্বে সুইটসের চিপসগুলো ছিল তখন সবচেয়ে ভালো -- পটেটো ক্র্যাকার্স, মি. টুইস্ট, রিং চিপস, কর্নটোস; ছিল প্যাকেটের ভিতর ছোট খেলনার মেরিডিয়ান চিপসও।
একধরনের কোনো আইসক্রিম ছিল যেটার মূল আকর্ষণই ছিল সেইটার গাড়িতে লাগানো লটারির চড়কি। আইসক্রিম খাওয়ার চেয়ে সেটা ঘোরানোর আগ্রহই সবার মাঝে বেশি ছিল, যদিও কেউ কখনো কিছু জেতেনি, স্মৃতি হাতড়ে বের করেন হুমায়ুন।
লোডশেডিংয়ের কথা শুনলেই ভ্রূ কুঁচকে যেতে পারে এ প্রজন্মের। কিন্তু মিলেনিয়ালদের জন্য লোডশেডিং ছিল নিত্যদিনের আরাধ্য! মায়েদের করা নিয়ম অনুযায়ী সন্ধ্যায় পড়তে বসার পর কেবল এই লোডশেডিংয়েই মুক্তি মিলত পড়া থেকে।
লোডশেডিং হলেই প্রতিটা ঘর থেকে আসতো চিৎকারের শব্দ। এই চিৎকার বাইরে যাওয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আনন্দের চিৎকার। বাড়ির উঠানের এক কোণে বড়রা যখন আড্ডা দিতেন, ছোটদের তখন শুরু হতো বিচিত্র সব খেলা।
এ বিষয়ে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে শপ-ইন ই কমার্স সাইটের অন্যতম উদ্যোক্তা স্বস্তি রাজেশ্বরী বলেন, ওই সময়টাতে একটা শান্তি ছিল, মানুষে মানুষে সুন্দর সব সম্পর্ক, কোথাও কোনো আঘাত নেই। তখন আমাদের হাতে সময় ছিল, এখন যেমন যান্ত্রিকতা আমাদের গ্রাস করে নিয়েছে, তখন এমনটা ছিল না।
রাতে ঘুমোতে যাবার আগে একমাত্র আকর্ষণীয় বিষয় ছিল টিভি দেখা। যদিও বাবা-মায়ের কঠোর নির্দেশ ছিল - বড়দের চ্যানেল দেখা যাবে না। অবশ্য কার্টুনে মেতে থাকা শিশুরা বড়দের চ্যানেলের খবর রাখার প্রয়োজনই বোধ করতো না।
হুমায়ুন কবিরের ভাষ্যমতে, প্রথমে তো শুধু বিটিভি ছিল। সামুরাই এক্স, গডজিলা, আলিফ-লায়লার মতো শো হতো তখন। আর সেসময়কার ইত্যাদির মতো বাসার সবাই একসাথে মিলে বসে দেখার মতো অনুষ্ঠান এখনো পর্যন্ত একটাও পাইনি।
এরপর ডিশ কানেকশন আসলো, পেলাম কার্টুন নেটওয়ার্ক। পোকেমন, বেইব্লেড, ড্রাগন বল জি, জনি ব্রাভো, ডেক্সটারের মতো শোগুলো তো গোগ্রাসে গেলা হতো। এরপর ছিল নিকেলোডিয়ান, জেটিক্সের নিঞ্জা হাতোরি, পারম্যান, পাওয়ার রেঞ্জার্সের মতো শো।
যে জিনিসটা তখন ছিল, অথচ এখন নেই, নব্বইয়ের শিশুরা নিজেদের শৈশবের যে জায়গাটা নিয়ে গর্ব করতে পারে সেটা খুব সম্ভবত পরস্পর সম্পর্ক। প্রযুক্তির ছড়াছড়ি না থাকলেও তখন যোগাযোগ ছিল অটুট, সম্পর্ক ছিল টেকসই।
সেটি এখন আছে কি নেই তা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। তবে নব্বইয়ের শিশুরা আজও লোডশেডিং হলে কান পেতে রাখে পাশের বাড়ি থেকে উল্লাসরত শিশুদেরহৈচৈয়ের শব্দ ভেসে আসবে বলে।
শুভদীপ বিশ্বাস তূর্য বর্তমানে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে পড়াশোনা করছেন।
shuvodipbiswasturja1999@gmail.com