বাংলাদেশের উন্নয়ন কার্যক্রমে এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংকের (এআইআইবি) অংশগ্রহণ বাড়ছে; শুরুর পাঁচ বছরে গুরুত্বপূর্ণ এক ডজনেরও বেশি প্রকল্পে অর্থায়ন করছে চীনা নেতৃত্বাধীন ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানটি। খবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের।
এখন পর্যন্ত উন্নয়ন ব্যাংকটি বাংলাদেশকে ২৬০ কোটি ডলারের অর্থায়ন দিতে চূড়ান্ত ঋণ চুক্তি করেছে। আর আগামী পাঁচ বছরের জন্য আরও প্রায় চার বিলিয়ন (৪০০ কোটি) ডলারের ঋণ সহায়তার প্রস্তাব নিয়েও আলোচনা চলছে বলে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) পরিসংখ্যান বলছে।
ইআরডির এশিয়া উইংয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, এআইআইবি কার্যক্রম শুরুর মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যেই বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন সহযোগী হয়ে উঠছে এবং ক্রমেই অংশগ্রহণ বাড়ছে।
চলমান অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা অনুযায়ী উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনায় বিপুল অর্থায়নের প্রয়োজন হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, নতুন উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে এআইআইবি এসে আমাদের অতিরিক্ত চাহিদার উল্লেখযোগ্য একটা অংশ যোগান দিচ্ছে।
সংস্থাটি ইতোমধ্যে যে গতিতে ও পরিমাণে অর্থায়ন শুরু করেছে তাতে বলা যায়, দেশের প্রধান তিন উন্নয়ন সহযোগীর মধ্যে এখন এআইআইবি ঢুকে পড়েছে।
দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নকে আরও শক্তিশালী করতে ঋণ দাতা সংস্থাটি ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন তিনি।
২০১৪ সালের অক্টোবরে ১০ হাজার কোটি ডলার মূলধন নিয়ে চীনের নেতৃত্বে এআইআইবি গঠিত হয়। এ উন্নয়ন ব্যাংকে ভারত, রাশিয়া, জার্মানি, দক্ষিণ কোরিয়া অন্যতম অংশীদার। বাংলাদেশসহ এটির বর্তমান সদস্য ৫৭টি দেশ।
এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোকে অবকাঠামো উন্নয়ন ও সড়ক সংযোগ স্থাপনে অর্থা সহায়তা দেওয়াই এ উন্নয়ন ও বিনিয়োগ ব্যাংক গঠনের প্রধান উদ্দেশ্য। ২০১৬ সাল থেকে কার্যক্রম শুরু করা সংস্থাটি এ অঞ্চলের পরিবহন, জ্বালানি, টেলিযোগাযোগ ও অন্যান্য অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ করছে।
বেইজিংভিত্তিক ব্যাংকটি ইতোমধ্যে বাংলাদেশের অগ্রাধিকার পাওয়া এক ডজনেরও বেশি উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়ন শুরু করেছে।
এখন পর্যন্ত সিলেট-তামাবিল চার লেইন সড়ক উন্নয়নসহ ১৪টি প্রকল্পের বিপরীতে প্রায় ২৬০ কোটি ডলারের ঋণের চূড়ান্ত চুক্তি করেছে। সংস্থাটির ২৬ কোটি ডলার অর্থায়নে চলমান আরেকটি প্রকল্প হচ্ছে ময়মনসিংহের কেওয়াট খালী সেতু নির্মাণ প্রকল্প।
এছাড়া ব্যাংকটি আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশের বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়নে বাস্তবায়নের জন্য আরও ২২টি প্রকল্প বাছাই করেছে। এগুলোতে মোট প্রায় ৪০০ কোটি ডলার অর্থায়নের প্রস্তাব রয়েছে, যা পাওয়ার আশা করছে বাংলাদেশ।
বর্তমানে বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) বহুজাতিক উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে বাংলাদেশের উন্নয়ন কার্যক্রমে অর্থায়নে শীর্ষে রয়েছে।
এছাড়া জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগী সংস্থা (জাইকা), চীন ও ভারত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অন্যতম প্রধান ঋণদাতা ও দাতা দেশ হিসেবে অর্থায়ন করছে।
ইআরডির সংশ্লিষ্ট শাখার একজন কর্মকর্তা জানান, এআইআইবি বিশ্বব্যাংক কিংবা এডিবির মতো কৌশলগত পরিকল্পনা গ্রহণ করে অর্থায়ন করছে না।
বিনিয়োগ ব্যাংকটির অর্থায়নের নিয়ম হচ্ছে- তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া পরিবহন, জ্বালানি ও টেলিযোগাযোগ খাতের প্রকল্প প্রস্তাব ব্যাংকের কাছে উপস্থাপন করতে হবে। এরপর ওই প্রকল্পের ধরন গ্রহণযোগ্য হলে তাদের পাইপলাইনে যুক্ত করে।
অর্থায়নের নতুন আলোচনা
ইআরডির ওই কর্মকর্তা জানান, আগামী এপ্রিলের মধ্যে এআইআইবির সঙ্গে কোভিড টিকা কেনার জন্য ৭০ থেকে ৮০ কোটি ডলারের চুক্তি হওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া মহামারীতে ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধারেও সরকারকে বাজেট সহায়তার বিষয়েও ইতিবাচক আলোচনা হচ্ছে।
তিনি জানান, এআইআইবি ও বিশ্বব্যাংক দুই সংস্থার কাছে নদী ভাঙ্গনরোধ এবং নদীর তীর স্থিতিশীল করার লক্ষ্যে ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীর টেকসই ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে যৌথভাবে প্রায় ২৩০ কোটি ডলার ব্যয়ের একটি প্রকল্প প্রস্তাবও যুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া এআইআইবি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে অগ্রাধিকারভাবে ঋণ দিতেও প্রাথমিক সম্মতি দিয়েছে।
আর যে ২২ প্রকল্প সংস্থাটির পাইপলাইনে যুক্ত হয়েছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে- মদুনাঘাট-ভুলতা ৭৬৫ কেভি ট্রান্সমিশন লাইন নির্মাণ, বিআরইবি নেটওয়ার্কের (রাজশাহী-রংপুর) আধুনিকীকরণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং গ্যাস খাতের জ্বালানি দক্ষতার উন্নয়ন অন্যতম।
সরকারি অবকাঠামো উন্নয়ন কোম্পানি ইডকলের মাল্টি সেক্টর অন-লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি প্রকল্পেও ২০ কোটি ডলারের প্রস্তাব নিয়েও ব্যাংকটির সঙ্গে আলোচনা চলছে।
এছাড়া আরও বেশ কিছু প্রকল্প শিগগির উপস্থাপন করা হতে পারে বলেও জানান তিনি।